ফিলিস্তিনি নারীর মাতৃত্বের বোঝা কতটা ভারী!

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৩, ০৮:২৩ পিএম

যারাই গাছপালা পছন্দ করেন, তারাই গাছের নাম জানতে চেষ্টা করেন। আমার এক বান্ধবী তার পালিত গাছেদের বৈজ্ঞানিক নামসহ বলে দিতে পারে। আমি অতটা পারি না, তবে প্রচলিত নামগুলো জানতে চেষ্টা করি। রেসিস্ট নাম হলে অন্য নাম ব্যবহার করি। যেমন একই গাছকে ডেভিল’স টাং আর মাদার-ইন-ল’স টাং— এই দুই নামেই ডাকা হয়। আমি নারীবিদ্বেষী নাম পরিহার করে গাছটাকে ডেভিল’স টাং বলেই ডাকি। গাছের নাম জানতে জানতে একদিন দেখলাম একটা বেগুনি পাতার গাছের নাম ওয়ান্ডারিং জিউইশ। গাছটা যত্রতত্র জন্মায় ও খুব লো মেইনটেইনেন্সে বেঁচে থাকে বলেই এ রকম নাম। জিউইশ বা ইহুদিদের জীবনীশক্তিকে কটাক্ষ করেই এই নাম। আমাদের দেশে যেমন নোয়াখালীর মানুষদের জীবনীশক্তিকে কটাক্ষ করে নানা কথা প্রচলিত রয়েছে!

ফিকশনের মাধ্যমে দুনিয়াকে চেনার প্রক্রিয়ায় ইহুদিদের সঙ্গে আমাদের প্রথম পরিচয় হয় শেক্সপিয়ারের শাইলক চরিত্র দিয়ে। বাংলার এক শক্তিমান লেখক সমরেশ বসুর একটি গল্প আছে, নাম ‘শোভাবাজারের শাইলক’। অতি কৃপণ ও অর্থলোভী লোককে শাইলক বলে গাল দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। ইহুদিদের প্রতি যুগপৎ সহানুভূতি এবং বিদ্বেষ নিয়ে আমরা বড় হই। ফিকশনের মধ্যে শেক্সপিয়ারের ‘মার্চেন্ট অব ভেনিস’ হোক, নন-ফিকশনে ‘আনা ফ্র্যাঙ্কের ডায়েরি’ হোক, সিনেমার মধ্যে ‘লাইফ ইজ বিউটিফুল’ বা ‘শিনডার’স লিস্ট’ বা ‘রিডার’ হোক আর আরবের বাইরের বিশেষত আমেরিকান ইহুদিদের মেধা ও আত্মপরিচয়ের সংগ্রামই হোক— সবকিছু মিলেই এই রকমের মিশ্র অনুভূতির জন্ম নিয়েছে!

কদিন আগেই এক বন্ধু দম্পতির বাসায় তাদের শিশুপুত্রকে নিয়ে একটি ফিল্ম দেখছিলাম, নাম ‘জোজো র‍্যাবিট’। প্রটাগনিস্ট একটি শিশু, বয়স আট থেকে দশ; হলোকাস্ট এবং ওই শিশুর মনোজগতে থাকা কমিক ফর্মের হিটলার হচ্ছে ছবির মূল উপজীব্য। শিশুদের নিয়ে যুদ্ধবিষয়ক ছবি এবং সারকাস্টিক রিপ্রেজেন্টেশনের ভালো উদাহরণ হতে পারে সিনেমাটি। তবে শিশুদের নিয়ে এই ছবি না দেখাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে আমি মনে করি। কেননা, ধর্মের ভিত্তিতে যুদ্ধ করার ও পরস্পরের জাতিকে ধ্বংস করে ফেলতে চাওয়ার, বিদ্বেষ ও ঘৃণার ইতিহাস শিশুদের শোনানোও দুরূহ কাজ।

আমরা আমাদের শিশুদের কত কিছুকেই না বাঁচিয়ে রাখতে চাই! যেমন আমার শিশুপুত্র যখন ছোট ছিল, মা হিসেবে আমার মনে হতো তাকে পিডোফাইলদের থেকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। আর একটু বড় হলে কোন সিনেমা দেখবে আর কোন সিনেমা বড় হয়ে দেখবে সেই ফিল্টারিং করতে হতো। আরও বড় হলে সম্ভবত কুসঙ্গ থেকে, মাদক থেকে বাঁচানোর কথা ভাবতে হবে। সন্তানকে শ্রেয়তর মানবসন্তান বানানোর কতই না আকুতি থেকে নারীর! কিন্তু সন্তানকে মানুষ বানানোর যুদ্ধটা জগতের সব নারীর জন্য একই রকম নয়। ফিলিস্তিনের নারীদের যেমন, সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখতে হয় মৃত্যু থেকে, হন্তারকের কাছ থেকে।

