বিগত বছরের ৩০ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয় ‘সরকারি কর্মচারীদের জন্য ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে গৃহনির্মাণ ঋণ প্রদান নীতিমালা, ২০১৮’ জারি করে। এ নীতিমালা ১ জুলাই ২০১৮ থেকে কার্যকর হয়। এ নীতিমালার আলোকে সরকারি কর্মচারীরা বেতন গ্রেড ও কর্মস্থলভেদে ২০ লক্ষ থেকে শুরু করে ৭৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঋণসুবিধা পাবেন। নীতিমালায় বলা আছে, সুদের হার সর্বোচ্চ ১০%, এটি হবে সরল সুদ এবং সুদের ওপর কোনো সুদ আদায় করা হবে না। ঋণগ্রহীতা কর্মচারী ব্যাংক রেটের সমহারে- ৫% সুদ পরিশোধ করবে এবং সুদের অবশিষ্ট অর্থ সরকার ভর্তুকি হিসেবে প্রদান করবে।
এর আগে গত ২০ আগস্ট ২০১৮ মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮’ এর অনুমোদন দেওয়া হয়। এই আইনের ৪১ ধারার উপধারা (১)-এ বলা আছে, ‘কোনো সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত অভিযোগে দায়েরকৃত ফৌজদারি মামলায় আদালত কর্তৃক অভিযোগপত্র গৃহীত হওয়ার আগে তাকে গ্রেপ্তার করতে হলে সরকার বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি গ্রহণ করতে হবে।’ এটা সত্য যে, সরকারি কর্মচারীরা সরকারের নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের অপরিহার্য প্রতিনিধিত্বকারী। সময়ের আবর্তে আমাদের দেশে সরকারি কর্মচারীরা একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সেই বিবেচনায় তাদের কিছু বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু তাতেও একটা মাত্রা ও ভারসাম্য থাকা উচিত। প্রজাতন্ত্রে একটি বিশেষ শ্রেণিকে অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা সমাজে বসবাসকারী অন্য শ্রেণিদের সঙ্গে ব্যাপক বৈষম্য তৈরি করে। এটি রাষ্ট্রের অন্য পেশাজীবীদের মধ্যে হতাশা এবং ‘হীনমন্যতা’ সৃষ্টি করতে পারে।
বিগত বছরগুলোতে সরকারি কর্মচারীদের জন্য সরকার পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা প্রদান করেছে। ২০১৫ সালে সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল দেওয়া হয়েছে, যা আগের তুলনায় দ্বিগুণ। এছাড়া সরকারি কর্মচারীদের কল্যাণে শিক্ষা অনুদান ও চিকিৎসা অনুদান রয়েছে। বর্তমানে আমাদের যে সব শিক্ষার্থী তাদের ভবিষ্যতের দিকে চোখ রাখছে, তাদের মধ্যে অনেকেই এমন একটি কর্মজীবন বেছে নিতে চাইবে যেখানে থাকবে পেশাগত ক্ষমতা ভোগ করার অবাধ সুযোগ এবং একই সঙ্গে নানামুখী অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ। কিন্তু প্রজাতন্ত্রে যদি শুধুমাত্র সরকারি কর্মচারীরাই পেশাগত ক্ষমতা আর নানামুখী অর্থনৈতিক সুবিধা ভোগ করেন, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুধুমাত্র সরকারি কর্মচারীই হতে চাইবে- অন্য কিছু নয়! এবং হচ্ছেও তাই! বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার তুলনায় বিসিএস প্রস্তুতির পড়া বেশি পড়ে। যারা বিসিএস ক্যাডার হতে পারে না, তারা যেকোনো ভাবেই হোক একটা সরকারি চাকরি চায়। আমরা যদি আমাদের চারপাশে তাকাই, তাহলে দেখব বর্তমানে যারা স্কুল-কলেজে পড়ে তারা কেউ উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখে না। তারা সবাই ভবিষ্যতে চাকরিজীবী হওয়ার স্বপ্ন দেখে। চারদিকে এখন শিক্ষার্থী কম, চাকরিপ্রার্থীদের সংখ্যাই বেশি! অভিভাবকরাও তাদের সন্তানদের নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য চাকরি চান। আর সেটা যে সরকারি চাকরি, তা বলাই বাহুল্য।