শপথ নিয়েই দপ্তরে তৎপর নতুন অর্থমন্ত্রী

বঙ্গভবনে শপথ নিয়ে বের হয়েই কোনো ফুরসত নেননি নয়া অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। সোজা চলে আসেন সচিবালয়ে, নতুন দপ্তরে। অবশ্য মন্ত্রীর আগমনের বার্তা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে আরও আগে, দুপুর ৩টার দিকে। সন্ধ্যা সাড়ে ৫টার দিকে সচিবালয়ে গিয়ে রাত ৮টার দিকে বের হন তিনি। এই সময়ে অর্থ বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেন তিনি।

এ সময় নতুন অর্থমন্ত্রী বলেন, এ বছর অর্থনীতিতে আমরা অসাধারণ ভালো করব। দেশের এই অবস্থান আপনাদের হাত ধরেই এসেছে। প্রবৃদ্ধির সব নির্দেশই বেশ ভালো অবস্থায় রয়েছে। তবে আমরা যেভাবে কাজ করছি, তাতে গাণিতিক হারে অগ্রগতি হবে। কিন্তু আমাদের জ্যামিতিক হারে এগোতে হবে। কাজটি কঠিন না। সভায় উপস্থিত এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত ধারণা, আমাদের দেশে সবচেয়ে খারাপ দিক রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে। যারা মধ্যম আয়ের মানুষ, তাদের উন্নয়ন, জীবনমান, আয় সবকিছুই বাড়ছে। তাদের সবারই বছরে ১০ হাজার, ১৫ হাজার বা ২০ হাজার টাকা করে আয়কর দেওয়ার ক্ষমতা আছে। কিন্তু তারা দেয় না। আসলে আমরা নেই না। রিটার্ন দাখিল করে ১৭ লাখ মানুষ। সত্যিকারভাবে আমরা করযোগ্যদের করজালে আনতে পারিনি। তাদের করজালে আনার জন্য যা করা দরকার, সে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

তিনি বলেন, ইন্দোনেশিয়া বন্দরে স্ক্যানার বসিয়ে শুধু আমদানি-রপ্তানি করা পণ্য স্ক্যান করেই তাদের রাজস্ব আয় পাঁচ মাসে ৩২ শতাংশ বাড়িয়েছে। আমি ফিন্যান্স কমিটির সভাপতি থাকাকালে তিন-চারটা স্ক্যানার এনবিআরকে কিনে দিলাম। তখন এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, সেখান থেকে একটা আছে। চট্টগ্রাম বন্দরে ব্যবহার হচ্ছে। মুস্তফা কামাল সে সময় বলেন, ওগুলো ব্যবহার করা হয় না। আমাদের সবাইকে রাফ অ্যান্ড টাফ হতে হবে। আমরা এগুলো ব্যবহার করব।

‘যদি আমরা অপচয় বন্ধ করতে পারি, তাহলে আমাদের জায়গা অনেক প্রশস্ত হবে, অনেক গভীর হবে। এসব করতে অনেকে বাধা দেবেন। চট্টগ্রাম বন্দরে স্ক্যানার বসালে ঢাকায়ও বসাতে হবে। না হলে ঢাকা দিয়ে মাটি, পাথর রপ্তানি করে ১৫ শতাংশ নগদ সহায়তা নিয়ে যাবে। পাথর রপ্তানি করলে হয়তো রাজস্ব আসবে। কিন্তু সেজন্য তো আমরা নগদ প্রণোদনা দেব না। প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য। কিন্তু সেসব কিছুই পাচ্ছি না’ যোগ করেন মন্ত্রী।

এনবিআর চেয়ারম্যানকে নতুন অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী অর্থবছর আপনি আমাকে ৩ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব দেবেন। তখন এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, নিয়েন স্যার। জবাবে আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, আমি নেব না। আপনি দেবেন। এটা কোনো ব্যাপারই নয়।

রাজস্ব আদায় বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ১৫-২০ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করলে লোকজন দেবে না। বিদেশে গেলে দেখবেন সব দোকানে ক্যাশ রেজিস্টার আছে। ওখান থেকেই ভ্যাট আদায় হচ্ছে। তবে এজন্য রেট হতে হবে সহনীয়। আর আদায় করতে হবে শতভাগ। শতভাগ আদায়ের জন্য আমরা কোনো কিছুই করতে পারিনি। সব দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আমাদের ক্যাশ রেজিস্টার কিনে দিতে হবে। শতভাগ আদায়ের জন্য যা যা করতে হয়, সবই করতে হবে।

‘ফিন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান থাকাকালে আমি শুনলাম শহর এলাকার বাইরে দেশে মাত্র দুটি রাজস্ব সংগ্রহ করার অফিস আছে এনবিআরের। একটি লাকসামে, অন্যটি ভৈরবে। অথচ সবাই সব জায়গায় ব্যবসা করছে। সব জায়গায় শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। কিন্তু রাজস্ব পাওয়া যাচ্ছে না। এর বড় কারণ ছিল, জনবল সংকট। আর ইনকাম ট্যাক্স ইন্সপেক্টর নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা ছিল। তখন আমরা রাজস্ব কর্মকর্তা নামে ১৮০০-২০০০ নিয়োগ দিলাম। তারপর থেকে রাজস্ব বেড়েছে।

কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা প্রজ্ঞাবান মানুষ, কাজ করতে ভালোবাসেন। আপনারা কাজ করেছেন বলেই বাংলাদেশ সারাবিশ্বে আলোচিত একটি নাম। আমি মনে করি, সামষ্টিক ও ব্যাষ্টিক পর্যায়ে আপনাদের মনোযোগ দেওয়ার কারণেই এটি সম্ভব হয়েছে। এটি আমাকে গর্বিত করেছে। আমাদের দেশকেও গর্বিত করেছে। কাজ করতে হবে দেশের প্রতি ভালোবাসা ও মমত্ববোধ থেকে। দেশকে ভালো না বেসে কাজ করলে তা অর্থবহ হবে না।

কর্মকর্তাদের সৌভাগ্যবান হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আপনারা এমন একটি মন্ত্রণালয়ে কাজ করেন, যেটা বাংলাদেশের মূল চালিকাশক্তি। আপনাদের হাত দিয়েই আমাদের এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন। আমাদের সময় কম, সম্পদও অসীম নয়। অল্প সময়ে এই সম্পদের সঠিক ব্যবহার করে লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। খোলামেলা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব আমরা। অতীতে যা ঘটেছে, যা ঘটবে সেগুলো বিবেচনায় নিয়েই পরিকল্পনা সাজাব।

এ সময় অর্থ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

পরে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে মুস্তফা কামাল বলেন, ‘আমি মনে করি, কর্মকর্তাদের বেশির ভাগই সৎ। ব্যবসায়ীদেরও সবাই খারাপ না। আমাদের নজরদারিতে ঘাটতি রয়েছে। খেলাপি ঋণ এখন ১৩ শতাংশ। আমাদের হওয়া উচিত ৭ থেকে ৮ শতাংশ। খেলাপি ঋণ কমিয়ে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। এ জন্য অনেক বেশি শক্তিশালী ভূমিকায় যেতে হবে। আত্মীয়-স্বজন কাউকে চিনবেন না। আমার কাউকে চেনার দরকার নেই। যারা ভালো ঋণগ্রহীতা, তাদের আমরা প্রণোদনা দেব। তাদের সক্ষমতা বাড়িয়ে দেব। সুদহার একটা থাকবে না জানিয়ে তিনি বলেন, যে ঋণ নিয়ে পরিশোধ করে, আর যে করে না- দুজনকে আমরা এক জায়গায় নেব না। যারা ভালো, ঋণ নিয়ে ঋণ শোধ করে, তাদের উৎসাহ দেব। তাদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখলে খারাপরাও ঋণ পরিশোধে এগিয়ে আসবে।’

নতুন অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বন্ড মার্কেট গড়তে পারি নাই। বন্ড মার্কেট করতে পারলে ক্ষুদ্র সঞ্চয়ীদের রক্ষা করতে পারব। বিনিয়োগেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থায়ন সম্ভব হবে।’ ব্যাংকারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘কেউ ঋণের জন্য আসলে বলবেন, ঋণ দেব না, পুঁজিবাজারে যান। স্বল্পমেয়াদে চাইলে ঋণ দেবেন। আমরা ঢালাওভাবে সবাইকে বিদেশ থেকে ঋণ নিতে দেব না। যারা কর দেন, দেশে সম্পদ আছে- তাদের এ সুবিধা দেওয়া হবে, যাতে তারা ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাদের সম্পদ বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করা যায়।’

সুদের হার কমানোর ওপর জোর দিয়ে মুস্তফা কামাল বলেন, ‘স্প্রেড (ঋণ আমানতের সুদহারের তফাত) কমাতে হবে। ব্যাংকগুলোর বিপুল অর্থ খেলাপি ও অবলোপন করা আছে। তা না হলে স্প্রেড কমানো যাবে না। ব্যাংক স্প্রেড বেশি রাখে মুনাফার জন্য। কিন্তু ঋণের অর্থ যদি ফেরতই না আসে, তাহলে বেশি স্প্রেড রেখে লাভ কি?’

এ সময় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।