এই মাসের প্রথম সপ্তাহে, ৭ অক্টোবর ইসরায়েলকে আক্রমণ করে হামাস। হামাস দখলদার ইসরায়েল রাষ্ট্রকে ধ্বংস করতে চায়। ইসরায়েল যেমন গত ৭৫ বছর ধরে ধ্বংস ও দখল করতে চায় ফিলিস্তিনকে। ফিলিস্তিনে নারকীয় ধ্বংসলীলা ও হত্যাযজ্ঞ চালানোর খবর ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি। কিছুদিন পর পরই বিভিন্ন অজুহাতে ফিলিস্তিনে হামলা চালায় ইসরায়েল। হামাসের উল্লিখিত হামলার লাইভ খবর দেখতে দেখতে আমরা বলাবলি করছিলাম যে, ‘কী দিন পড়ল, যুদ্ধও লাইভ দেখা যায়!’ এর পর দুই-চারদিন পশ্চিমা মিডিয়ার দাবি করা যুদ্ধ অথবা ফিলিস্তিনে গণহত্যার আপডেট আর নেওয়া হয় না। বাংলাদেশের ডেঙ্গুতে মানুষ মরার মতনই জলভাত হয়ে যায়। উইক এন্ডে আমরা যেমন আশপাশে কী কী চলছে সেই খবর নিই, নিই ক্রিকেট আপডেট— সেই রকমভাবে জানতে চাই আর কত মানুষ মরল ফিলিস্তিনে-গাজায়, পশ্চিম তীরে!

‘আর কত মানুষ মরল ফিলিস্তিনে?’— এই লাইনটা ভুল। লেখা উচিত আর কত বেসামরিক মানুষ, নারী এবং শিশুকে হত্যা করা হলো? পশ্চিমা মিডিয়া নিষ্ঠার সঙ্গে এই ভুলভাল শব্দ ব্যবহার করে আসছে। মিডিয়াওয়ালারা যখন ফিলিস্তিনের মানুষের সাক্ষাৎকার নিচ্ছে তখনো ‘হত্যা করা হয়েছে’ শব্দের স্থলে ‘ডায়েড’ বলছে। আর একটা কাজও যত্নের সঙ্গে করা হচ্ছে, ৭ অক্টোবর তারিখটাকে বিশেষ প্রাধান্য দিয়ে প্রশ্ন করছে মিডিয়া, যেন-বা দুনিয়া ৭ অক্টোবরের আগে এক রকম ছিল আর তার পরে অন্যরকম কিছু হয়ে গেছে! যেন-বা, এই বর্ণবাদী আক্রমণের শুরু হয়েছে এ বছরের ৭ অক্টোবরে! যেন-বা ইসরায়েল আত্মরক্ষার জন্যই হাজার হাজার নিরস্ত্র মানুষ হত্যা করে যাচ্ছে। যেন-বা এখন পৃথিবীতে যা হচ্ছে তা হামাসের দোষেই হচ্ছে!

সর্বশেষ ঘটনায় ইসরায়েলি টানা হামলায় এখন পর্যন্ত ৭৭০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। ঘোষণা দিয়ে হাসপাতালে বোমা মারা হয়েছে। তার আগে গাজায় বিদ্যুৎ, মেডিসিন, পানির সাপ্লাই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটি (আইসিআরসি) বলেছে, ‘গাজার হাসপাতালগুলো বিদ্যুৎহীন মর্গে পরিণত হয়েছে।’

সেখানে শুধু নরহত্যার উৎসব হচ্ছে না, নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে নারী ও শিশুদের। ফিলিস্তিনে যে রকমভাবে শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে তা নিয়ে নারীরা কী ভাবেন? একজন মা এই খবরটা কীভাবে পড়েন যে ফিলিস্তিনে মায়েরা সন্তানের ছিন্নভিন্ন লাশ চেনার জন্য বাচ্চাদের হাতে লিখে রাখেন তাদের নাম? ফিলিস্তিনে মায়েরা সন্তান জন্ম দেন কেন? এই প্রশ্নও মনে আসাও স্বাভাবিক! মানুষ জাতির ইতিহাসে যে কোনো যুদ্ধে একটা সাধারণ যুদ্ধাপরাধ নারী ধর্ষণ। ধর্ষণ করে শত্রু জাতির রক্তে ভেজাল ঢুকিয়ে দেওয়ার এই পুরুষতান্ত্রিক ষড়যন্ত্রের কুফলের ভোক্তা যেমন নারীরা, আগাছা উপড়ে ফেলার মতো শিশুহত্যার প্রথম ও প্রধান ভুক্তভোগীও নারীই।

