কক্সবাজারে চলতি মাসের ৪ থেকে ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত ৯ দিনে ৯ জন কথিত ইয়াবা কারবারি নিহত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য মতে, পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ দুজন, র্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ দুজন এবং বিজিবির গুলিতে দুজন নিহত হয়; উদ্ধার করা হয় তিনটি গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ। তাদের মধ্যে একজন কক্সবাজার শহরে এবং বাকিরা টেকনাফে নিহত হয়। পুলিশ বলছে, ইয়াবা, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির একাধিক মামলা ছাড়াও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৈরি মাদক কারবারির তালিকায়ও তাদের সবার নাম রয়েছে। একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর থেকে মাদকবিরোধী অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ও অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। গত বছরের শেষ তিন মাসে টেকনাফেই নিহত হয় ২৭ ‘মাদক কারবারি’; তাদের মধ্যে দু-একজন ছাড়া সবাই ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় বলে দাবি পুলিশের। এক বছর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা তালিকায় কক্সবাজারে ১ হাজার ১৫২ জন ‘ইয়াবা কারবারি’ চিহ্নিত করা হয়; এর মধ্যে টেকনাফেরই রয়েছে ৯১২ জন। মাদক নির্মূলে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর কক্সবাজার জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নড়েচড়ে বসে; শুরু হয় ইয়াবাসহ মাদক কারবারিদের ধরপাকড়। এতে টেকনাফের শীর্ষ কারাবারিরা গা-ঢাকা দিলেও বন্ধ হয়নি ইয়াবা পাচার।
পুলিশ জানায়, গত ৪ জানুয়ারি সকাল ৭টার দিকে টেকনাফ-কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়ক সংলগ্ন বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালীপাড়া সৈকত এলাকা থেকে সাজ্জাদ হোসেন ইমরান (২৪) নামে এক যুবকের গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। ইমরান চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার পশ্চিম আমিরাবাদের মাস্টারপাড়া গ্রামের মোহাম্মদ কালামের ছেলে। ধারণা করা হচ্ছে, ইয়াবার চালান পাচারের সময় আধিপত্য নিয়ে বিরোধের জের ধরে প্রতিপক্ষের হাতে সে খুন হয়ে থাকতে পারে। পরদিন সকাল ৯টার দিকে টেকনাফ সদর ইউনিয়নে মেরিন ড্রাইভের কাছে রাজারছড়া এলাকা থেকে দুজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। তারা হলোÑউপজেলার উনচিপ্রাং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি-ব্লকের মৃত কাশিমের ছেলে খাইরুল আমিন (৩৫) ও একই ব্লকের হাজী মুহাম্মদের ছেলে আবদুল্লাহ (৩৭)।
র্যাব-৭ কক্সবাজারের ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার মেজর মেহেদী হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, “গত ৮ জানুয়ারি ভোরে টেকনাফের দমদমিয়া এলাকায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ দুই ইয়াবা ব্যবসায়ী নিহত হয়। তারা হলোÑঢাকার সাভার উপজেলার নগরকুণ্ড এলাকার আবদুল মতিনের ছেলে হাফিজুর রহমান (৩৫) ও বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার বরবাড়িয়া এলাকার মো. ইব্রাহিমের ছেলে সাব্বির হোসেন (২৫)। ঘটনাস্থল থেকে ৪০ হাজার পিস ইয়াবা, একটি বিদেশি রিভলবার, একটি ওয়ান শুটারগান ও একটি কাভার্ড ভ্যান জব্দ করা হয়।”
তিনি আরও বলেন, ‘মাদক ব্যবসায়ী দেশের ও সমাজের শত্রু। তাই তাদের প্রতিহত করতে হবে। র্যাব পুরো জেলায় স্থল ও জলপথে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা অব্যাহত রেখেছে। মাদক ব্যবসায়ী ছাড়াও জলদস্যু ও সন্ত্রাসীদের আটক করেও আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।’
পুলিশ জানায়, গত ৯ জানুয়ারি সকাল ৬টার দিকে কক্সবাজার শহরের কলাতলী কাটাপাহাড় এলাকা থেকে ২শ’ পিস ইয়াবা ও দেশীয় একটি এলজিসহ জাহাঙ্গীর আলমের মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সে শহরের রুমালিয়ারছড়া এলাকার ফরিদ আলম ওরফে দারোয়ান ফরিদের ছেলে।
গত ১০ জানুয়ারি রাত ২টার দিকে টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নে নাফনদীর খুরেরমুখ এলাকায় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ দুজন নিহত হয়। পুলিশ বলছে, এ সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি আবদুর রশিদ প্রকাশ ডাইল্যা (৪৭) ও আবুল কালাম (৩৫) নিহত এবং আহত হয় তিন পুলিশ সদস্য। ঘটনাস্থল থেকে ২২ হাজার পিস ইয়াবা ও ৫টি দেশীয় এলজি উদ্ধার করা হয়। রশিদ একই ইউনিয়নের কচুবুনিয়া এলাকার মৃত এনাম শরীফের ছেলে ও কালাম কাটাবুনিয়ার আবদুর রহমানের ছেলে।
গত ১২ ডিসেম্বর রাতে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের আনোয়ার প্রজেক্ট পয়েন্টে সাঁতরে নাফনদী পার হওয়ার সময় বিজিবির গুলিতে দুজন নিহত হয়। টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. আছাদুদ-জামান চৌধুরী জানান, ‘রাতে সাঁতরে নাফনদী দিয়ে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করে তারা। এ সময় কর্তব্যরত বিজিবি সদস্যরা তাদের লক্ষ করে গুলিবর্ষণ করে। পরে ঘটনাস্থলে তল্লাশি করে দুজনের গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে পুলিশকে জানানো হয়। ঘটনাস্থলে এসে লাশ উদ্ধার ও ৫০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে পুলিশ।’ পুলিশ জানিয়েছে, নিহত দুজনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে স্থানীয়দের দাবি, তারা মিয়ানমারের নাগরিক।
টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ জানান, ‘টেকনাফে পুলিশের সঙ্গে যেসব ব্যক্তি নিহত হয়েছে তারা সবাই ইয়াবা ব্যবসায়ী। তাদের অধিকাংশই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী। এ ছাড়া গুলিবিদ্ধ অবস্থায় যাদের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, তারাও চিহ্নিত ইয়াবা ব্যবসায়ী। আধিপত্য নিয়ে নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে তারা মারা গেছে।’ সারা দেশে মাদকবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে মাদক নির্মূলে টেকনাফে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান ওসি।