আত্মসমালোচনার সুযোগ আ.লীগকেই তৈরি করতে হবে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। নতুন মন্ত্রিসভায় তার প্রতিফলন দেখা গেছে। এবার যে মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে, সেখানে ২৭ জনই প্রথমবারের মতো মন্ত্রী হয়েছেন। একে ইতিবাচকভাবে দেখার অনেক সুযোগ আছে। প্রধানমন্ত্রীর আত্মবিশ্বাসের মাত্রা অনেক উঁচুতে না হলে তিনি তোফায়েল আহমেদ, আমির হোসেন আমু বা তাদের মতো বাঘা বাঘা আওয়ামী লীগ নেতাদের বাদ দিয়ে মন্ত্রিসভা করার সাহস করতে পারতেন না। আমার মনে হয়, এই যে আমরা বড় বড় নেতাদের ছাড়া ভাবতেই পারতাম না, এটা আমাদেরই একটা দীনতা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সেটা করে দেখিয়েছেন।

প্রাথমিক প্রতিক্রিয়াতে সাধারণ মানুষও নতুন মুখের এই মন্ত্রিসভাকে স্বাগত জানিয়েছে। এর একটা কারণ হতে পারে যে, প্রায় এক দশক ধরে টানা ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের অনেক মন্ত্রী এবং বড় বড় নেতাদের বিরুদ্ধেই ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ছিল, কারও কারও ব্যাপারে স্পষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। অনেক মন্ত্রীর দায়িত্ব পালনে চরমভাবে ব্যর্থ হওয়ার দৃষ্টান্ত আছে। শিক্ষামন্ত্রীর কথা বলা যায়, তিনি প্রশ্নফাঁস রোধের ব্যাপারে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন। মানুষ হয়তো এই বিষয়গুলো চিন্তা করে, পরিবর্তনের আশা করে। নতুন মন্ত্রিসভা দেখে অনেকে হয়তো তাই আশাবাদী হয়েছে।

তবে, নতুন মন্ত্রিসভার কয়েকটি দিক নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। এখানে নতুন যাদের নেওয়া হয়েছে তাদের সবার সম্পর্কে যথাযথ বিচার-বিবেচনা করা হয়েছে বলে মনে হয় না। আমি আমার জেলা এবং পরিচিতজনদের কাছ থেকে কয়েকটি জেলা সম্পর্কে যতটা জেনেছি তাতে কিন্তু বলতে হয়, অনেক অভিযোগ আছে এমন কেউ কেউও কিন্তু এই নতুন ২৭ জনের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী হয়তো বিবেচনা করেছেন, যেসব জেলা বা জায়গা থেকে সতেরো-আঠারো বছরেও কেউ মন্ত্রী হয়নি সেসব স্থানকে এবার গুরুত্ব দিতে। যাদের বয়স হয়তো পঞ্চাশের নিচে, কিংবা যাদের পরিবার হচ্ছে পরীক্ষিত আওয়ামী পরিবার এই রকম বিবেচনাগুলো হয়তো তার কাছে প্রাধান্য পেয়েছে।

নতুন মন্ত্রিসভার দুটি বৈশিষ্ট্যের কথা বিশেষভাবে বলতে হবে। এক. এবার মন্ত্রিসভায় রাজাকার বা যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাউকে নিতে দেখা যায়নি। দুই. মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়স্বজনদের কাউকে রাখা হয়নি। এই দুটো বিষয়ই কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর আত্মবিশ্বাস এবং দৃঢ়তার দৃষ্টান্ত। নতুন মন্ত্রিসভার তারুণ্যের কথা বলা হচ্ছে। এটা ঠিক যে আমাদের অবশ্যই তারুণ্য প্রয়োজন, উদ্যমী মানুষ দরকার। কিন্তু একই সঙ্গে প্রজ্ঞাটাও জরুরি। কিন্তু সে রকম প্রজ্ঞাবান মানুষের সংখ্যা কিন্তু এখানে কম বলে মনে হয়েছে আমার কাছে। কারণ একটা রাষ্ট্র চালাতে হলে, রাজনীতি-কূটনীতি-অর্থনীতি সবকিছু দেখেশুনে বুঝে পরিচালনার জন্য অভিজ্ঞ ও প্রজ্ঞাবানদের প্রয়োজন আছে। আর কাকে কোন মন্ত্রণালয় দেওয়া হবে সেটা নিয়ে হয়তো আরও চিন্তাভাবনার সুযোগ ছিল বলে আমার কাছে মনে হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী যে মন্ত্রিসভার সদস্যদের নজরদারিতে রাখাতে চান সেটার ইঙ্গিত কিন্তু পাওয়া গেল মন্ত্রিদের পিএস-এপিএস নিয়োগ নিয়ে সতর্কতা ও শর্ত আরোপের মধ্য দিয়ে। মন্ত্রীরা এমন লোককে পিএস নিয়োগ করত যার মাধ্যমে আসলে সব দুর্নীতি এবং অপকর্মগুলো নিয়ন্ত্রণ করতেন তারা। শুরুতেই সেই জায়গাটা ভেঙে দেওয়া নতুন মন্ত্রীরা অবশ্যই সতর্ক হবেন বলে আশা করা যায়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে পিএস নিয়োগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে হয়তো স্বচ্ছতার জায়গাটা আরেকটু প্রসারিত হলো।

আরেকটি বিষয় হলো, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মিত্র বা মহাজোটের শরিকদের কেউ মন্ত্রিসভায় না থাকা। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি এবং অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল শক্তি হিসেবে পরিচিত যে দলগুলোর সঙ্গে মহাজোট করে আওয়ামী লীগ নির্বাচন করেছে এবং আগের সরকারগুলোতেও তাদের সঙ্গে যারা ছিল এবার এখনো পর্যন্ত তারা নেই।

আমার মনে হয় এই মন্ত্রিসভা হয়তো সামনে আরো বর্ধিত হতে পারে। কিন্তু সেটা যদি হয়ও, তাহলে একটি বিষয় লক্ষ রাখতে হবে। ওয়ার্কার্স পার্টি বা জাসদের বড় নেতা যারা মন্ত্রী ছিলেন, তাদের সম্পর্কে কিন্তু অনেক অভিযোগ আছে, বাচালতার অভিযোগ, দুর্নীতির অভিযোগ, ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে অভিযোগ আছে। সেসব পত্রপত্রিকায় এসেছে, জনমনেও সেসব আছে।  এখন যদি ওয়ার্কার্স পার্টি বা জাসদ থেকে কাউকে মন্ত্রী করা হয়, তাহলে কি আমরা আবার রাশেদ খান মেনন বা হাসানুল হক ইনুকেই দেখব? আমার মনে হয়, সেটা ঠিক হবে না বা তার সুযোগও হয়তো নেই।

প্রধানমন্ত্রী যেমন আওয়ামী লীগ থেকে প্রবীণ ও বড় নেতাদের বাদ দিয়ে নতুনদের নিয়ে কাজটা করে দেখিয়েছেন, তেমনি মেনন বা ইনু সাহেবকেও সেই উদারতা দেখাতে হবে। নিজেদের দল থেকে তারা ফজলে হোসেন বাদশা বা শিরীন আখতারের মতো নেতাদের সামনে নিয়ে আসতে পারেন। তাহলে হয়তো মানুষও সেটার প্রশংসা করবে, তখন এটাও একটা দৃষ্টান্ত হবে।

আমাদের রাজনীতিতে এখন একটা প্রজন্মগত পরিবর্তন সময়ের দাবি, এটা খুব দরকার। পুরো পৃথিবীর ভূ-রাজনীতি যেমন পাল্টে গেছে, তেমন বাংলাদেশের রাজনীতি-অর্থনীতি এসবও কিন্তু অনেক পাল্টে গেছে। পুরনো-প্রাচীন চিন্তার লোকদের দিয়ে কিন্তু আর এই নতুন সময়কে মোকাবিলা করা যাবে না। একটা নতুন বাংলাদেশ একুশ শতকের নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের নতুন প্রজন্মকে রাজনীতিতে শক্তিশালী করতে হবে।

