ভর দুপুরেও লাক্কাতুরা টি এস্টেটের সূর্যটা বড় স্নেহময়। শীতের সকালের মিষ্টি রোদের আদর বিলায়। বাগানের মাঝেই দেশের সবচেয়ে নয়নজুড়ানো সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়াম। দর্শক-সমর্থকরা গ্যালারি আর খাঁজকাটা টিলার কোলে উপভোগের মন্ত্র পড়েন। পাশেই শরীরের আদল হারিয়ে যন্ত্রণাকাতর টিলাটাও বিনা পয়সার দর্শকে প্রাণ ফিরে পায়। আর এই মাটিতে পা রেখেই প্রাণ ফিরে পেল খুলনা টাইটান্স।
ঢাকায় টানা ৪ হারে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল খুলনার। পঞ্চম ম্যাচেও হারলে নিজেদের বিপিএল ভাগ্য একরকম অন্যের হাতে তুলে দিতে হতো। গতকাল সিলেট ভাগ্য ফেরাল মাহমুদউল্লাহর দলের। এখানকার পর্বের উদ্বোধনী ম্যাচে রাজশাহী কিংসের বিপক্ষে ব্যাটিংয়ে যা হয়েছিল তাতে আতঙ্ক নিয়েই বোলিংয়ে নেমেছিল দলটি। অবশ্য স্পিনার তাইজুল ইসলামের নৈপুণ্য আর রাজশাহী ব্যাটারদের আত্মঘাতী হওয়ার প্রবণতায় ইনিংসের আধেক যেতেই জয়ের আভাস মিলল। শেষে সেটা বাস্তবতা। জুটল লাইফলাইন। এক ম্যাচ বাদেই হারল রাজশাহী। ৫ ম্যাচে পয়েন্ট চারই রইল তাদের। সমান খেলায় ২ খুলনার।
ঢাকার আনপ্রেডিক্টেবল উইকেটেও শেষদিকে মারকাটারি খেলা দেখা গিয়েছিল। এখানে শুরুটা অন্তত ব্যাটসম্যানদের উৎসবে হলো না। টস হেরে ৮২ রানে খুলনা ৬ উইকেট হারাল। জবাবে মরিয়া খুলনার বোলিংয়ের সামনে রাজশাহীর ৬ উইকেট পড়ল ৫৫ রানে। ভাগ্যিস আগে ডেভিড ভিসা (১৩) ও আরিফুল হক (২৬) সপ্তম উইকেট জুটিতে ম্যাচ সর্বোচ্চ ৩৪ দাঁড় করিয়েছিলেন। এটাই শেষে ব্যবধান গড়ে দেয়। ওটাতে ভর করেই মেলে মাঝারি মানের পুঁজি। রাজশাহীর কাছে অনতিক্রম্য। ৭৪ রানে ৮ উইকেটের পতন। আরিফুলের ম্যাচ সর্বোচ্চ ২৬ খুলনার ২৫ রানের প্রাণ ফেরানো জয়ে প্রথম ত্রাণকর্তা।
খুলনার ইনিংসে দুই অঙ্কে যাওয়া ব্যাটার ৬ জন। সর্বোচ্চ ২৬। বাকি ৫টি ১১, ১৩ (দুটি), ১৪, ১৫। অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহর ৯। দুটি পরিবর্তন নিয়ে নেমেও ব্যাটিংয়ে উন্নতি হয়নি। পল স্টার্লিংয়ের জায়গায় ওপেন করে জহুরুল ইসলামের ১৩। একই স্কোর ভিসার।
ভিসা বোলিং ওপেন করে প্রতিদান ভালোই দিলেন। কিন্তু সবার ওপরে উঠে এলো বাঁহাতি তাইজুলের ৪-০-১০-৩। তারপর মাহমুদউল্লাহর ২ উইকেট। টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারের সেরা বোলিংটা দলের কি দরকারের দিনেই না করলেন তাইজুল! আগের চার ম্যাচে ২ উইকেট টেস্ট বিশেষজ্ঞর এই ফরম্যাটের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। খুলনা ভরসা রেখে দেখল মেহেদী হাসান মিরাজ (২৩), সৌম্য সরকার (২), রায়ান টেন ডেস্কাটকে (১৩) শিকার করেন বোলার। তাইজুল একাই গুঁড়িয়ে দিলেন রাজশাহীর মিডল অর্ডার। প্রথম ৬ উইকেটের ৩টি তার। ডেস্কাট ক্যাচ দেন উইকেটের পেছনে। খুলনার উৎসব শুরু ওখানে।
প্রথম ওভারই জুনায়েদ খান ফেরান লরি ইভান্সকে (০)। ক্যাচটা তাইজুলের। অন্য ওপেনার মুমিনুল হক (৭) মাহমুদউল্লাহর প্রথম ওভারের শিকার। নিজের প্রথম ওভারে উইকেটশূন্য তাইজুল পরের ওভারে নেন ২ উইকেট। মারমুখী অধিনায়ক মিরাজ ১৬ বলে ১ ছক্কা ও ২ চার মেরে আউট। ৩ উইকেটে ৩২। এর ২৩ মিরাজের। তাইজুলের ওই ওভারেই সৌম্য হয়েছেন ব্রাফেটের চমৎকার ক্যাচ। পতনে একটু বিরতির পর মাহমুদউল্লাহ আবার উইকেট নেন। ফেরেন জাকির হাসান (৭)। দ্বাদশ ওভারে ফের বোলিংয়ে ফিরে ডেস্কাটকে তাইজুল তুলে নিতেই রাজশাহীর হারটাকে আনুষ্ঠানিকতার অপেক্ষার মতো লাগে।
তবু হাঁচড়ে-পাঁচড়ে শেষ ওভারে যায়, ১০০ পেরোয় রাজশাহী। ছোট সংগ্রহের পরও সহজ জয়ে বুকের হাপর ভরে স্বস্তির দীর্ঘ নিঃশ্বাস টানেন মাহমুদউল্লাহ। সাথে তার দল খুলনা।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
খুলনা টাইটান্স : ১২৮/৯, ২০ ওভার (আরিফুল ২৬, মালান ১৫, জুনায়েদ ১৪, জহুরুল ১৩, ভিসা ১৩, শান্ত ১১, মাহমুদউল্লাহ ৯; মিরাজ ২/২১, আরাফাত সানি ২/২৫, উদানা ২/৩৬)।
রাজশাহী কিংস : ১০৩/১০, ১৯.৫ ওভার (মিরাজ ২৩, আরাফাত সানি ১৫, জঙ্কের ১৫, ডেস্কাট ১৩, রাব্বি ১৩ মুমিনুল ৭, জাকির ৭, সৌম্য ২; তাইজুল ৩/১০, জুনায়েদ ৩/২৬, মাহমুদউল্লাহ ২/১২, ভিসা ১/২৮)।
ফল : খুলনা টাইটান্স ২৫ রানে জয়ী।
ম্যাচসেরা : তাইজুল ইসলাম।