১০ লাখ প্রাণ, দুই হাজার বছর

 নিভৃতে বাতাস বয় হাজার মাইল পাড়ি দেই আমরাও। কেন এই দূর মরুভূমি পাড়ি? গড়তে এক মহাপ্রাচীর।

সপ্তম শতকে লেখা স¤্রাট ইয়াংদির এই কবিতাটি শত্রুর কাছ থেকে নিরাপদে থাকার জন্য শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চীনের মহাপ্রাচীর গড়ে  তোলার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে চীন প্রায় ৫০০০ মাইলের দীর্ঘ এই প্রাচীরটি গড়ে তুলেছিল। অসংখ্য ভাগে বিভক্ত এই প্রাচীর। ইতিহাসে যুগের পর যুগ ধরে এই প্রাচীর গড়ে তোলার সাক্ষ্য পাওয়া যায়। সেই অনুযায়ী, খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকে প্রথমবারের মতো এই সুবিশাল দুর্গ গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়। তবে, এই প্রাচীর নির্মাণের উল্লেখযোগ্য অংশটি ছিল মিং শাসনামল (১৩৬৮-১৬৪৪)। প্রকৌশলের এক আশ্চর্য নিদর্শন এই মহাপ্রাচীর মানবসভ্যতার বিজয় নিশানকেই উড়িয়েছে পৃথিবীর বুকে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক অবলম্বনে পরাগ মাঝি>

উত্তরের দুর্ধর্ষ যাযাবর

শুরুতে চীনাদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি ছিল তাদের উত্তর দিকের মোঙ্গল প্রতিবেশীরা। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকেই উত্তরাঞ্চলীয় যাযাবররা চীনাদের সীমান্তসংলগ্ন এলাকাগুলোতে বসবাস শুরু করেছিল। কঠোর সংগ্রামের মধ্য দিয়েই তারা ওই কঠিন এলাকায় বাস করত। এ সময় তারা কাপড় এবং বিভিন্ন শস্য বিনিয়োগ করত চীনাদের সঙ্গে।

সংখ্যার দিক দিয়ে চীনাদের চেয়ে অনেক কম হলেও ক্রমেই সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছিল এই যাযাবর গোষ্ঠী। ঘোড়ায় চড়া এই যাযাবররা ছিল ক্ষিপ্রগতির, দুর্ধর্ষ। তারা ধারালো অস্ত্র এবং তীর ধনুক ব্যবহার করত। তারা চাইলেই চীনা এলাকাগুলোতে আক্রমণ চালাত এবং লুট করে নিয়ে যেত ক্ষেতের ফসল আর গবাদি পশু। মাঝে মধ্যে গ্রামবাসীদের ধরে নিয়ে যেত। ওদের দমন করাও ছিল মুশকিল।তাই দমন না করে প্রতিরোধের পথ বেছে নেয় চীন। খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে এই প্রাচীর নির্মাণের কাজ শুরু হয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজা এই প্রাচীরের বিভিন্ন অংশ নির্মাণ করেন। তবে ২২০ থেকে ২০৬ খ্রিস্টপূর্ব শতাব্দীতে প্রাচীরের সবচেয়ে দীর্ঘ অংশ নির্মাণ করেন চীনের স¤্রাট ছিন শি হুয়াং। তিনি চীনের ছোট-বড় রাজ্যগুলো দখল করে এক বিরাট চীন সা¤্রাজ্য গড়ে তোলেন। এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন স্থানে গড়ে তোলা খ- খ- প্রাচীরগুলো জোড়া দিয়ে তিনি উত্তর সীমান্তজুড়ে মহাপ্রাচীর গড়ে তোলেন। ২০৬ খ্রিস্টাব্দে চীনের সর্বময় ক্ষমতায় আসে ‘হান’ রাজবংশ। ৪০০ বছরেরও বেশি সময়জুড়ে হান শাসনামলেও বাড়ানো হয় প্রাচীরের দৈর্ঘ্য।

