মধুনামা

জন্মের পরপরই শিশুর মুখে মধু দেওয়ার রেওয়াজ আমাদের দেশে এখনো প্রচলিত। মনে করা হয়, মধু খেলে শিশুর মুখের কথাও মধুর মতো সুমিষ্ট হবে। স্বাদে মিষ্টি, দেখতে ঘন-তরল ও আঠালো এই পদার্থকে আহরণ করা কিন্তু মোটেও সহজ নয়। গহিন বন থেকে অনেক কষ্ট করে মৌয়ালদের সংগ্রহ করতে হয় বনজ-প্রাকৃতিক মধু। বাজারে চাষের যে সব মধু পাওয়া যায় সেটা প্রাকৃতিক মধুর মতো গুণসম্পন্ন নয়।কারণ সেখানে থাকে বিভিন্ন প্রিজারভেটিভের প্রভাব। আর প্রক্রিয়াজাত মধুতে তাপমাত্রা ও বিভিন্ন ফ্লেভার যোগ করা হয়;ফলে মধুর গুণাগুণ নষ্ট হয় অনেকটাই। তাই সঠিক গুণাগুণ পেতে অনেকেই প্রাকৃতিক মধু খাওয়ার চেষ্টা করে থাকেন। লিখেছেন লায়লা আরজুমান্দ

মধু

পৃথিবীতে সব থেকে মিষ্টি খাদ্যের নাম বলতে বলা হলে প্রথমেই নিশ্চই আসবে মধুর নাম। মধু চিনির থেকেও বেশি মিষ্টি। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে তৈরি মধুর পুরো কৃতিত্ব হচ্ছে কর্মী মৌমাছির। কর্মী মৌমাছিরা দূর-দূরান্তে ফুলে ফুলে ঘুরে পুষ্পরস বা মৌ-রস সংগ্রহ করে। তারপর সেটা তার শরীরের বিশেষ একটা থলিতে জমা রাখে। পুষ্পরস নিয়ে এরপর তারা ফিরে যায় মৌচাকে। সেখানে মৌমাছির মুখ নিঃসৃত লালা মিশ্রিত হয়ে রাসায়নিক জটিল বিক্রিয়ায় তৈরি হয় মধু। তারপর সেটা জমা করে মৌচাকের প্রকোষ্ঠে।

তবে এখানেই শেষ নয়। প্রকোষ্ঠে জমা হওয়ার পর ঝাঁক বেঁধে মৌমাছিরা পাখা ঝাপটাতে থাকে। এতে করে মধুর বাড়তি পানি উড়ে চলে যায়। তারপর সেই প্রকোষ্ঠের মুখ মোম দিয়ে বন্ধ করে দেয় যাতে পরবর্তীতে প্রয়োজনের সময় মৌমাছিরা সেটা ব্যবহার করতে পারে।একটি মৌমাছি প্রতি মিনিটে ১১৪০০ বার তার পাখা নাড়ে। মধু উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়ায় অক্লান্ত পরিশ্রম করে ছোট্ট ও উপকারী এই প্রাণী।

সংগ্রহ

বনজ মধু সংগ্রহ করাটা বেশ কষ্টের। কারণ মৌমাছির চাক এত গহিন জঙ্গলে বা উঁচঁ গাছের ডালে থাকে যে সেখানে পৌঁছানো খুব বিপজ্জনক। এ সময় মধু সংগ্রহকারীদের সঙ্গে থাকে ধোঁয়া তৈরির বিভিন্ন উপকরণ ও মধু সংগ্রহের জন্য বালতি বা হাঁড়ি। ধোঁয়া দিয়ে প্রথমে মৌমাছিদের তাড়াতে হয় মধুর চাক থেকে। তারপর কেটে নেওয়া হয় মৌচাক। তারপর চাক থেকে চিপে চিপে বের করা হয় মধু।আর বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা মৌমাছির চাক থেকে মধু নিষ্কাশন করা হয় বিশেষ যন্ত্রের সাহায্য। এতে চাক থেকে শুধু মধু বের হয়ে আসে। তবে চাক নষ্ট হয় না এবং তা আবার ব্যবহার করা যায়।

পুষ্টিগুণ

মধুকে অলৌকিক ওষুধও বলা হয়ে থাকে। মধুতে রয়েছে প্রায় ৪৫টি খাদ্য উপাদান। খাঁটি মধু কখনোই নষ্ট হবে না। কারণ উচ্চ ঘনত্বের কারণে প্লাজমোলাইসিস প্রক্রিয়ায় ব্যাকটেরিয়া মারা যায়। প্রতি ১০০ গ্রাম মধুতে রয়েছে, শক্তি ৩০৪ কি. ক্যা, ক্যালশিয়াম ৬ মিলিগ্রাম, আয়রন ০.৪২ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেশিয়াম ২ মিলিগ্রাম, সোডিয়াম ৪ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম ৫২ মিলিগ্রাম, ফসফরাস ৪ মিলিগ্রাম, জিঙ্ক ০.২২ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি ০.০৫ মিলিগ্রাম ইত্যাদি। মধুতে কোনো চর্বি ও প্রোটিন নেই।

দেশীয় মধু

আমদের দেশে বিভিন্ন রকমের মধু উৎপন্ন হয়। যেমন, সুন্দরবনের মধু, সরিষা ফুলের মধু, কালোজিরা ফুলের মধু, বরই ফুলের মধু, লিচু ফুলের মধু, ধনিয়া ফুলের মধু ইত্যাদি। বিভিন্ন ফুলের মৌসুমে, মৌমাছি ফুল থেকে যেই পুষ্পরস সংগ্রহ করে মধুতে রূপান্তর করে তাকে সেই ফুলের মধু বলা হয়। অর্থাৎ কালোজিরা ফুলের মধুতে কালোজিরা ফুলের পুষ্পরসের পরিমাণ বেশি থাকবে, সরিষা ফুলের মধুতে সরিষার পুষ্পরসের পরিমাণ বেশি থাকবে। পৃথিবীতে বর্তমানে ৩০০ ধরনের মধু রয়েছে। সবই পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ।

৫,৫০০ বছরের পুরনো মধু

খাঁটি মধু কখনোই নষ্ট হয় না। মধুর রাসায়নিক বিন্যাসটিই এমন যে, এতে ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে না। অবাক করার মতো বিষয় হলো, মিসরের পিরামিড আবিষ্কারের সময় মমির সঙ্গে বয়ামভর্তি মধু খুঁজে পান প্রতœতাত্ত্বিকরা। এগুলো ছিল দুই থেকে তিন হাজার বছরের পুরনো। কয়েক বছর আগে জর্জিয়াতে পাওয়া যায় আরও পুরাতন মধু। সিরামিকের এক জারে থাকা এই মধু প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছরের পুরনো। মধুতে থাকা চিনি, কম আর্দ্রতা, উচ্চমাত্রার অম্ল, গ্লুকোনিক এসিড এবং হাইড্রোজেন পারক্সাইড একে ভালো রাখতে সাহায্য করে।

মধুর ঔষধি গুণ

ঔষধি গুণের কারণে সেই প্রাচীনকাল থেকেই মধু ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পৃথিবীতে যত খাবার রয়েছে সব খাবারের পুষ্টিগুণ ও উপাদেয়তার দিকটি যদি বিবেচনা করা হয় তবে নিঃসন্দেহে ‘মধু’র নাম থাকবে তালিকার সবার ওপরে। মধু সেবন করলে অনেক অসুখ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায় এটা এখন বৈজ্ঞানিক ভাবেই প্রমাণিত। প্রাচীন অনেক সভ্যতায় মধুকে ‘ওষুধ’ হিসেবেও ব্যবহার করা হতো।

মধু শরীরের তাপ ও শক্তি জোগায়। বিশেষ করে শীতকালে মধু শরীরকে গরম রাখে। মধুতে থাকা শর্করা হজমের জন্যও উপকারী। মধু খেলে হৃৎপি- শক্তিশালী হয়। মধুতে রয়েছে যথেষ্ট পরিমাণে কপার, আয়রন ও ভিটামিন বি কমপ্লেক্স, যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে। শ্বাসকষ্টেও মধু বেশ উপকারী। পোড়া বা ক্ষত জায়গায় মধু লাগালে দ্রুত আরোগ্য হয়। সর্দি-কাশিতে মধু মহৌষধ হিসেবে কাজ করে। তাছাড়া ত্বক, সৌন্দর্য চর্চা, ওজন কমাতে মধুর জুড়ি নেই।

খাঁটি মধু চেনার উপায়

আমরা যে মধু খাচ্ছি তা খাঁটি না ভেজাল সেটা নিয়ে চিন্তায় পড়ে যাই অনেকে। তবে তারও রয়েছে কিছু সমাধান।

- মধু বুড়ো আঙুলে নিলে যদি সেটি ছড়িয়ে পড়ে তবে সেটি খাঁটি নয়। খাঁটি মধু ঘন হয়ে আটকে থাকবে, সহজে ছড়াবে না।

- এক গ্লাস পানিতে এক চা চামচ মধু ঢালুন। মধু আসল হলে পানির নিচে পড়ে থাকবে বেশির ভাগ অংশ। আর ভেজাল হলে তা মিলিয়ে যেতে থাকবে।

-মধু ফ্রিজে রাখুন। যদি না জমে তবে সেটা আসল। আর যদি সামান্যতম অংশও জমে তবে সেটা ভেজাল।

- একটি ম্যাচের কাঠির মধ্যে সামান্য মধু নিয়ে সেটা দিয়ে আগুন জ্বালান। যদি আগুন জ্বলে তবে সেটা খাঁটি। কারণ খাঁটি মধু দাহ্য।

যদিও এসব নিয়ে বেশ বিতর্ক রয়েছে। কারণ হিসেবে গবেষণায় দেখানো হয়েছে মধুতে সামান্য মোম মিশিয়ে দিলে সেটা পানির নিচে চলে যাবে। ম্যাচের কাঠির মধ্যে নিলেও আগুন জ্বলবে। আবার আঙুলে নিলেও সহজে ছড়াবে না। তাই খাঁটি মধু চেনাটা বেশ মুশকিলই বটে।