আমাদের অফিস বাংলামোটর। যে কোনো দুর্যোগ-দুর্বিপাকে সহকর্মীদের মধ্যে কমন আলোচনার বিষয় থাকে— সেদিনের অফিস আসার অভিজ্ঞতার গল্প। গত পরশু রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন স্পটে বড় বড় তিনটি রাজনৈতিক পক্ষ-বিপক্ষের পাল্টাপাল্টি সমাবেশের দিনটিতেও অফিসে উল্লিখিত অবস্থাই ছিল। এর আগের এমন দিনগুলোর মতোই হয়তো এই ‘অফিসটাইম কলিগটক’ হারিয়ে যেত, কারণ কমবেশি গল্পগুলো, অভিজ্ঞতাগুলো একই রকমের। তবে এক সহকর্মীর মুখে শোনা তার সেদিনের অফিস আসার গল্পটি দুর্বিপাকের অন্য দিনগুলোর চেয়ে একে আলাদা করে দিয়েছে।
সহকর্মীর বাসা মোহাম্মদপুর। তিনি সাধারণত রাইড শেয়ারের বাইকে করে অফিস আসেন। সেদিন একদিকে সরকারি দল আর বিরোধীদের সমাবেশের চাপা টেনশনে রাইড পাবেন কি না তা নিয়ে ছিলেন সন্দিহান, অন্যদিকে বাসস্ট্যান্ডের কাছে কাজ থাকায় তিনি বাস ধরার চিন্তা করে বাসা থেকে বের হন। কিন্তু বাসস্ট্যান্ডে এসে দেখেন যে কোনো বাস নেই। অগত্যা ভেঙে ভেঙে বাংলামোটর আসার সিদ্ধান্ত নেন। হঠাৎ একটা ফার্মগেটগামী লেগুনা দেখতে পেয়ে সেটিতে চড়ে বসেন।
লেগুনা ফাঁকাই ছিল, ড্রাইভারের পাশের সিটই পেয়ে যান। লেগুনাযাত্রী মাত্রই জানেন যে, লেগুনার সামনে ড্রাইভারের পাশের সিটখানি বেশ মহার্ঘ্য। তো টুকটাক আলাপও চলে বছর ৩৫ বয়সী ড্রাইভারের সঙ্গে। এই সব দলের সমাবেশ, গণ-পরিবহন না থাকা, কর্মজীবীদের দুর্ভোগ আর পরিবহন শ্রমিকদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হালকা চালে আলাপ এগোয়।
মানিক মিয়া এভিনিউতে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি বাস। হয়তো তারা সমাবেশে আসা লোকদের নিয়ে এসেছে। কে জানে তারা কোন পক্ষের সমাবেশে যেতে এখানে নেমে গেছে। হয়তো নেতা গোছের কেউ নিয়ে এসেছে, হয়তো টাকা পেয়েছে কিছু কিংবা ঢাকা দেখার সুযোগ পেয়েও কেউ কেউ চলে এসেছেন। কিন্তু যারা ঢাকা দেখতে এসেছেন তারা এই পাল্টাপাল্টি সমাবেশে যে টেনশনের শহর দেখবেন, তাতে কি রাজধানী দেখার গৌরব নিয়ে ফিরতে পারবেন?
সে যাই হোক, সহকর্মী জানান যে, পুরো রাস্তা ফাঁকা পেলেও বাসের সারির কারণে সেখানে তাদের বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা লাগে। পরিস্থিতিটা এমন যে এখানে যাত্রীরা নেমে গেলে অন্য কোনো বাহন পাবেন কি না তার নিশ্চয়তা নেই।
এই পর্যায়ে লেগুনা ড্রাইভার আমার সহকর্মীকে জানান, আগের কোনো এক সমাবেশে এই একই পরিস্থিতিতে পড়তে হয় তাকে। তার দুই বছর বয়সী মেয়েশিশু তখন আইসিইউতে (শ্যামলীর আশপাশে কোনো হাসপাতালে) ভর্তি। ডাক্তার একটা জরুরি ওষুধ আনতে বলে প্রেসক্রিপশন ধরিয়ে দেন। ওষুধটা সব জায়গায় পাওয়া যায় না উল্লেখ করে দ্রুত খুঁজে নিয়ে আসতে বলে দেন ডাক্তার ভদ্রলোক। লেগুনা ড্রাইভার হাসপাতাল থেকে বের হয়ে প্রথমে কলেজ গেটের দিকে যাওয়া সবগুলো ফার্মেসি খুঁজেও ওষুধটি পাননি।
কলেজ গেট থেকে কেউ একজন তাকে বলেন কলাবাগান যেতে, কিন্তু পথে কোনো যানবাহন নেই। হাঁটতে হাঁটতেই কলাবাগান গিয়ে শোনেন যে, ওষুধটি সেখানে নেই, শ্যামলী যেতে হবে। আবার ফিরতি পথে হেঁটে হেঁটে শ্যামলী গিয়ে অবশেষে ওষুধটি পান তিনি। এই পুরো রাস্তা তাকে দৌড়ের ভঙ্গিতে হেঁটে যেতে হয়েছে, কারণ ডাক্তার বলে দিয়েছে দ্রুত নিয়ে আসতে। পড়তে হয়েছে পুলিশের তল্লাশির ভোগান্তিতে। আর পলিটিক্যাল দুর্বিপাকে রাস্তায় সেদিন না আছে বাস, আর রিকশা টুকটাক ছিল কিন্তু ভাড়া এত বেশি চাচ্ছিল যে লেগুনা ড্রাইভার ভয়ে উঠতে পারছিলেন না, কারণ যদি ওষুধের টাকায় টান পড়ে।
এটুকু বলে সহকর্মী একটু দম নেন। বলেন যে এরপর লেগুনা ড্রাইভার একে একে সরকারি দল, বিরোধী দল, পুলিশ সবার বিষোদগার করেন স্বগতোক্তির মতো...। কিন্তু আমার সহকর্মী যখন তাকে জিজ্ঞাসা করলেন— সরকার কি বিরোধীদের দাবি মেনে নেবে? লেগুনা চালকের উত্তর— তা কীভাবে হবে! সহকর্মী আবার জানতে চান, কিন্তু বাজারে জিনিসপত্রের যে দাম, বিরোধীদের যেভাবে সরকার হামলা-মামলা-গ্রেপ্তার করছে, ভোট হয় কি না ঠিক নেই— বিরোধীরা কী করবে?
