দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর হচ্ছে সরকার। এই নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তরসহ সবকটি ইউনিটের শীর্ষ কর্তারা বৈঠক করে চলেছেন। সর্বশেষ ঈদের ছুটির আগের দিন মন্ত্রণালয়ে জরুরি বৈঠক থেকে বার্তা দেওয়া হয়েছে পুলিশকে। সেখানে বলা হয়, পুরনোদের পাশাপাশি নতুন সন্ত্রাসীরাও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তাই রাঘববোয়ালদের নতুন তালিকা করা হবে। সন্ত্রাসীদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ‘ব্লক’ করার পরিকল্পনাও করা হচ্ছে। এমনকি, অপরাধ কর্মকান্ডে সহায়তাকারী স্বজনদের এনআইডিও ব্লক করার কথা বলা হয়। এ জন্য তাদের তথ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। নির্দেশনা পেয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছে পুলিশ। এরই মধ্যে জেলার পুলিশ সুপার ও থানার ওসিরা সোর্সের মাধ্যমে সন্ত্রাসীদের এনআইডিসহ পুরো প্রোফাইল সংগ্রহ করছেন।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও অপরাধীদের অপরাধমূলক কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে পুলিশ। চিহ্নিত সন্ত্রাসী, দাগি অপরাধী ও ‘রাঘববোয়ালদের’ এনআইডি ব্লক বা নিষ্ক্রিয় করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় শুধু মূল অপরাধীই নয়, বরং অপরাধের অর্থ ও অবৈধ সম্পদের সুবিধাভোগী হিসেবে তাদের নিকটাত্মীয় বা স্বজনদেরও কঠোর নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসীরা কারাগার বা বিদেশে পলাতক থাকা অবস্থায়ও তাদের সহযোগীদের মাধ্যমে দেশে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, জমি দখল ও মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করছে। এসব অপরাধের আর্থিক লেনদেন সচল রাখতে তারা কোনো না কোনোভাবে বৈধ এনআইডি ব্যবহার করে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সচল রাখছে বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার মতে, একজন অপরাধীকে সামাজিকভাবে ও আর্থিকভাবে পুরোপুরি অচল করার সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে এনআইডি ব্লক করে দেওয়া। এতে সন্ত্রাসীরা কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সচল রাখতে বা নতুন অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবে না। পাসপোর্ট ইস্যু বা নবায়ন করতে পারবে না, ফলে বিদেশে পালিয়ে যাওয়া বা বিদেশে অবস্থান করাও কঠিন হয়ে পড়বে। নিজের বা বেনামে কোনো স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি কেনাবেচার পর রেজিস্ট্রেশন করতে পারবে না। কোনো মোবাইল সিম কার্ড তুলতে বা এমএফএস অ্যাকাউন্ট চালাতে পারবে না।
বেশি অপকর্মে নতুন অপরাধীরা : পুলিশ সূত্র জানায়, এলাকাভিত্তিক নতুন সন্ত্রাসীদের তালিকা তৈরির পরই তাদের বিরুদ্ধে অভিযানে নামবে পুলিশ। এরই মধ্যে বিভিন্ন থানা এলাকায় সক্রিয় চাঁদাবাজদের তালিকা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাঁদাবাজ, উদীয়মান সন্ত্রাসীদের তালিকার পাশাপাশি পুরনো শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ওপরও কঠোর নজরদারি শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেসব সন্ত্রাসী ও তাদের পৃষ্ঠপোষক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিল, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর তাদের বেশিরভাগই আত্মগোপনে চলে যায়। তাদের শূন্যস্থান দখলে নেয় নতুন সন্ত্রাসীরা। তারা খুনাখুনি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও মাদক-বাণিজ্যে হাত পাকাতে শুরু করছে। পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অধিকাংশই এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে অপরাধ কর্মকা-ে নতুন সন্ত্রাসীদের নিজ নিজ দলে ভেড়াচ্ছে। এ ছাড়া গণঅভ্যুত্থানের পর বেশিরভাগ শীর্ষ সন্ত্রাসী কারাগার থেকে বের হয়ে যায়। তারাও ফের অপরাধে সক্রিয় হচ্ছে।
এনআইডি ব্লক করাসহ নানা বিষয়ে বৈঠক : পুলিশ সূত্র জানায়, সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরে অপরাধ পর্যালোচনা নিয়ে একটি বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে বলা হয় নতুন নতুন অপরাধী তৈরি হচ্ছে। তার মধ্যে ভাসমান অপরাধীও বেশ সক্রিয়। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তারা হত্যাকা- থেকে শুরু করে নানা অপকর্ম চালিয়ে আসছে। বিশেষ করে ভাসমান অপরাধীরা এক এলাকায় অপরাধ ঘটিয়ে অন্য এলাকায় আস্তানা গাড়ছে। এই কারণে তাদের ধরতে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ। বৈঠকে কিশোর গ্যাংয়ের তথ্যভাণ্ডার তৈরি, ভাসমান অপরাধীদের নজরদারি, বিট পুলিশিং, তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের এনআইডি ব্লক, তাদের আশ্রয়দাতাদের (রাঘববোয়াল) বিষয়টি আলোচনায় ওঠে আসে। রাজধানীর উত্তরা বিমানবন্দর, বিশ্বরোড, কদমতলী, ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, সদরঘাট, তেজগাঁও, কারওয়ান বাজার, কমলাপুর রেলস্টেশন, হাইকোর্ট এলাকাসহ শতাধিক স্থানকে ভাসমান অপরাধের জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ভাসমান অপরাধী নিয়ে দুশ্চিন্তা : বৈঠকে পুলিশের একটি গোপন প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা হয়। এতে বলা হয়, ঢাকার মহাখালীর কড়াইল বস্তি, জুরাইন বালুর মাঠ বস্তি, গোপীবাগের টিটিপাড়া বস্তি, মালিবাগের কুমিল্লা বস্তি, মোহাম্মদপুরের বালুর মাঠ বস্তি, মালিবাগের রেললাইন বস্তি, খিলগাঁওয়ের নোয়াখাইল্লা বস্তি, মীর হাজিরবাগ বস্তি, ধলপুর সিটিপল্লী বস্তি, নামাশ্যামপুর বস্তি, গেন্ডারিয়ার রেললাইন বস্তি, পার গেন্ডারিয়া বস্তি, মহাখালীর সাততলা বস্তি, পোস্তগোলা ডিআইটি বস্তি, ডেমরার চরপাড়া বস্তি, পূর্ব দোলাইরপাড় ডিপটি গলির বস্তিসহ বেশির ভাগ বস্তিতেই ভাসমান অপরাধীদের আস্তানা। ঢাকার বাইরে কুমিল্লা, ফেনী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, শেরপুর, হবিগঞ্জ, কক্সবাজার, বরগুনা, লক্ষ্মীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চুয়াডাঙ্গা, নীলফামারী, দিনাজপুর, গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, সাতক্ষীরা, বগুড়া, ফরিদপুর, পাবনা, টাঙ্গাইল, ঢাকার সাভার, সিরাজগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরের টঙ্গী, কুষ্টিয়া এলাকায় ভাসমান অপরাধী বেশি। এসব অঞ্চলের বস্তিতেই বেশি বসবাস তাদের। অস্ত্র, মাদক কেনাবেচা, নারী ও শিশু পাচার, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতিসহ নানা অপরাধে জড়িত তারা। প্রভাবশালী মহল ও রাজনৈতিক নেতারা বস্তির অপরাধীদের ব্যবহার করেন। যে কারণে প্রশাসনও তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না।
ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, অপরাধীদের নির্মূলে জোর চেষ্টা চালাচ্ছি। সন্ত্রাসীদের তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে। যারা অপকর্ম করবে, তাদের কাউকে রেহাই দেওয়া হবে না। এমনকি অপরাধীদের আশ্রয়দাতাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।
তালিকা হচ্ছে ‘রাঘববোয়াল’দের : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখা এবং বিশেষায়িত গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি রাঘববোয়ালদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে। প্রাথমিক তালিকায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শীর্ষ সন্ত্রাসী, অর্থ পাচারকারী, মানবপাচার চক্রের মূল হোতা এবং রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থাকা বড় বড় অপরাধীদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। যারা ইন্টারপোলের রেড নোটিসধারী এবং দীর্ঘদিন ধরে বিদেশ থেকে বাংলাদেশের অপরাধজগত নিয়ন্ত্রণ করছে, তাদের তালিকা হচ্ছে। এ ছাড়া যারা ব্যাংক লোপাট, হুন্ডি ব্যবসা ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে, তাদের বিষয়েও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। দেশের সীমান্ত এলাকা ও ট্রানজিট রুটগুলো ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে তারাও তালিকায় আসছে।
পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিটের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, এতদিন শুধু গ্রেপ্তার বা মামলা দিয়ে অপরাধ দমনের চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু এবার আমরা তাদের ‘লাইফলাইন’ কেটে দিতে যাচ্ছি। এনআইডি ব্লক হলে তারা দেশ বা বিদেশ কোথাও বসেই আর্থিক লেনদেন করতে পারবে না।
সহায়তা করলেই ফাঁসবেন স্বজনরা : পরিকল্পনার সবচেয়ে কঠোর কার্যকরী দিকটি হচ্ছে অপরাধীদের স্বজনদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ। তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের কোনো স্বজন যদি অপরাধে সহায়তা করে, তাহলে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। গোয়েন্দা অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অধিকাংশ শীর্ষ সন্ত্রাসী বা রাঘববোয়ালরা নিজেদের নামে কোনো সম্পদ বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রাখে না। তারা সমস্ত অর্থ-সম্পদ স্ত্রী-সন্তান, ভাই-বোন কিংবা বাবা-মায়ের এনআইডি ব্যবহার করে বৈধ করার চেষ্টা করে। কোনো অপরাধীর অর্থ দিয়ে তার কোনো আত্মীয়ের নামে সম্পত্তি ক্রয় বা ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়ানো হলে তাৎক্ষণিকভাবে ওই আত্মীয়ের এনআইডি লক করে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশের এক কর্তাব্যক্তি। তিনি বলেন, সন্ত্রাসীদের এনআইডি ব্লকের এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল এবং স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য নির্বাচন কমিশনের সহায়তা নেওয়া হবে। তাছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের গোয়েন্দা ইউনিট, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর এবং বিটিআরসির ডাটাবেজ সংযুক্ত করা হবে। আইনগতভাবে অপরাধের দায় ব্যক্তিগত। তবে যদি সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ থাকে যে, স্বজনরা অপরাধের টাকা ভোগ করছেন বা অপরাধে সহায়তা করছেন, তবেই শুধু তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঢালাওভাবে কারও এনআইডি ব্লক করা হবে না।
তিন স্তরের ভেরিফেকশন : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, তালিকায় যাতে কোনো ভুল এবং কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি হয়রানির শিকার না হন, সেজন্য তিন স্তরের ভেরিফিকেশ ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। প্রথমে স্থানীয় পুলিশ, এরপর জেলা প্রশাসন ও সবশেষে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর যাচাইয়ের পরই কেবল চূড়ান্ত তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত হবে। সন্ত্রাসীদের এনআইডি ব্লক করা এবং তাদের স্বজনদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার পরিকল্পনাটি নিঃসন্দেহে অপরাধ দমনে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হবে। রাঘববোয়ালদের আর্থিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে এর চেয়ে কার্যকর ডিজিটাল অস্ত্র আর নেই।
কলকাঠির পেছনে পুরনো পুরস্কারঘোষিতরা : পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদ মর্যাদার দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীরা ফের মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে তারা সক্রিয় হওয়ার তথ্য আছে। তাদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে। ইন্টারপোলকেও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। তারা আরও বলেন, পুরস্কারঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর মধ্যে ১৩ জন বিদেশে আত্মগোপনে আছে। ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারি করা আছে। ২০০৩ সালে মালিবাগের সানরাইজ হোটেলে ডিবি পুলিশের দুই সদস্যকে হত্যার পর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান দুবাইয়ে আত্মগোপনে থেকে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করছে। তার সহযোগী জাফর আহমেদ মানিক ওরফে ফ্রিডম মানিক ভারতে পালিয়ে আছে। তার ইশারাতেই দেশে দখলবাজি, টেন্ডার বাণিজ্য ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে।
