সরকারি সব আইন কর্মকর্তাদের পদত্যাগ করতে বলা হবে গত রবিবার আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের এ বক্তব্যের পর আইন অঙ্গনে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। পরে মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল, পিপি, এপিপি, জিপি এবং এজিপিদের পদত্যাগ করতে বলা হবে। হঠাৎ প্রকাশ্যে আইনমন্ত্রীর এ ঘোষণায় উচ্চ ও নিম্ন আদালতে রাষ্ট্রের আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালনরত কর্মকর্তাদের কারও কারও মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশা ও অস্বস্তি। তবে পদত্যাগের আগাম প্রস্তুতিও শুরু করেছেন অনেকেই। আর দায়িত্ব পালনের সুযোগ অব্যাহত
থাকবে বলেও আশায় আছেন অনেকে। গতকাল সোমবার সুপ্রিম কোর্টসহ কয়েকজন আইন কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য জানা গেছে।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে গত রবিবার আয়োজিত আলোচনা সভায় আইন কর্মকর্তাদের পদত্যাগের পর যোগ্যদের নিয়োগ ও হাইব্রিডদের বাদ দেওয়া হবে বলেও জানান আইনমন্ত্রী। এ সময় সেখানে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী ও সরকারদলীয় আইনজীবী নেতারাসহ সরকারি আইন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে অ্যাটর্নি জেনারেল, ২ জন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল, ৬৭ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও ১০৭ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলসহ মোট ১৭৭ জন রাষ্ট্রীয় আইন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া ঢাকা মহানগর দায়রা আদালত, ঢাকা জেলা জজ আদালতেও দায়িত্ব পালন করছেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আইন কর্মকর্তা।
আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনমন্ত্রী তার কথা বলেছেন। এখন আমি কি আইনমন্ত্রীর বক্তব্য কনট্রাডিক্ট (অস্বীকার) করতে পারি? এটি কি আমার জন্য এমবারাসমেন্ট নয়?’
অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোমতাজ উদ্দিন ফকির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করেছে আওয়ামী লীগ। এই সময়ে অনেক হাইব্রিড ও অযোগ্য লোক সরকারি আইন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন। কেউ কেউ দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। আইনমন্ত্রী এখন কাজের গতিশীলতা বাড়াতে দক্ষ লোক নিয়োগ দিতে চাইছেন। তাই নতুনরা আসবে এটি স্বাভাবিক।’ তিনি আরও বলেন, ‘আইনমন্ত্রীর প্রকাশ্যে এ ঘোষণায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে সুবিধা হবে। অনেকে নিজ থেকে পদত্যাগের প্রস্তুতি নিতে পারবেন। আমি নিজেও এই দায়িত্বে দীর্ঘদিন আছি। আমিও পদত্যাগের প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের প্রধান কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আবু বলেন, ‘এটি সরকারের পলিসি। এখন সরকারের পলিসি যেভাবে হয় সেটিকেই অনুসরণ করতে হবে।’ তিনি দেশ রূপান্তরকে আরও বলেন, ‘যারা দল করে না, দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন কিংবা যারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কাজ করছেন তারা এই পদের যোগ্য নন। সরকার যদি মনে করে যে আমাকে দিয়ে হবে না, তাহলে আমাকে রাখবে না। এখানে চাওয়া পাওয়ার কোনো হিসাব নেই। আর আইনমন্ত্রী তো বলেছেন যারা যোগ্য এবং ত্যাগী তাদের অগ্রাধিকার থাকবে এবং কোনো হাইব্রিড নেওয়া যাবে না।’
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিৎ রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেকে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্বশীলতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন। হঠাৎ এই ঘোষণায় কিছুটা অস্বস্তি হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে এটি কারও জন্য স্থায়ী কোনো পদ নয়; একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সরকারের আইন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন মাত্র। এখন তো একটি নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে থেকে আইন পেশা চালাতে হয়। পদত্যাগের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। এখন থেকে স্বাধীনভাবে আইন পেশায় কাজ করতে পারব। ’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘নিকট অতীতে সরকার যখন মনে করেছে কাউকে অব্যাহতি দেওয়া প্রয়োজন সেটি যেমন দিয়েছে তেমনি নতুন কাউকে নিয়োগও দিয়েছে। কিন্তু এভাবে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে পদত্যাগের কথা বলা হয়নি। রবিবার আইনমন্ত্রীর এমন প্রকাশ্য ঘোষণার জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। কিছুটা অস্বস্তি কাজ করাই স্বাভাবিক। তবে পদত্যাগের প্রস্তুতি যেমন নিয়ে রেখেছি তেমনি আশায়ও আছি।’
দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে একই কথা বলেছেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল রাফি আহমেদও। তিনি বলেন, ‘প্রকাশ্যে এমন ঘোষণায় কিছুটা অস্বস্তি তো হতেই পারে। দীর্ঘদিন নিষ্ঠার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আদালতে দায়িত্ব পালন করেছি।’ তবে এখন নতুনদের সুযোগ দিতে পদত্যাগের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেও জানান এই আইন কর্মকর্তা।