চেঙ্গিসকে আটকাতে পারেনি

হান শাসনামলের পরও চীনারা তাদের মহাপ্রাচীর গড়ার কাজ অব্যাহত রাখে। এই সময়ে মোঙ্গল যাযাবররা মাঝেমধ্যেই আক্রমণ চালিয়ে প্রাচীর নির্মাণের কাজে বাধা দিত। এভাবে প্রায় হাজার বছর পর ত্রয়োদশ শতকে মোঙ্গলদের মধ্যে আবির্ভূত হন চেঙ্গিস খান। দুর্ধর্ষ এই যোদ্ধা মোঙ্গল জাতি-উপজাতিগুলোর মধ্যে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেন এবং তাদের ঐক্যবদ্ধ করে ১২১১ সালে প্রাচীর ভেদ করে চীনের উত্তরাঞ্চলে আক্রমণ করেন। চেঙ্গিসের পরাক্রমণের কাছে সহজেই হার মানলে ১২১৫ সালে রাজধানী দখল করে নেয় মোঙ্গলরা। বিজিত চীনা অঞ্চলে নিজের নাতি কুবলাই খানকে ক্ষমতায় বসিয়ে ইউয়ান রাজবংশের গোড়াপত্তন করেন চেঙ্গিস। ১৩৬৮ সালে চীনের সাধারণ মানুষ এবং চাষিরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইউয়ান রাজবংশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। উপায় না দেখে রাজধানী ছেড়ে মরুভূমিতে আশ্রয় নেয় চেঙ্গিস খানের বংশধররা। শুরু হয় মিং শাসনামল (১৩৬৮-১৬৪৪)। ইউয়ানরা যেন আর ক্ষমতায় না আসতে পারে প্রথম থেকেই খুব আক্রমণাত্মক ছিল মিং শাসকরা। কিন্তু ১৪৪৯ সালে তুমুল যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে হেরে যাওয়ার পর তারা আক্রমণাত্মক অবস্থান থেকে সরে আসেন। এভাবে আবার প্রতিরোধের দিকে মনোযোগ দেয় মিংরা এবং প্রাচীর নির্মাণ ও পুনর্গঠনের কাজে হাত দেয়। এই শাসনামলেও উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন সাধিত হয় মহাপ্রাচীরের। মহাপ্রাচীর শুধু যে যাযাবর লুটেরাদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করত তাই নয়। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের জন্যও এই প্রাচীর বেশ কার্যকর ছিল।

ওয়াচ টাওয়ার

চীনা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নথি থেকে জানা যায়, ১৪৪৩ সালে প্রচ- বাতাস আর ঠা-ার জন্য উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সৈনিকদের সংকুচিত করে নিয়ে আসা হয়। তারা মহাপ্রাচীরের সিগন্যাল টাওয়ারগুলোতে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছরও অবস্থান করত। এই সময়ে তারা নিজ বাহিনী, পরিবার-পরিজনদের থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকত। তারা প্রায়ই খাদ্যাভাব এবং কাপড়ের অভাবে পড়ত। প্রতি মাসে বেতন দেওয়া হলেও এগুলো তাদের অস্ত্র আর ঘোড়ার পেছনেই খরচ হয়ে যেত। ক্ষুধা এবং ঠা-ায় তারা তীব্র কষ্ট অনুভব করত। ১৫৫৪ সালের এক নথিতে প্রাচীরের ওয়াচম্যানদের কাপুরুষ বলে অভিযুক্ত করেন এক কর্মকর্তা। তার দাবি, শত্রুরা এলে তারা টাওয়ার ছেড়ে পালায়। বিশেষ করে মোঙ্গল বাহিনী আক্রমণ চালালে তারা সংকেত না দিয়েই পালাত। এ ক্ষেত্রে তারা মোঙ্গল বাহিনীকে দেখেনি বলে দায় এড়াত। জানা যায়, ২২০-২০৬ খ্রিস্টপূর্ব শতাব্দীতে শি হুয়াংয়ের আমল থেকেই নিরাপত্তার জন্য প্রাচীরে ওয়াচম্যানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। শক্রর দেখা পেলে ধোঁয়া উড়িয়ে সঙ্গীদের সংকেত দিত তারা।

মহাপ্রাচীরের নির্মাণ পদ্ধতি

মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় স্থাপনাতে তৎকালীন সেরা প্রকৌশলীদের অবদান সত্যিই প্রশংসার যোগ্য এবং তাদের দেখানো পথ এখনো ব্যবহার হয়ে আসছে। সাধারণ কিছু যন্ত্র ব্যবহার করে এত দীর্ঘ প্রাচীর নির্মাণ শুধু চৈনিক সভ্যতার দ্বারাই সম্ভব ছিল। তাদের হাতিয়ার বলতে ছিল কোদাল, খুরপি, হাতুড়ি, বাটালি, ছেনি শাবল এসব। একদল কাঠের ফ্রেম বানাত, একদল মাটি, পাথর ভরে দিত এবং শেষের দল তা চাপ দিয়ে শক্ত করত। বাইরের দিকে ছিল পোড়ামাটি বা ইট, যা প্রাচীরকে করত দুর্ভেদ্য। কিন্তু সব জায়গায় মাটি ছিল না। তখন প্রাচীন ইঞ্জিনিয়াররা দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিল। তার একটি উদাহরণ মরুভূমি। যেখানে টনকে টন মাটি নিয়ে গিয়ে প্রাচীর নির্মাণ অসম্ভব। এভাবে খাড়া পাহাড়, জঙ্গল বা জল কোনো কিছু আটকাতে পারেনি চীনাদের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকে। এই কর্মযজ্ঞ সাধন করতে গিয়ে কত শ্রমিক যে প্রাণ হারায়, তার লেখাজোখা নেই।

চীনের মহাপ্রাচীরের বিশালতা

বর্তমানে টিকে থাকা রাজাদের প্রাচীরের যোগফল ২১ হাজার ১৯৬ কিলোমিটার। যেখানে মিংদের সবচেয়ে বেশি। যা দিয়ে মিয়ামি থেকে উত্তর পোলে যাওয়া সম্ভব। বলা হয় ১-৩ অংশ গায়েব হয়ে গেছে। তাই প্রাচীরের সীমানা যদি আরও দীর্ঘ হয়, তবে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ এখনো গবেষণা চলছে। এর উচ্চতা, প্রস্থ বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন রকম। কিন্তু যে বিষয়টা একই রকম তা হলো, এর দুর্ভেদ্যতা।

প্রাচীরে পা না ফেললে

চীনা সংস্কৃতিতে বিশেষ প্রভাব রেখেছে তাদের মহাপ্রাচীর। প্রাচীরের বিভিন্ন অংশে মন্দির দেখা যায়। এসব মন্দিরে চীনারা তাদের ইতিহাসের মহৎ ব্যক্তিদের স্মরণ করে। এর মধ্যে জুয়ান ইয়োর নামটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চীনা এই বীর যোদ্ধা তৃতীয় শতাব্দীতে জেনারেল পদমর্যাদায় থাকা অবস্থায় শহীদ হয়েছিলেন। মহাপ্রাচীরকে চীনারা বীরত্বের নিদর্শন হিসেবেও মনে করে। চীনের বিপ্লবী নেতা মাও সেতুং এক জনসভায় বলেছিলেন, ‘যে চীনা কখনো মহাপ্রাচীরে পা ফেলেনি, সে সত্যিকারের পুরুষই নয়।’ মাও সেতুংয়ের উচ্চারিত ওই বাক্যটি একসময় চীনে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এবং এখন পর্যন্ত এটি বেশ প্রচলিত। তাই মনে মনে সব চীনা পুরুষই একবার হলেও মহাপ্রাচীরে পা রাখার পরিকল্পনা করে।

যেন এক ড্রাগন
পাহাড়, নদী, মরুভূমি পাড়ি দিয়ে চলা চীনের এই মহাপ্রাচীরকে কল্পনা করা হয় এক বিশাল ড্রাগনের সঙ্গে। পূর্বে শাং হাইকুয়ান থেকে পশ্চিমে টপলেক পর্যন্ত এর বিস্তৃতি। শুরু আর শেষের দিকে মহাপ্রাচীরকে দেওয়া হয়েছে ড্রাগনের মাথা আর লেজের আকৃতি। ড্রাগনের লেজ গিয়ে নেমেছে যেন সমুদ্রের পানিতে।