পুরনোদের মাইন্ডসেটের মধ্যেই অনেক সমস্যা আছে। পুরুষতান্ত্রিকতা আছে, প্রযুক্তি নিয়ে জড়তা আছে, ভীতি আছে, প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে তাদের অনেক প্রথাগত সমস্যা আছে। পুরনোদের মধ্যে অসংবেদনশীল চিন্তাগুলো রয়ে গেছে, এগুলো থেকে বেরিয়ে এসে একটা নতুন বাংলাদেশ গড়াটাই এখন চ্যালেঞ্জ। যে তরুণরা দেশে-বিদেশে ভালো লেখাপড়া করেছেন, দেশ-দুনিয়া দেখে এসেছেন, নতুন জমানার জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কে যাদের জানাশোনা আছে তেমন মানুষদের আমাদের সবখানে সামনে নিয়ে আসা দরকার।

তবে যেই প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে, একাদশ জাতীয় সংসদ কি একটা কার্যকর সংসদের রূপ নেবে? এই জায়গাটাতে আমাদের হতাশা ব্যক্ত করতেই হবে। যে কেনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটা প্রধান শর্ত হলো একটা শক্তিশালী বিরোধী দল। সেটা এখানে থাকছে না। বিএনপি-ঐক্যফ্রন্ট সংসদে যায়নি। পতিত স্বৈরাচার এরশাদের জাতায় পার্টি এখন আনুষ্ঠানিকভাবে বিরোধী দল। কিন্তু সংসদে সরকারকে তুলোধুনা করা, তুমুল বিতর্কে সংসদকে প্রাণবন্ত করে তোলার কোনো বিরোধী দল আমরা পেলাম না। কাজেই আমরা একটা মৃতপ্রায় সংসদই পেলাম। ফলে একতরফাভাবে এই সরকার তার আইনগুলো পাস করে নেবে।

এমন একটা পরিস্থিতিতে নতুন সরকারকে অবশ্যই কয়েকটা বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। নইলে এমন একচেটিয়া ক্ষমতার কারণে স্বৈরাচারী ঝোঁক থেকে রক্ষা পাওয়া কিংবা প্রবল কর্র্তৃত্বপরায়ণ একটা শাসনব্যবস্থা থেকে নিস্তার পাওয়ার আর কোনো উপায় নেই।

এক. মন্ত্রিসভাতেও যেহেতু আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো দলের বা জোটের কেউ নেই। সংসদে কিংবা রাজনীতির মাঠেও কোথাও যেহেতু কোনো শক্তিশালী প্রতিপক্ষ নেই, তখন নিজের সমালোচনার সুযোগটা আওয়ামী লীগের নিজেকেই সৃষ্টি করতে হবে। যাতে দলের মধ্যেই ভিন্নমতের চর্চার সুযোগ তৈরি হয়, গণতন্ত্রের চর্চাটা যাতে দলের ভেতরেও থাকে।

দুই. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় জোরদার পদক্ষেপ নিতে হবে। যাতে একটা সমান্তরাল জবাবদিহিতার ক্ষেত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্তিশালী অবস্থান নেওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। তাহলে হয়তো দেশে কিছুটা সুশাসন প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে।

তিন. সরকারকে অবশ্যই গণমাধ্যমের ওপর খড়গহস্ত হওয়ার অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অবশ্যই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দিতে হবে। সুশীলসমাজের প্রতিনিধি কিংবা নাগরিকদের গ্রেপ্তার হয়রানি করা থেকে বিরত থাকতে হবে। সবার কথাই মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। সবার সঙ্গেই আলোচনায় বসতে হবে। আলোচনার মধ্য দিয়েই সব সমস্যার সমাধান করতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক এবং কলামনিস্ট