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে, আমাদের দেশে বিজ্ঞানে আগ্রহী শিক্ষার্থীর সংখ্যাও আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। ইউজিসি-র ২০০৬ সালের হিসাব অনুযায়ী সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ছিল ১৭ শতাংশ। কিন্তু ২০১৬ সালে তা কমে হয়েছে মাত্র ১১ শতাংশ! অনেক শিক্ষার্থী মনে করে যে বিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা চাকরির সুযোগ সীমিত। চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের অন্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিতে হয়। বিজ্ঞান পঠন-পাঠন অপেক্ষাকৃত কঠিন। গবেষকরা বলেন, বিজ্ঞান বিষয়ের জ্ঞান প্রতি পাঁচ বছরে দ্বিগুণ হয়। তাহলে আর বাড়তি পরিশ্রম, অর্থ, সময় ব্যয় করে বিজ্ঞান পড়া কেন? অর্থাৎ, এখানেও শিক্ষার উদ্দেশ্য অভিন্ন চাকরি করা!
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ, এবং পর্যায়ক্রমে উন্নত দেশের মর্যাদা অর্জনের পথে আমাদের নীতিনির্ধারণী, গবেষণা, উৎপাদন ও সৃষ্টিশীল পর্যায়ে মেধাবী ও দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন। মেধাবীরা যদি সবাই সরকারি কর্মচারী হয়ে যায় তাহলে সেই পর্যায়ে কারা যাবে? খুব স্বাভাবিকভাবেই তখন সেই সব পর্যায়ে তুলনামূলকভাবে কম মেধাবী এবং কম দক্ষ জনশক্তি জায়গা করে নেবে। অথচ আমাদের দরকার কৃষি, শিল্প, শিক্ষা ও গবেষণা, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, অর্থনীতি ও ব্যবসা, সামাজিক উন্নয়ন প্রভৃতি ক্ষেত্রে মেধাবী এবং দক্ষ জনশক্তি।
বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে সরকারি চাকরি আকর্ষণীয় করা হয়েছে। সব সরকারের সময়েই সরকারি কর্মচারীদের অতিরিক্ত সুবিধা প্রদান করা হয়; কিন্তু তাতে পুরনো সুবিধা কমার নজির খুব একটা নেই। ফলাফলস্বরূপ, স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরে এসে সেই ধারাবাহিক সুবিধাগুলোর কারণে এখন রাষ্ট্রের অন্য সব শ্রেণি এবং সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে একটা ব্যাপক বৈষম্য চোখে পড়ে।
বর্তমানে একজন সরকারি কর্মচারী তার কর্মক্ষেত্রে এবং কর্মক্ষেত্রের বাইরে পেশাগত ক্ষমতা ভোগ করার পাশাপাশি নানান আর্থিক সুবিধা, সামাজিক মর্যাদা, চাকরির নিরাপত্তা, পারিবারিক সুরক্ষা, আইনি সুরক্ষাসহ আরও অনেক অতিরিক্ত সুবিধা ভোগ করেন। এই বাস্তবিক চিত্র আমাদের মেধাবী তরুণদের মনে স্বপ্ন তৈরি করেছে তারা ভবিষ্যতে সরকারি চাকরি করবে- কোনো নীতিনির্ধারক বা উদ্যোক্তা হবে না; উৎপাদন বা সৃষ্টিশীল পেশায় যাবে না! যা আমাদের কারোরই কাম্য হতে পারে না। রাষ্ট্রের প্রয়োজনেই আমাদের এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। নতুন বছরে এই হোক আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক : শিক্ষক ও লেখক