পোশাকশিল্পে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করুন

মজুরি কাঠামোর অসঙ্গতি নিরসন এবং বেতন বাড়ানোর দাবিতে পোশাকশিল্প শ্রমিকদের আন্দোলনকে অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। গত বছরের ২৫ নভেম্বর নতুন মজুরি কাঠামো অনুমোদনের আগে শেষবার এই শ্রমিকদের বেতন বেড়েছিল ২০১৩ সালে। এবার তাদের দাবি ছিল, ন্যূনতম বেতন ১০ হাজার টাকা করার। সরকার সেটা ৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করলে অসন্তোষ সত্ত্বেও শ্রমিকরা তা মেনে নিয়েছিল। কিন্তু নতুন কাঠামোয় প্রথম মাসের বেতন পেয়ে শ্রমিকরা দেখল কয়েকটি গ্রেডে বেতন তো বাড়েইনি বরং কমেছে। এ কারণেই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং রাজপথে আন্দোলনে নামে শ্রমিকরা। রাজধানীর পোশাকশিল্প কেন্দ্রগুলোতে টানা কয়েকদিনের বিক্ষোভ-সহিংসতার মধ্যে পুলিশের গুলিতে সুমন মিয়া নামের এক শ্রমিক নিহত হলে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে পড়ে।

নতুন মজুরি কাঠামোর কয়েকটি অসঙ্গতি বিশেষ পর্যালোচনার দাবি রাখে। ২০১৩ সালের মজুরি কাঠামো অনুসারে প্রতিবছর শ্রমিকদের মূল বেতন ৫ শতাংশ হারে বেড়েছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে জিনিসপত্রের দাম। ২০১৩ থেকে ’১৮ সালের মাঝে এই পাঁচ বছরে মূল্যস্ফীতির হার গড়ে ৬ শতাংশের মতো। কিন্তু ২০১৮ সালের নতুন মজুরি কাঠামোতে এসেও মূল বেতন সেই তুলনায় বাড়েনি। এবার তৃতীয় গ্রেডে মূল বেতন বেড়েছে ২৬ দশমিক ৬২ শতাংশ, চতুর্থ গ্রেডে মূল বেতন বেড়েছে ২৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং পঞ্চম গ্রেডে মূল বেতন বেড়েছে ৩২ দশমিক ২৯ শতাংশ।  তবে, সর্বনি¤œ বা সপ্তম গ্রেডে বেতন আগের চেয়ে দুই হাজার ৭০০ টাকা বেড়েছে। কিন্তু কারখানাগুলোতে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক কাজ করে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম গ্রেডে। ফলে বলা যায়, নতুন শ্রমিকদের বেতন বাড়লেও পুরনো শ্রমিকদের বেতন সেই অর্থে বাড়েনি। এ ছাড়া বাড়িভাড়া-যাতায়াত-খাদ্য-চিকিৎসাভাতা বাড়লেও শ্রমিকদের প্রধান আপত্তির জায়গা হলো, মূল বেতন না বাড়ায় তাদের ওভারটাইম ও উৎসব ভাতা বাড়বে না।

শ্রমিক মজুরি বাড়ানোর এই চিত্রের বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে পোশাকশিল্প মালিকদের সরকারি সুযোগ-সুবিধার বাড়ানোর ক্ষেত্রে। মাত্র গত সপ্তাহেই শ্রমিক মজুরি বাড়ানোর কারণ দেখিয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে উৎসে কর দশমিক ৬০ থেকে কমিয়ে দশমিক ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। দেশীয় কাপড় ব্যবহারে ৩ শতাংশ নগদ প্রণোদনা এবং অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানিতে ৩ শতাংশ নগদ প্রণোদনা পাচ্ছেন মালিকরা। এ ছাড়া কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ কারখানা মালিকদের করপোরেট কর কমিয়ে ১২ শতাংশ করা হয়েছে। দেশে বৈদেশিক আয়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস পোশাকশিল্প উদ্যোক্তাদের সরকারি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে এই খাতের সুরক্ষা নিশ্চিত করা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত সুরক্ষার পরও এই খাতের শ্রমিকরা মজুরিসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধার ক্ষেত্রে কেন এতটা বঞ্চিত হবে?

তৈরি পোশাকের বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আর শ্রমিকদের অবস্থানের বেলাতেও একই রকম বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। গত বছর তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানির প্রবৃদ্ধি ছিল ১৫ শতাংশ। কিন্তু তৈরি পোশাকশিল্পের যে শ্রমিকদের শ্রমে-ঘামে দেশের এই উন্নতি, সেই শ্রমিকরা দুনিয়ায় সবচেয়ে কম মজুরি পায় এবং সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ কর্মপরিবেশে কাজ করে। দুর্ঘটনায় হতাহতের বিচারেও তৈরি পোশাক খাতের এই শ্রমিকরাই সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি। পোশাকশিল্প খাতে শ্রমিকদের মজুরিসহ বিদ্যমান এসব সংকটের ন্যায্য সমাধান করা না গেলে এই শিল্পের অগ্রগতি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হতে পারে।

দেশের শীর্ষ এই শিল্প খাতটির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার, মালিক ও শ্রমিক সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে। অবিলম্বে মজুরি কাঠামোর সংকট নিরসনে সরকার ও মালিকপক্ষকে যেমন ছাড় দিতে হবে, তেমনি শ্রমিকদেরও কোনো পরিস্থিতেতেই সহিংসতার পথে যাওয়া ঠিক হবে না। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মধ্য দিয়েই দাবি-দাওয়া আদায়ের পথে থাকতে হবে শ্রমিকদের। কেননা, সহিংসতার কারণে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হলে কাজের সুযোগ হারিয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে তারাই। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও শ্রমিক আন্দোলন মোকাবিলায় আরো বেশি সংবেদনশীল হতে হবে। সংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিকতা এবং সংবেদনশীলতার মধ্য দিয়ে তৈরি পোশাকশিল্পের ধারাবাহিক অগ্রগতি বজায় থাকবে এটাই প্রত্যাশা।