লেগুনা চালকের উত্তর— তা তো অবশ্যই! একই ভাবে এমন পাল্টাপাল্টি সমাবেশের দিনে, হরতালের দিনে পুলিশ কি রাস্তায় তল্লাশি চালাবে না? লেগুনা চালকের উত্তর— না না পুলিশও ঠিক আছে...। রাজনীতির নামে এই গণভোগান্তি একদম সহ্য করতে পারেন না সেই ড্রাইভার। তিনি বলতে থাকেন- রাজায় রাজায় লড়াই হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়; পুলিশও মরে; টকশোতে তর্কাতর্কি, টকশো শেষে গলায় গলায় মিল... ইত্যাদি ইত্যাদি।
সহকর্মীর ভাষ্য এরপর লেগুনা চালক এক নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে শ্রাগ করেন আর বিরক্তি-উদাসীনতার মেলবন্ধন ফুটিয়ে থেমে থাকা রাস্তায় বের হয়ে যাওয়ার গলি খুঁজতে থাকেন। তখন আমার সহকর্মী লেগুনা ড্রাইভারের উদাসীনতার পেছনে নিজের সাংবাদিকসুলভ প্রশ্নের দায় বোধ করেন হয়তো এবং একটু রিলিফের জন্য জানতে চান— তো ভাই আপনার সেই মেয়ে এখন কেমন আছে? লেগুনা ড্রাইভারের নির্বিকার উত্তর- ‘ভাই মেয়েটাকে সেদিন বাঁচানো যায় নাই, সেদিনই সে মারা গেছে...। সেদিন এতসব সহ্য করেও মেয়েকে বাঁচাতে পারিনি।’
প্রথম দিকে আসলে লেগুনা ড্রাইভার হা-হুঁ করে সংক্ষিপ্ত উত্তরে আলাপ করে গেলেও, সহকর্মীর ভাষ্যমতে, মানিক মিয়া এভিনিউতে এসে নিজের কথা বলা শুরু করেন। হয়তো পরিস্থিতি তার স্মৃতিকে উসকে দিয়েছিল। কিংবা এ ধরনের স্মৃতির দুঃসহ আক্রমণ তাকে এই রাজধানীর বুকে লেগুনা চালাতে গিয়ে প্রায়শই আক্রান্ত করে। কারণ এমন দুর্বিপাকের রাস্তার মুখোমুখি হতে হয় তাকে কিংবা আমাদের প্রায়শই...। দিন যায় কিন্তু এই রাজনৈতিক দুর্বিপাকের রাস্তা আর শেষ হয় না। আর এই পরিস্থিতি তাকে হল্ট করে দুঃসহ স্মৃতির মুখোমুখি। কে জানে সহকর্মীর আলাপে তার সেই ব্যক্তিগত গল্পটি বলতে গিয়ে নির্লিপ্ততার আড়াল নিতে নিতে তার পিতৃত্ব আর পেশাজীবনের অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতার কাছে বিদীর্ণ হচ্ছিল কি না। কিন্তু আমার সহকর্মী বিদীর্ণ হয়েছেন সেই লেগুনাচালকের গল্পে।
ওই লেগুনা ড্রাইভার এই শহরে প্রতিটি পাল্টাপাল্টি সমাবেশের দিনে, প্রতিটি হরতালের দিনে, প্রতিটি অবরোধের দিন পেট চালাতে গিয়ে তার মৃত মেয়ের স্মৃতি নিয়েই পথ চলেন হয়তো। আমাদের মরণশীল জীবনে মৃত্যুদিবস একদিন এলেও এই সব দুর্বিপাক নামা প্রতিটি দিনই যেন ওই লেগুনাচালকের মেয়ের মৃত্যুদিবস হিসেবে নেমে আসে, অথবা অন্য কোনো বাবা ও তার মেয়ের জীবনে।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক
