৪১ জেলায় অসহ্য গরম

আগামী ৩ মাসে একাধিক হিটওয়েভ আসতে পারে

আপডেট : ০৪ জুন ২০২৬, ০৭:১৩ এএম

জুন মানেই বর্ষার মাস। সাধারণত বর্ষা মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়মিত বৃষ্টিপাত হয়, নদ-নদীতে পানি বাড়তে শুরু করে এবং গরমের তীব্রতা কিছুটা কমে আসে। কিন্তু এবারের জুন মাসের পরিস্থিতি ভিন্ন। বর্তমানে দেশের ৪১টি জেলায় মাঝারি হিটওয়েভ বিরাজ করছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে তিন (জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত) মাস সারা দেশে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনাও কম এবং প্রচ- গরম পড়তে পারে। এই সময়ে দেশে কয়েকটি হিটওয়েভ আসতে পারে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস সূত্রে এমন তথ্যই মিলেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী জুন থেকে আগস্ট মাসে বৃষ্টিপাত কম হয় এবং গরম বেশি পড়ে তাহলে এটি কৃষি, জনস্বাস্থ্য, বিদ্যুৎসহ সামগ্রিক জীবনযাত্রার ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঢাকাসহ দেশের ৪১ জেলায় মৃদু থেকে মাঝারি হিটওয়েভ বিরাজ করছে। এসব জেলার মধ্যে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী ও ভোলা জেলাসহ রাজশাহী বিভাগের আট জেলা, রংপুর বিভাগের আট জেলা এবং খুলনা বিভাগের ১০ জেলা। এসব জেলায় মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার দিনের তাপমাত্রা সামান্য কমতে এবং রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। আগামীকাল শুক্রবার নাগাদ তাপপ্রবাহ কমে আসতে পারে। 

জলবায়ু বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের আবহাওয়া আর আগের মতো নেই। ঋতু বদলাচ্ছে, কিন্তু সেই বদল এখন আর স্বাভাবিক নয়— বরং অনিয়মিত, অপ্রত্যাশিত এবং অনেক ক্ষেত্রে চরম। কখনো তীব্র তাপপ্রবাহ, কখনো হঠাৎ ভারী বৃষ্টি, আবার কখনো ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কতা সব মিলিয়ে বদলে যাচ্ছে দেশের জলবায়ুর চেহারা। পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় তাপপ্রবাহ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে কংক্রিটের বিস্তার এবং সবুজের অভাবে দিনের পাশাপাশি রাতের তাপমাত্রাও বেশি অনুভূত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে তাপপ্রবাহের স্থায়িত্ব ও তীব্রতা বাড়ছে। বর্ষা মৌসুমেও দীর্ঘ সময় বৃষ্টিহীন অবস্থা এবং স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা এখন আর বিরল ঘটনা নয়। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবগুলোর একটি স্পষ্ট উদাহরণ।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, গত কয়েক বছরে দেশে গরমের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব দুইই বেড়েছে। এপ্রিল-মে মাসে তাপমাত্রা প্রায়ই ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পৌঁছে যাচ্ছে। রাতে তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও শহর দ্রুত ঠা-া হতে পারে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাপপ্রবাহের প্রবণতা বাড়ছে এবং এর বিস্তার আগের তুলনায় বেশি এলাকাজুড়ে হচ্ছে। বিশেষ করে শহর এলাকায় কংক্রিটের স্থাপনা নির্মাণ বৃদ্ধি, গাছপালা কমে যাওয়া এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা এই তিনটি কারণে শহুরে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর আরও জানায়, আগে যেখানে বর্ষা মৌসুমে নিয়মিত বৃষ্টি আসত, এখন সেখানে দেখা যাচ্ছে অনিয়মিত বৃষ্টি। কখনো একটানা ভারী বর্ষণ, আবার দীর্ঘ সময় খরা। ফলে একদিকে শহরে জলাবদ্ধতা, অন্যদিকে গ্রামে ফসলের ক্ষতি বাড়ছে। সময়মতো বৃষ্টি না হাওয়া যেমন সমস্যা, তেমনি অতিরিক্ত বৃষ্টিও বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বাংলাদেশ এখন এক ধরনের চরম আবহাওয়ার চক্রে প্রবেশ করেছে, যেটি মানুষের ঘুম, স্বাস্থ্য এবং কর্মক্ষমতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

আবহাওয়াবিদ ড. মো. বজলুর রশিদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশে বৃষ্টিপাত ও গরমের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। মার্চ-এপ্রিল মাসে গরম বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু মার্চ-এপ্রিলে বেশি গরম পড়েনি এবং কোনো হিটওয়েভ ছিল না। আগে বর্ষা মৌসুমে প্রচুর বৃষ্টিপাত হতো। এখন জুন মাস, এই বর্ষা মৌসুমে আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়মিত বৃষ্টিপাত হয়, নদ-নদীতে পানি বাড়তে শুরু করে এবং গরমের তীব্রতা কিছুটা কমে আসে। কিন্তু এবার জুন মাসে দেখা যাচ্ছে উল্টা। এখন বৃষ্টি হওয়ার কথা, বৃষ্টি নেই। জুন থেকে আগস্ট আগামী তিন মাস বৃষ্টি কম হতে পারে। আর বৃষ্টি কম হওয়ার অর্থই হলো গরম বেশি পড়া। এই সময়ে যে পরিমাণ বা মাসে যতদিন বৃষ্টি হওয়ার কথা তা হবে না। কারণ বৃষ্টির মৌসুম পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। আগে বৃষ্টির জন্য মার্চ-এপ্রিলকে প্রি-মৌসুম এবং জুন থেকে আগস্ট মাসকে পোস্ট মৌসুম হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু এখন প্রি-মৌসুমে বৃষ্টি বেশি হচ্ছে আর পোস্ট মৌসুমে হচ্ছে কম। এ বছর এপ্রিল মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৬ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। মে মাসেও প্রায় ৭ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। গেল দুই মাসেই বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল বেশি। 

তিনি আরও বলেন, চলতি জুন মাসে আরও তিন-চারটি হিটওয়েভ আসতে পারে। জুলাই-আগস্টের দিকেও হিটওয়েভ আসতে পারে। যেহেতু ওই সময়ে বৃষ্টি কম হবে বা থেমে থেমে বৃষ্টি হবে। যে সময় তিন-চার দিন বৃষ্টিপাত হবে না, তখনই তাপমাত্রা বেড়ে যাবে এবং হিটওয়েভ হবে। এই হিটওয়েভের কারণে মানুষ অসুস্থ বেশি হবে।  

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানান, অতিরিক্ত গরমের কারণে হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা, মাথা ঘোরা এবং বিভিন্ন তাপজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে। শিশু, বয়স্ক এবং বাইরে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তারা এ সময় বেশ সর্তক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, এখন প্রচ- গরম, তাই এ সময়ে মানুষের প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়াই ভালো। যেসব শিশু স্কুলে যায় তারা বাইরে ঘুরবে না, লাফালাফি, দৌড়াদৌড়ি করবে না। যারা মাঠে কাজ করে, রিকশাচালক তারা বাইরে থাকাকালে মাথায় ছাতা ব্যবহার করবে। প্রচুর পানি খাবে। রাস্তাঘাটে শরবত, জুস, খাবে না। ঘামে যেহেতু দেহে পানিশূন্যতা হয়, এজন্য পানিতে একটু লবণ মিশিয়ে নিলে ভালো হবে। মাঝেমধ্যে খাবার স্যালাইন খেতে পারে। যারা খোলা মাঠে কাজ করে তারা এক-দুই ঘণ্টা পরপর একটু ছায়াতে গিয়ে বিশ্রাম নেবে। প্রচন্ড গরমে মানুষ অজ্ঞান হয়ে যতে পারে। ওই সময়ে আবার স্ট্রোকও হয়ে যায়। স্ট্রোক কোনো কোনো সময় গুরুতর হয়ে যায় এবং তখন সময়মতো চিকিৎসা না নিলে মারাও যায়। এজন্য মাঝেমধ্যে ছায়াতে গিয়ে আশ্রয় নিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, গরমের সময় রাস্তাঘাটে শরবত, জুস, আখের রসসহ বিভিন্ন রকমের পানীয় বিক্রি বেড়ে যায়। এসব পানীয় খাওয়া বন্ধ করতে হবে। কারণ এসব খেলে ডায়রিয়া ও পেটের পীড়া হতে পারে। শুধু বেশি করে পানি করতে হবে। একই সঙ্গে খোলামেলা খাবার খাওয়া বন্ধ করতে হবে। ঘরের খাবারও অনেক সময় বাইরে থাকলে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এসব খাবার খাওয়া যাবে না। রান্না করা খাবার বেশি সময় ধরে খেতে চাইলে ফ্রিজে রাখতে হবে। গরমে হালকা ও ঢিলেঢালা পোশাক পরতে হবে। এ সময় শিশু ও বয়স্কদের প্রতি বিশেষ নজরভাবে নজর রাখতে হবে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম হলে তাকে মৃদু তাপপ্রবাহ ধরা হয়। ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রির কম তাপমাত্রাকে বলা হয় মাঝারি এবং ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রির কম তাপমাত্রাকে তীব্র তাপপ্রবাহ বলা হয়। আর তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রির ওপরে উঠলে তাকে বলা হয় অতি তীব্র তাপপ্রবাহ। মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে গতকাল বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত (২৪ ঘণ্টায়) দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল নীলফামারীর সৈয়দপুরে ৩৮ ডিগ্রি দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর সবচেয়ে কম তাপমাত্রা ছিল সিলেটে ২৩ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত