গত ৮-৯ জানুয়ারির শ্রমিক ধর্মঘটে স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল ভারতের বড় একটি অংশের কর্মজীবন। প্রায় ২০ কোটি শ্রমিক-কর্মচারীর অংশগ্রহণে সংঘটিত এই ধর্মঘট ছিল বিশ্ব ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ধর্মঘট। এই দুদিনের ধর্মঘটে শ্রমিক-কর্মচারীরা দেশটির উৎপাদন-প্রক্রিয়াকে স্তব্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি কৃষক-ক্ষেতমজুরদের সমর্থন কার্যত অচল করে দিয়েছিল গোটা ভারতকে। ভারতের ১০টি কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগঠনের আহ্বানে সংঘটিত হওয়া এই ধর্মঘটের বিরোধিতা করেছে বিজেপির শ্রমিক সংগঠন বিএমএস এবং পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের শ্রমিক সংগঠন আইএনটিটিইউসি। অর্থাৎ দেশটির শ্রমজীবী জনতার ৯০%-ই এই ধর্মঘটের সমর্থক ছিল।
মূলত যে উদারীকরণের নীতি দ্বারা পরিচালিত হয়ে ভারতের মোদি সরকার একের পর এক সংস্কার কর্মসূচি নিয়েছে তা দেশটির শ্রমজীবী মানুষকে বিপন্ন করে তুলেছে। শ্রমজীবী মানুষের মজুরি স্তর হ্রাস পেয়েছে এবং তা কমে গিয়েছে। শ্রমিকদের অধিকার ছাঁটাই হচ্ছে। কর্মসংস্থান ব্যাপক মাত্রায় কমে গিয়ে বেকারত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্থায়ী কাজ, ন্যায্য মজুরি এবং সামাজিক নিরাপত্তা এখন অতীত হয়ে গিয়েছে। এই ত্রাহি অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে ভারতের শ্রমজীবী জনতা ১২ দফা দাবিতে এই ধর্মঘট আহ্বান করেছিল। রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পরক্ষা, ন্যূনতম ১৮ হাজার টাকা মজুরি, সবার জন্য ন্যূনতম পরিমাণ পেনশন, শ্রমিক-কর্মচারীদের স্বার্থে শ্রম আইন কার্যকর ও আইন সংশোধন রদ করা, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, বেকারদের জন্য কাজ সৃষ্টি ইত্যাদি ছিল মূল দাবি। এর আগে ২০০টি কৃষক সংগঠনের ডাকে কয়েক লক্ষ কৃষক ভারতজুড়ে পদযাত্রা করে। তারা ওই সময় গ্রামীণ ধর্মঘটের হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে। তাদের এই ঘোষণা শ্রমিকদের ধর্মঘটে অনুপ্রাণিত করেছে বলে অনেক ভারতীয়রই ধারণা। সেই অর্থে কৃষকদের দেখানো পথে শ্রমিকরা এখন সম্মিলিত শক্তিতে সমগ্র ভারতকে উত্তাল করে তুলেছে। এর ফলে যে মোদি ম্যাজিক ভারতের ওপর ভর করেছিল তা এখন অনেকাংশেই মøান হতে চলেছে। এই বছরের প্রথমার্ধেই ভারতের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেখানে ক্ষমতাসীন বিজেপির জন্য এই কৃষক-শ্রমিক অর্থাৎ শ্রমজীবী জনগণের ধারাবাহিক জাগরণ বড় হুমকি হয়ে উঠবে সে কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। এমনিতেই অল্প কিছুদিন আগে কয়েকটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি বা তার মিত্ররা ধরাশায়ী হয়েছে। আসামে তারা যাদের সঙ্গে জোট করে ক্ষমতার অংশীদার হয়েছিল সেই আসাম গণপরিষদ জোট ভেঙে দিয়েছে। এসব একের পর এক দুঃসংবাদ নিশ্চয়ই নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ জুটির কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। এখন গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো এই শ্রমিক-কৃষকের আন্দোলন আবির্ভূত হয়েছে। তাই মোদি সরকারের দিন ভালো যাচ্ছে না এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।
২০১৪ এর নির্বাচনে মোদির সেøাগান বিকাশ বা উন্নয়ন এবং আচ্ছে দিন বা ভালো দিন বড় অংশের ভোটারদের মনে ধাক্কা দিয়েছিল। তিনি যে বছরে ৫ কোটি নতুন চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা বড় অংশের ভোটারদের মনে দাগ কেটেছিল। বিশেষ করে এর আগে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে যে অর্থনৈতিক ধস দেখা দিয়েছিল তাতে মোদির এই প্রতিশ্রুতি ভারতের জনগণকে আশায় বুক বাঁধতে সাহায্য করেছিল। তাই তারা ভুলে গিয়েছিল গুজরাটের ঘটনা। ভুলে গিয়েছিল বিজেপির সাম্প্রদায়িক চরিত্র। কিন্তু যে আশায় ভারতের মানুষ ভোট দিয়ে মোদি সরকারকে ক্ষমতায় আনল তা দিন যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফিকে হয়ে গিয়েছে।
সরকারের দেওয়া সংখ্যাতত্ত্বই তার বিপরীতে কথা বলছে। সরকারিভাবে বেকারত্বের হার ৭.৪% এ পৌঁছেছে, যা গত ২৭ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমির প্রতিবেদন বলছে, ২০১৮ সালে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ লোক চাকরি হারিয়েছে। গ্রামাঞ্চলে এই কর্মচ্যুতির পরিমাণ বেশি হলেও তথ্য-প্রযুক্তি খাতে সাম্প্রতিক সময়ে কর্মচ্যুতির পরিমাণও উল্লেখ করার মতো। ভারতে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষ অর্থাৎ শ্রমজীবী জনতা এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের আক্রান্ত করেছে। দিল্লির মতো রাজধানীর জায়গাতেই অধিকাংশ শ্রমিক মাসে ৭০০০ থেকে ১২০০০ রুপি আয় করে। যা তার জীবনধারণের জন্য খুবই অনুপযুক্ত। নির্মাণ খাতের শ্রমিকরা খুবই অনিরাপদ পরিবেশে কাজ করে। শ্রমিকের মৃত্যু এই খাতের নিত্যনৈমিত্তিক চিত্র। অস্থায়ী নিয়োগভিত্তিক শ্রমিকদের জীবন দুর্বিষহ। কেননা ব্যবসায়ীরা তাদের বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রকল্পে তাদের খুবই কম মজুরিতে নিয়োগ দিচ্ছে। ভারতে অস্থায়ী শ্রমিকদের সংখ্যা দিন দিন হু হু করে বাড়ছে। মোদি সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল দেশের কালো টাকা উদ্ধার করে প্রতি নাগরিকের অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা দেবে। এখন উল্টো অনেকেই অভিযোগ করছেন তিনি যে নোট বাতিলের প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন তাতে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ পেয়েছে কালো টাকার মালিকরা। এছাড়া সরকারের বিরুদ্ধে রিজার্ভ ব্যাংক কেরেঙ্কারির অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রদায়িক এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেলের ১৫২টি মূর্তি থাকা সত্ত্বেও ২০০ কোটি রুপি ব্যয় করে আরেকটি মূর্তি তৈরি করেছে মোদি সরকার। তাই দুর্নীতি ও শ্রমিকবিরোধী নীতির কারণে এবার ভারতের শ্রমজীবী জনতা রাস্তায় নামছে, ধর্মঘটে শামিল হচ্ছে।
দুদিনের ধর্মঘটে আসাম, মনিপুর, মেঘালয়, উড়িষ্যা এবং কেরালার মতো পাঁচটি রাজ্যে জনজীবন একদম স্তব্ধ হয়ে গিযেছিল। দেশের অধিকাংশ স্থানেই ব্যাংক এবং ডাক-ব্যবস্থা এই ধর্মঘটের আওতায় ছিল। দেশের অধিকাংশ জায়গায় রেল যোগাযোগ বন্ধ ছিল। তেলেঙ্গানায় ২০ লাখ সরকারি কর্মচারী ধর্মঘটে শামিল হয়েছিল। কর্নাটকে সড়কপথের যানবাহন শ্রমিকরা তাদের যানবাহন বন্ধ রেখেছিল। অন্য প্রায় সব রাজ্যেই একই চিত্র দেখা গেছে।মোদি সরকার যতটা না গো-রক্ষা বা শবরীমালার মতো বিতর্কিত সাম্প্রদায়িক বিষয়ে নিজেদের তৎপর রেখেছে তারচেয়ে অনেক কম নজর দিয়েছে জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ব্যাপারে। কিন্তু প্রথমে কৃষকদের পদযাত্রা এবং পরে শ্রমিকদের ধর্মঘট তার জন্য বিপজ্জনক বার্তা বহন করছে। যা বিজেপির জন্য অশনি সংকেত হয়ে উঠতে পারে। হয়তো-বা এই ঘটনাগুলো ভারতের রাজনীতির গতিমুখকেই পরিবর্তন করে দিতে পারে।
লেখক : সাংবাদিক