স্মরণসভায় বক্তারা

সৈয়দ আশরাফের মতো নেতা চায় মানুষ

‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। মাটির কাছাকাছি থেকেও নিজেকে আকাশের উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারার মতো বিরল ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি। তার মতো নির্মোহ, সৎ ও নিষ্ঠাবান রাজনীতিবিদ বিরল। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী হলেও, ক্ষমতা কিংবা অর্থের মোহ তাকে ছোঁয়নি। আড়ালে থাকলেও সবার প্রিয় হয়ে ওঠার অসামান্য ক্ষমতা ছিল তার।’ গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট আয়োজিত স্মরণসভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

স্মরণসভায় বক্তব্য দেন সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও জাসদ (ইনু) সভাপতি হাসানুল হক ইনু, সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূর এবং নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন জোটের সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ। শ্রদ্ধাঞ্জলি পাঠ করেন জোটের সাবেক সভাপতি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ। সভার শুরুতে ‘তুমি, নির্মল কর, মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছায়ে’ পরিবেশন করেন গণসংগীত শিল্পী সমন্বয় পরিষদের শিল্পীরা। এরপর সৈয়দ আশরাফের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। স্মরণসভায় হাসানুল হক ইনু বলেন, যারা রাজনীতি করে, তারা ফেরেশতা নয়, শয়তানও নয়। তারা দোষে-গুণে মানুষ। কিন্তু যারা দোষ না করে গুণে এগিয়ে থাকেন তারা মহান মানুষ, ভালো গুণের মানুষ। সৈয়দ আশরাফ তেমনি একজন ছিলেন। তিনি ছিলেন গুণী মানুষ, সাহসী মানুষ, দক্ষ মানুষ। এক-এগারোর সময় যখন অনেকে বিভ্রান্ত হয়েছিলেন, সৈয়দ আশরাফ বিন্দুমাত্র বিভ্রান্ত হননি। তিনি নীতিমান ছিলেন, নিষ্ঠাবান ছিলেন, আদর্শবান ছিলেন, কুশলী ছিলেন, সজ্জন ছিলেন। ক্ষমতা ও টাকার পেছনে ছোটেননি কখনো। এসব বিষয় তার কাছ থেকে শেখার আছে আমাদের।

আসাদুজ্জামান নূর বলেন, রাজনীতিবিদ হয়, সংসদ সদস্য হয়, মন্ত্রী হয়। কিন্তু একজন সৈয়দ আশরাফ সহজে হয় না। ক্ষমতায় থেকেও ক্ষমতার মোহ থেকে তিনি নিজেকে সব সময় মুক্ত রেখেছেন। তার অন্তিমযাত্রায় লাখো মানুষের ঢল প্রমাণ করে, এ দেশের মানুষ সৈয়দ আশরাফের মতো লোককেই নেতা হিসেবে চায়। লাখো মানুষের অশ্রুসিক্ত চোখ এ কথাই বলে, এ দেশের মানুষ সৈয়দ আশরাফের আদর্শকে লালন করতে চায়।

সৈয়দ আশরাফের রাজনৈতিক জীবনের কথা উল্লেখ করে নূর বলেন, দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। কিন্তু এই পদ তাকে কখনো আচ্ছন্ন করেনি। নিজেকে কিছুটা আড়ালে রেখে সুচারুভাবে দলকে পরিচালনা করেছেন তিনি। তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা ছিল প্রবাদপ্রতিম। একজন রাজনীতিকের জীবনে এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কিছু হতে পারে না। একই সঙ্গে ঈর্ষণীয় ও অনুকরণীয় এ রকম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সমকালীন সময়ে খুব একটা দেখা যায় না।

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সৈয়দ আশরাফ ছিলেন একজন নির্লোভ মানুষ। তিনি বাংলাদেশকে ভালোবাসতেন। যে স্বপ্ন নিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তিনি সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করেছিলেন। তিনি নেই। তাকে সামনে রেখে আমাদের সামনের পথ চলতে হবে।

অনুষ্ঠানে জীবনানন্দ দাশের কবিতা ‘আবার আসিব ফিরে’ পাঠ করেন সৈয়দ হাসান ইমাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পরিচয়’ পাঠ করেন ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈয়দ শামসুল হকের ‘আমার পরিচয়’ পাঠ করেন আহকাম উল্লাহ এবং রেজিনা ওয়ালী লীনা পাঠ করেন শামসুর রাহমানের ‘পান্থজন’। অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে সৈয়দ আশরাফ শুনতেন শাহ আবদুল করিমের ‘বন্দে মায়া লাগাইছে’ গানটি। স্মরণসভায় এই গান গেয়ে শোনান শিল্পী লাভলী দেব। শিল্পী মহিউজ্জামান চৌধুরী গেয়ে শোনান দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে’।

গণসংগীত শিল্পী সমন্বয় পরিষদের শিল্পীদের কণ্ঠে ‘আমরা সবাই বাঙালি’ গানটি গীত হওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয় অনুষ্ঠান। সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ৬৭ বছর বয়সে গত ৩ জানুয়ারি চিকিৎসাধীন অবস্থায় থাইল্যান্ডের একটি হাসপাতালে মারা যান।