নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার পারমল্লিকপুর গ্রামে প্রতিপক্ষের হামলার ভয়ে দুই শতাধিক পরিবার ৮ মাস ধরে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে বিরোধের জেরে ওই সব পরিবারের সদস্যরা গ্রামে ফিরতে পারছেন না। ভেঙে ফেলা হয়েছে তাদের বাড়িঘর, আসবাব ও মূল্যবান জিনিসপত্র। এসব পরিবারের সন্তানদের পড়াশোনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে গ্রামের উজ্জ্বল ঠাকুরের সঙ্গে হেমায়েত হোসেন হিমুর দীর্ঘদিন থেকে বিরোধ চলে আসছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে লোহাগড়া উপজেলার পারমল্লিকপুর গ্রামের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিধ্বস্ত একটি গ্রাম। ভাঙাচুরা ঘরবাড়িতে মানুষের বসবাস না থাকায় যেন অনেক বাড়ি ঘাস ও লতাপাতায় ছেয়ে গেছে। গ্রাম্য কোন্দলের জের ধরে প্রতিপক্ষের পাকা ভবন কিংবা আধাপাকা বেশ কিছু ঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে । খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও পূর্বশত্রুতার জের ধরে ২০১৬ সালে দুপক্ষের সংঘর্ষে গ্রামের নূর ইসলাম ও ইকবাল মৃধা নামে দুজন নিহত হন। ওই সময় বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
সর্বশেষ ২০১৮ সালের ২১ এপ্রিল দুপক্ষের সংঘর্ষে খায়ের মৃধা খুনের ঘটনায় গ্রামের মাতবর উজ্জ্বল ঠাকুর পক্ষের হামলায় হেমায়েত হোসেন হিমু পক্ষের সমর্থকদের অন্তত ২০০ বাড়িঘর ভেঙে ফেলা হয়। খুলে নেওয়া হয়েছে এসব বাড়িঘরের জানালা, দরজা এবং লুট করা হয়েছে মূল্যবান আসবাব।
ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, হিমু পক্ষের মজিবর মৃধা, তজিবর মৃধা, নূর ইসলাম মৃধা, রাসেল মৃধা, মুক্তার মৃধা, নাইম মুসল্লী, ইকবাল মৃধা, হুমায়ুন মৃধা, কায়েম মৃধা, ওলিয়ার শেখ, খোকন মুসল্লী, তবিবর মোল্যাসহ ১৮ পরিবারের পাকা ভবন এবং হেমায়েত হোসেন হিমু, বাদশা মৃধা, লুৎফর মৃধা, হোমেত মৃধা, বিপ্লব শেখ, লিটু শেখ, রাজা মৃধা, জামাল মোল্যা, এনায়েত মোল্যা, আমিনুর রহমান বাবলু, মজিবুর রহমান শেখ, নান্নু শেখ, শুকুর শেখ, সামাদ শেখ, হোসেন শেখ, টফি শেখ, সোহরাব শেখ, এরশাদ শেখ, সাহিদ কাজী, ওলিয়ার রহমান কাজী, আকরাম মুন্সী, রিজ্জাক মুন্সী, হাসান বিশ্বাস, রেজাউল বিশ্বাস, জলিল শেখ, নাজির মৃধা, পান্নু মৃধা, ইলিয়াস মৃধা, হাই শেখ, বালাম শেখ, কাফী মৃধা, মফিজ মৃধা, ইকরাম মৃধা, খোকন মুসল্লী, আব্দুল্লাহ সরদার, আকরাম সরদার, লাহু মুন্সী, আনোয়ার গাজী, দবির উদ্দিন শেখ, কামাল মোল্যা, আছলাম মোল্যা, ইউনুছ কাজী, হামিম কাজী, রাজা মিয়া, হিরু শেখ, হাসান শেখ, সুমন শেখ, রবিন শেখ, ছিকুল মোল্যার বাড়িসহ দুই শতাধিক ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে।
মল্লিকপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পারমল্লিকপুর গ্রামের হেমায়েত হোসেন হিমু বলেন, ‘খায়ের মৃধা খুনের পর থেকে উজ্জ্বল ঠাকুরের লোকজন আমাদের পক্ষের লোকজনের অন্তত ২০০ বাড়িঘর ভাঙচুর এবং লুটপাট করেছে। আমাদের পক্ষের ১৮ বিল্ডিং, ৮৫ আধাপাকা ঘর ও শতাধিক টিনের ঘর ভেঙে লুটপাট করেছে। নষ্ট করে ফেলা হয়েছে টিউবয়েল, বাথরুমসহ অন্য মূল্যবান জিনিসপত্র।
ক্ষতিগ্রস্ত মো. ওহিদুজ্জামান বলেন, খায়ের মৃধা হত্যকান্ডের পর থেকে অনেক পরিবারকে গ্রাম ছেড়ে আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি ও শহরে বাসা ভাড়া করে থাকতে হচ্ছে। অনেকের ছেলেমেয়ের পড়াশোনা বন্ধ রয়েছে। আর্থিক অসচ্ছলতায় মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন কেউ কেউ।
এ ব্যাপারে উজ্জ্বল ঠাকুর বলেন, ‘২০১৬ সালে এই গ্রামের নূর ইসলাম ও ইকবাল মৃধা খুন হওয়ার পর আমাদের বাড়িঘর ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিল। এবার খায়ের মৃধা মার্ডার হওয়ার পর আমাদের লোকজন ওদের কিছু বাড়িঘর ভাঙচুর করেছে। আমি মল্লিকপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য। উভয়পক্ষ যাতে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে সে জন্য লোহাগড়ার থানার ওসি সাহেব আমাদের ডেকেছিলেন। আশা করা যায় ঝামেলা মিটে যাবে।’
লোহাগড়া থানার ওসি প্রবীর কুমার বিশ্বাস বলেন, মানবিক দিক বিবেচনা করে অতিসত্বর এসব পরিবারকে বাড়িতে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ গ্রামের মানুষ যাতে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারে সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।