নির্বাচনী সহিংসতার জের এখনো থমথমে কলমা গ্রাম

নির্বাচনের আগে রাজশাহীর তানোর উপজেলার কলমা গ্রামে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের উত্তেজনা ও সহিংসতার জের ধরে এখনো থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। দুই পক্ষের উত্তেজনার কারণে কয়েকদিন ধরে গ্রামবাসী এক প্রকার অবরুদ্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত রবিবার বিকেলে রাজশাহীর জেলা প্রশাসক এস এম আবদুল কাদের ও পুলিশ সুপার মো. শহীদুল্লাহ ওই গ্রামে গিয়ে নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছেন। এরপরও আতঙ্ক কাটছে না বলে সাধারণ মানুষ জানিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রবিবার প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে গেলেও ওই রাতে পুলিশ বিএনপির সমর্থক কর্মীদের বেশ কয়েকটি বাড়িতে অভিযান চালিয়েছে। এ কারণে তারা নিজেদের নিরাপদ মনে করছেন না। 

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তানোরের কলমা গ্রামে বিএনপির কর্মী-সমর্থক তুলনামূলক বেশি। নির্বাচনের আগে থেকেই গ্রামে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চলছিল। ভোটের আগে আওয়ামী লীগের কার্যালয় ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। হামলা হয়েছে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ওপর। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে কলমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ওমর ফারুক চৌধুরী পান ৬৫৩ ভোট। আর বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার আমিনুল হক পান এক হাজার ২৪৯ ভোট। এরপর থেকে দুই পক্ষের উত্তেজনা আরো বাড়ে।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নির্যাতন, ভাঙচুরের পাশাপাশি পুলিশের অভিযানে এলাকা ছাড়েন পুরুষরা। নারীরা গ্রামে অবস্থান করলেও পুরুষরা অন্য এলাকায় গিয়ে অবস্থান নেন। ওই গ্রামের কেবল টিভির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। রাজশাহী থেকে বিল্লি বাজারগামী যাত্রীবাহী বাস চলাচল করত কলমা গ্রামের ভেতর দিয়ে। নির্বাচনের পর সেই বাসটি বিল্লি বাজার পর্যন্ত চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাসটি তানোর পর্যন্ত গিয়ে তাদের যাত্রা শেষ করে।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে গ্রামের এক বাসিন্দা বলেন, ‘এই গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে অথবা তানোর সদরে যেতে পারছে না সাধারণ মানুষ। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা বিল্লি বাজার, মালবান্ধা ও দরগাডাঙ্গা রাস্তায় দেখলেই আমাদের লোকজনকে মারধর করে। আমরা কলমা গ্রামের লোকজন নিরুপায় হয়ে পড়েছি।’

কলমা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হযরত আলী দাবি করে বলেন, ‘কলমা গ্রামে তা-ব চলছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও পুলিশের গায়েবি মামলার কারণে গ্রামে যেতে পারছি না আমরা।’ 

তবে, তানোর থানা যুবলীগের সভাপতি ও কলমা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লুৎফর হায়দার রশিদ ময়না দাবি করে বলেন, ‘ওই গ্রামে হামলা ভাঙচুরের কোনো ঘটনা ঘটেনি। বরং ভোটের আগে তারা আমাদের নির্বাচনী অফিস ভাঙচুর করেছে। ২৯ ডিসেম্বর তারা আমার ওপর হামলা চালিয়েছে। আমি কোনোমতে চলে আসতে পারলেও বেশ কয়েকজন কর্মীকে তারা এলোপাতাড়ি মারপিট করে আহত করে। এ নিয়ে মামলা হয়েছে। তারা গ্রেপ্তারের ভয়ে হয়তো এলাকা ছেড়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক। সোমবার সকাল থেকে বাসও চলাচল করেছে। আর ডিস লাইন বন্ধ করা হয়েছে বিল বকেয়া থাকার কারণে। ওই গ্রামে যিনি ডিস সংযোগ দেন তার কাছে ২৫ হাজার টাকা বকেয়া থাকায় লাইন বন্ধ করা হয়েছে। তবে জেলা প্রশাসকের নির্দেশের কারণে ডিস লাইনও চালু করে দেওয়া হচ্ছে।’  

তানোর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘সাধারণ মানুষের ভয়ের কোনো কারণ নেই। নির্বাচনের আগে সহিংসতার ঘটনায় মামলা হয়েছে। ও ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, শুধুমাত্র তাদেরকে আটকের জন্য পুলিশ কাজ করেছে। পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক রয়েছে।’ 

এদিকে, এসব ঘটনা জানার পর রবিবার বিকেলে উপজেলার কলমা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে কমিউনিটি পুলিশের আয়োজনে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার উপস্থিত হয়ে অপ্রীতিকর ঘটনাকে দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেন এবং এলাকার সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রাখতে দলমত নির্বিশেষে সকলের প্রতি আহ্বান জানান।