টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। গতকাল সোমবার তিনিসহ মন্ত্রিসভার ৪৭ সদস্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের কাছে শপথ নিয়েছেন। এর আগের দিন রবিবার মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের নাম ঘোষণা করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। সেই মন্ত্রিসভা নিয়ে এখন আলোচনা এখনো থামেনি। এবারের মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন একঝাঁক আনকোরা মুখ।
কেমন হলো শেখ হাসিনার এই মন্ত্রিসভা জানতে গতকাল দেশ রূপান্তর কথা বলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক এক উপদেষ্টা, সাবেক এক ডেপুটি গভর্নর এবং সদ্য সাবেক এক মন্ত্রীর সঙ্গে। তাদের মতে, অভিজ্ঞতার বিকল্প নেই। নতুনদের মন্ত্রিসভায় আনতে গিয়ে অভিজ্ঞতার ঘাটতি থেকে গেল। তবে এসব মন্ত্রীরা যদি নিষ্ঠার সঙ্গে নিজ দপ্তরের কাজ করেন, তবে সফলতা আসবে। তারা এ মন্ত্রীদের প্রতি দুর্নীতিমুক্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে এ বলেও সতর্ক করে দিয়েছেন যে,শুধু নিজেরা দুর্নীতিমুক্ত থাকলেই হবে না, আশপাশের লোকজনও যেন দুর্নীতি করতে না পারে, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। তারা এমনও বলেছেন, দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারলে নতুনদেরও ভালো করার সুযোগ রয়েছে। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ে তুলে জাতিকে প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিশ্চিত করতে হবে। তারা ঘোষিত ইশতেহার বাস্তবায়নের ওপরও জোর দেন। অনেকে আবার এখনই মন্তব্য করতে রাজি হননি। বলেছেন, মন্ত্রীরা আগে কাজ করুক, তারপর মন্তব্য।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ বলেন, কেবল তো মন্ত্রিসভা গঠন হলো। মন্ত্রীরা কাজ করবেন। তাদের কাজই বলে দেবে কেমন তারা। চেহারা দেখে কিছু বলা যাবে না। কাজের বাস্তবায়ন দেখতে হবে।
‘এই মন্ত্রিসভার মূল বৈশিষ্ট্য নতুনদের আগমন। পুরনো অভিজ্ঞরা বাদ পড়েছেন। নতুনদের ব্যাপারে সরকার হয়তো ভেবেছে নতুনদের উদ্যম বেশি। তারা উদ্যমী হয়ে উৎসাহ নিয়ে বেশি বেশি কাজ করবেন। তবে অভিজ্ঞতার বিকল্প নেই। পুরনো মন্ত্রীরা নিজ নিজ দপ্তরে বেশ অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছিলেন। সেদিক থেকে নতুন-অভিজ্ঞ মিলে একটি মন্ত্রিসভা হতে পারত। এখন নতুনরা চাইলে অভিজ্ঞদের সহযোগিতা নিয়ে কাজ করতে পারেন’ মত দেন এই সাবেক ডেপুটি গভর্নর।
তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন এই মন্ত্রিসভা ও সরকারকে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। দেশে সুশাসনের প্রচ- অভাব। সুশাসনের সঙ্গে দুর্নীতির প্রশ্ন জড়িত। সুশাসন নিশ্চিত না হলে দুর্নীতি যাবে না। দুর্নীতি না গেলে কোনো কাজই সফল হবে না। সফলতা পাবে না। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, সুশাসন নিশ্চিত হলে ও দুর্নীতি না থাকলে বাকি কাজগুলো সম্ভব হবে। নতুবা মন্ত্রিসভায় যাকেই আনা হোক, কোনো কাজ হবে না।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, মন্ত্রিসভায় তো ভীষণ চমক দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সিনিয়র মন্ত্রীরা বাদ পড়েছেন। তাদের দক্ষতা ছিল। বেশিরভাগই নতুন এসেছে। সে ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার একটা ঘাটতি থাকার আশঙ্কা রয়ে গেল।
মন্ত্রিসভায় এই পরিবর্তনের পেছনে প্রধানমন্ত্রী এমনও ভাবতে পারেন যে, তরুণরা এগিয়ে আসুক। নেতৃত্বগুণ অর্জন করুক। প্রধানমন্ত্রী এটা করেছেন নিজ বিবেচনায়। তার ভাবনায় এমনটা থাকতে পারে যে, এবার তার চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রীত্ব। টানা তিনবার তার সরকার ক্ষমতায়। এবার অনেক কাজ। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী সামনে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মজয়ন্তী। সবাইকে নিয়েই তিনি এই ইতিহাস উদযাপন করতে চান। মানুষের মনে যেন কোনো হতাশা না থাকে, সেজন্যই তিনি কাজ করছেন।। দীর্ঘদিন মন্ত্রিসভায় থাকতে গিয়ে অনেক মন্ত্রী বেশ বিতর্কিত হয়ে পড়েছেন। নানা ধরনের সমালোচনা আছে। তাই তিনি হয়তো চেয়েছেন তরুণ ও নতুনদের সমন্বয়ে একটি গ্রহণযোগ্য মন্ত্রিসভা গঠন করতে। এসব নতুন ও তরুণ মন্ত্রীরা নিজ উদ্যমে কাজ করবেন।
‘শুধু উন্নয়নমূলক কাজ করলেই হবে না। এসব কাজের সফলতা আনতে হলে গণতন্ত্র উন্নয়ন করতে হবে। নির্বাচনের আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ইশতেহার ঘোষণা করেছে, সে অনুযায়ী কাজ করতে হবে। ইশতেহার ধরে কাজ করলেই আর কিছু লাগবে না’ মত সাবেক এই উপদেষ্টার।
সদ্য সাবেক কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, এখানে বাদ পড়ার কিছু নেই। আমি মনে করি যে মন্ত্রিসভা অনেক ভালো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যাদের যোগ্য মনে করেছেন, তাদেরই মন্ত্রিসভায় স্থান দিয়েছেন। পরিবর্তন দরকার। নতুনদের জন্য তো জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার কাজ করবে তরুণ প্রজন্মের জন্য। আমরা তাদের সঙ্গে সবসময়ই আছি এবং থাকব। আমরা যে কাজ করে গেছি, নতুন মন্ত্রীরা এসে অবশ্যই তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা যেভাবে সততার সঙ্গে ও দেশের জনগণের কথা ভেবে কাজ করেছি, আশা করছি নতুন মন্ত্রীরাও সেভাবেই কাজ করবেন।
মতিয়া চৌধুরী আরও বলেন, আওয়ামী লীগ ইশতেহার দিয়েছে। ওই ইশতেহার ধরে কাজ করবেন মন্ত্রীরা। নতুনদের পাশাপাশি পুরনো অভিজ্ঞ মন্ত্রীরাও সরকারে আছেন। আমরা তো আছিই। কোথাও কোনো সমস্যা হলে সম্মিলিতভাবে কাজ করা হবে। সরকারের পাশাপাশি দলকেও সুসংগঠিত রাখতে হবে। সেখানেও নেতৃত্ব দরকার। প্রধানমন্ত্রী সব ভেবেই এমন মন্ত্রিসভা করেছেন। আমার মনে হয়েছে, খুবই বিবেচনাপ্রসূত ও সময়পোযোগী মন্ত্রিসভা হয়েছে এবার।