-     দুই হাজার বছর ধরে অনেক রাজা এবং শাসক এই মহাপ্রাচীর গড়ে তুলেছেন।

-      চীনের মহাপ্রাচীর শুধু একটি প্রাচীর নয়, বরং অসংখ্য ক্ষুদ্র প্রাচীরের সমন্বয়েই পাঁচ হাজার মাইল দীর্ঘ এই প্রাচীরটি। তাই প্রাচীরের সব জায়গার নির্মাণশৈলী এবং ব্যবহৃত উপাদান এক নয়।

-      চীনের মহাপ্রাচীরই পৃথিবীর বুকে মনুষ্য নির্মিত সবচেয়ে দীর্ঘ স্থাপনা।

-       মহাপ্রাচীর গড়তে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। তাই এটিকে দীর্ঘতম সমাধিক্ষেত্র বলেও অভিহিত করেন অনেকে। বন্দিদের শাস্তি হিসেবে এখানে কাজ করানো হতো বলেও উল্লেখ আছে।

-     প্রতি বছর প্রায় এক কোটি মানুষ এই প্রাচীর দেখতে যায়।

-     প্রাচীরটি নির্মাণ করতে যারা প্রাণ হারিয়েছিলেন, তাদের বংশধররা গ্রেটওয়ালে বেড়াতে গেলে তারা একটি মোরগকে দড়িতে বেঁধে নিয়ে যান, যেন এই প্রাচীর -       মহাপ্রাচীর নির্মাণে এর নকশা হিসেবে একটি ড্রাগনের প্রতিরূপকে অনুসরণ করা হয়েছে।

-      মহাপ্রাচীরের নানা অংশে পোড়া মাটি বা ইটকে থরে থরে সাজানোর জন্য আঠালো করে চালের আটা বা ময়দা ব্যবহার করা হয়েছে। আর এগুলো এত শক্ত করেই জুড়েছে, বহু বছর পরও সেখানে কোনো ঘাস জন্মাতে পারেনি।

-      অনেকেই বিশ^াস করেন মহাপ্রাচীর চাঁদ থেকেও দেখা যায়। এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা।

-      ১৮৯৯ সালে আমেরিকার একটি পত্রিকা দাবি করে, রাস্তা নির্মাণের জন্য চীনের মহাপ্রাচীর ভেঙে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু এ খবরটি ছিল একটি ‘ধাপ্পাবাজি’। এক দশক পর এই সত্যতা বেরিয়ে আসে।

-      মহাপ্রাচীর নির্মাণের আগেই ‘শিজিং’ নামে একটি কবিতা সংকলনে এর ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব একাদশ থেকে সপ্তম শতকের মধ্যে ওই কবিতাগুলো লেখা হয়েছিল।

-      মহাপ্রাচীরের বিভিন্ন অংশ এখনো আবিষ্কারের অপেক্ষায় আছে। সর্বশেষ ২০১২ সালে প্রাচীরের বিশাল একটি অংশ খুঁজে পায় প্রতœতাত্ত্বিকরা। এর আগে ২০০৯ সালেও এমন আবিষ্কার করেছিলেন তারা।

প্রাচীরের এই অংশটি মিং বংশের রাজত্বকালে তৈরি হয়েছে। প্রাচীর চিনের ১১টি বংশের রাজত্বকালে তৈরি হয়েছে। তার মধ্যে কিন, হান ও মিং, এই তিন বংশের রাজত্বকালেই তৈরি হয়েছে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার লম্বা প্রাচীর। আর তাই বিভিন্ন বংশের রীতি আলাদা থাকায় আসলে প্রাচীরের বিভিন্ন অংশের যেমন বয়সের ব্যবধান, তেমনই ব্যবধান আছে শিল্পরীতিতেও।