নতুন মজুরি কাঠামো নিয়ে অসন্তোষের জের ধরে গতকাল মঙ্গলবারও তৃতীয় দিনের মতো রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাসহ সাভার ও গাজীপুরে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেছে তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের সময় সাভারে গুলিবিদ্ধ হয়ে এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গাজীপুর, উত্তরা, দক্ষিণ খান ও মিরপুরের কালশীতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভের সময় সংঘর্ষে অন্তত ১০০ জন আহত হয়েছে। এ সময় কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর ও একটি মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়া হয়। বিক্ষোভের সময় দুপুর ২টা পর্যন্ত অন্তত ছয় ঘণ্টা সংশ্লিষ্ট এলাকার সড়ক কার্যত বন্ধ ছিল। দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে বিস্তারিত :
সাভার : সাভারে বেতন-বৈষম্যের অভিযোগ তুলে বিক্ষোভরত শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে সুমন মিয়া (২২) নামে এক শ্রমিকের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় মুকুল নামে আরেক শ্রমিককে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
নিহত সুমন শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার কলাকান্দা গ্রামের আমের আলীর ছেলে। তিনি সাভারের উলাইল কর্ণপাড়া এলাকায় ভাড়া বাসায় থেকে উলাইল এলাকার আনলিমা অ্যাপারেলস পোশাক কারখানার ষষ্ঠতলায় ফিনিশিং সেকশনে কাজ করতেন বলে তার সহকর্মীরা জানান।
আনলিমা অ্যাপারেলসের ছয়তলার কাটিং সেকশনে কর্মরত নিহতের সহকর্মী রিপন জানান, দুপুরে খাবারের বিরতির পর সুমন কারখানায় ফেরার পথে উলাইলের স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের সামনে শ্রমিক-পুলিশের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে গুলিবিদ্ধ হন। তাকে উদ্ধার করে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, সুমন মিয়া নামে এক শ্রমিককে তার সহকর্মী রিপন মিয়া ও পুলিশ বিকেল সোয়া ৪টার দিকে নিয়ে আসে। তার বুকের বাম পাশে গোল চিহ্ন রয়েছে তা গুলির দাগ কি না ময়নাতদন্তের পর জানা যাবে। এ ছাড়া মো. মুকুল নামে আরেক শ্রমিকের বাম উরুর পেছনে গুলি পাওয়া গেছে।
সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আমজাদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ এক ব্যক্তিকে হাসপাতালে আনার আগেই তিনি মারা যান। পরে সাভার মডেল থানার ওসি আবদুল আউয়াল স্বাক্ষর করে নিহতের মৃতদেহটি নিয়ে যান।’
আশুলিয়া শিল্প পুলিশের পরিচালক সানা শামিনুর রহমান বলেন, ‘গুলিবিদ্ধ হয়ে এক শ্রমিক মারা যাওয়ার খবর শুনেছি। তবে আমাদের সাথে ওই কারখানার শ্রমিকদের কোনো সংঘর্ষ কিংবা গুলির ঘটনা ঘটেনি।’
শ্রমিককে গুলি করে হত্যার ঘটনায় নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার ও সাধারণ সম্পাদক জুলহাসনাইন বাবু। বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন বলেন, ‘গুলিবিদ্ধ হয়ে এক শ্রমিক নিহতের খবর শুনেছি। তবে ওই কারখানায় আমাদের কোনো লোক না থাকায় বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারিনি।’
এর আগে হেমায়েতপুরের পদ্মার মোড় বাগবাড়ি এলাকায় স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের শামস স্টাইল ওয়্যারস লিমিটেডের শ্রমিকরা সকালে কারখানায় কাজে যোগ না দিয়ে কারখানার পাশে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। একপর্যায়ে তাদের সঙ্গে আশপাশের বেশ কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরাও যোগ দেয়। পরে তারা হেমায়েতপুর-শ্যামপুর সড়কে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে ধাওয়া দেয়। এতে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয় এবং গুলি ছোড়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশ শ্রমিকদের ওপর জলকামান নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষে পুলিশ সদস্যসহ আহত হয় অর্ধশতাধিক শ্রমিক। দুপুর ১টা পর্যন্ত চলে শ্রমিক-পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার শেল, রাবার বুলেট, জলকামান ও সাজোয়াঁ যান নিয়ে শ্রমিকদের প্রতিহত করে দিলে তারা চলে যায়।
অন্যদিকে সাভার পৌর এলাকার দক্ষিণ দরিয়াপুর মহল্লার জে কে গ্রুপের তনিমা নিট কম্পোজিট, উলাইল, আশুলিয়ার কাঠগড়া ও চারাবাগ এলাকার কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা একই দাবিতে করেছে। একপর্যায়ে পুলিশ লাঠিপেটা করে ও টিয়ার শেল ছুড়ে তাদের সরিয়ে দেয়।
গাজীপুর : গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের পরিদর্শক আনিসুর রহমান জানান, ভোগড়া বাইপাস এলাকার ভিঅ্যান্ডআর পোশাক কারখানার কয়েকশ শ্রমিক দুপুর ২টার দিকে বিক্ষোভ মিছিল সহকারে ভোগড়া বাইপাস সড়কে নেমে এসে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে। এ সময় ওই সড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে শ্রমিকদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দিতে চাইলে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় উত্তেজিত শ্রমিকরা পুলিশের একটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে পুলিশ কয়েক রাউন্ড কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে শ্রমিকদের সরিয়ে দিলে বিকেল ৪টার দিকে ওই সড়কে যানবাহন চলাচল শুরু হয়।
একই দাবিতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভোগড়া, ছয়দানা, চান্দনা-চৌরাস্তা এলাকার বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা মহাসড়কে নেমে আসে। প্রায় ঘণ্টাখানেক ওই মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে।
দক্ষিণখান : দক্ষিণখান থানার এসআই সুজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, শ্রমিকরা সকাল ৮টার দিকে দক্ষিণখানের নিপা গার্মেন্টসের সামনে অবস্থান নেয়। পুলিশ তাদের রাস্তা থেকে সরাতে গেলে সংঘর্ষ বেধে যায়। এতে দুই পুলিশ সদস্য ও অন্তত ১০ জন শ্রমিক আহত হয়। পরে তারা বেলা ২টার দিকে অবরোধ তুলে নেয়।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দক্ষিণখান থানা রোডের বাসিন্দা হাসান জানান, সকাল ১০টার দিকে পোশাক শ্রমিকরা নিপা গার্মেন্টসের সামনে একটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেন। এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়।
উত্তরা : উত্তরার আবদুল্লাহপুর ও আজমপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বিক্ষোভ করে। তারা উত্তরার আজমপুরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক কিছু সময় আটকে রাখে। শ্রমিকরা সরতে না চাইলে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছোড়ে। পরে তারা সরে গিয়ে বিমানবন্দরসংলগ্ন রেললাইনের ওপর অবস্থান নেয় এবং দুটি গাড়ি ভাঙচুর করে।
এ ছাড়া সকাল ৮টার পর থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত মিরপুরের কালশীতে সড়ক অবরোধ করে স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্টসের শ্রমিকরা। তাদেরকে সরিয়ে দিতে গেলে পুলিশের সঙ্গে কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের পল্লবী জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহেনশাহ মাহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শ্রমিকরা সকালের দিকে কিছুটা বিক্ষোভ করেছে। পরে তারা রাস্তার একপাশে গিয়ে সেখানে গান টান গায়।’