মজার বিষয় হচ্ছে এই সব যুদ্ধ বিগ্রহে নারীর অংশগ্রহণ যত না রাজনৈতিক, স্বেচ্ছায় ও সচেতনভাবে তার চেয়ে বেশি উপায়ান্তর না থাকা। ক্ষমতাসীন নারী শাসক যুগে যুগে কম-বেশি ছিলেন, নারীর সম্মুখসমরে যুদ্ধ করার ইতিহাসও রয়েছে। ইসলামের কোনো কোনো মতাবলম্বীদের মতে নারীর যুদ্ধে যাওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে জায়েজও। কিন্তু যুগে যুগেই নারী যত না যুদ্ধ করেছে, তার চেয়ে বেশি যুদ্ধবিগ্রহের শিকার বা ভিকটিমই হয়েছে। পরাজিত জাতির নারীদের বন্দি করে নিয়ে যৌনদাসী বানানোর খবর গ্রিক মিথলজিতে আছে, রামায়ণ-মহাভারতেও দুর্লভ নয়, প্রাক ইসলামি আরবে নারী ছিল গনিমতের মাল। দুনিয়ার যে কোনো অংশে যুদ্ধ হওয়া মানেই কিছু নারীর ওপর যৌন নির্যাতন এবং কিছু নারীর সন্তানহারা হওয়া— যদিও যুদ্ধ নারীরা করে না, করে মূলত পুরুষই। অবশ্য নারী যোদ্ধারাও আছেন, ইসরায়েলের এক নারীকে ২৫ জন হামাস সদস্যকে হত্যা করার জন্য বীরের সম্মান দেওয়া হচ্ছে। দশকের পর দশক ধরে উকুনের মতো ফিলিস্তিনের শিশুদের মেরে মায়েদের বুক খালি করে দিয়ে মিডিয়া তৈরি করেছে এক বীরাঙ্গনা না, মহিলা বীর। তাতে যদিও কোনো ব্যালান্স হয় না, যুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণের কথা বলতে গেলে মা হিসেবে সন্তানহারা হওয়ার যাতনাটুকুই প্রধান এবং প্রবলতমভাবে দৃশ্যমান হয়।

কিছুদিন আগে একটি ফিচারে পড়েছিলাম ইউরোপ আমেরিকায় সন্তান জন্মদানে বাংলাদেশিদের অবস্থান ওপরের দিকে, তৃতীয় বা চতুর্থ সম্ভবত। প্রতিবেদনটি পড়ে আমার মনে হয়েছিল তথাকথিত তৃতীয় বিশ্ব থেকে মেধাপাচারের মতো পাচার হয়ে যাচ্ছে নারীর উর্বরতাও। আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজে কন্যসন্তানদের জন্য সাফল্যের একটি সহজ সিঁড়ি হচ্ছে ইউরোপ আমেরিকা প্রবাসী কোনো সুপ্রতিষ্ঠিত পাত্রকে বিয়ে করে বিদেশ চলে যাওয়া।

মাতৃত্বকে আমি অস্বীকার করি না, মাতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ বটেই। আমরা মায়েরা সন্তানদের অনেক কিছু চেনাই, অনেক কিছু শেখাই। ফিলিস্তিনের মায়েরা জন্ম দিয়েই তাদের সন্তানদের মৃত্যু চেনান, মৃত্যু শেখান। আমরা মায়েরা সন্তানদের মানুষ করবার আকাক্সক্ষা নিয়ে বেঁচে থাকি। ফিলিস্তিনের মায়েরা তাদের সন্তানদের মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করার মতো শক্তিশালী যোদ্ধা বানাবার আকাক্সক্ষা নিয়ে বেঁচে থাকেন। যোদ্ধা হয়তো আর বানাতেও হয় না তাদের, বেঁচে থাকতে পারলে এই শিশুরা এমনি এমনিই যোদ্ধা হয়ে ওঠে। মরে গেলে আর কি, শহীদ!

ফিলিস্তিনে নারীর জন্য সন্তান জন্ম দেওয়া কত কঠিন হতে পারে, তা কল্পনা করার সাধ্যও আমার নেই। তার ওপর এই সন্তান ধারণ যদি হয় ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব রক্ষায় শহীদের শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য, সে মাতৃত্বের বোঝা তাহলে কত ভারী! প্রশ্ন হচ্ছে, ফিলিস্তিনের মায়েদের কাছে কি বিকল্প খোলা আছে? আমি নিশ্চিত নই। কিন্তু জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রাকৃতিকভাবেও করা যায়, নানা জন্মবিরতিকরণ পণ্য না কিনেও নারী ও পুরুষ পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে মিলনের সময়ই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তারা সন্তানের জন্ম চান কি না, ইসলামেও এইভাবে জন্মশাসন পদ্ধতি শেখানো হয়েছে। মুসলিম হিসেবে ফিলিস্তিনের নারী পুরুষের এই তরিকা জানা না থাকার কথা নয়। আমার মনে হয়, ফিলিস্তিনের নারী-পুরুষ যৌন তাড়না হিসেবে যতটা নয়, তার চেয়ে বেশি সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্যই মিলিত হন। যোদ্ধা অথবা শহীদ জন্ম দেওয়ার জন্যই হয়তো তারা প্রেম করেন। এই লড়াকু প্রেমের জন্য হয়তো ফিলিস্তিনের নরনারীর বোমা হামলার নিচে বসে সন্তান জন্ম দেওয়াটাও এক একটি ইবাদত হয়ে ওঠে!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত