একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘বিতর্কিত’ ও ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ আখ্যায়িত করে অনিয়মের বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। গতকাল মঙ্গলবার ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংস্থাটি। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নির্বাচনে সব দল অংশ নিলেও সরকারি দল আওয়ামী লীগ এককভাবে সব সুবিধা ভোগ করায় একে ‘আংশিক অংশগ্রহণমূলক’ বলা যায়। ব্যাপক অনিয়ম, কারচুপি ও রাতের মধ্যে ব্যালটে সিল মারা, বিরোধী দলের এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়াসহ নানা কারণে নির্বাচন বিতর্কিত এবং প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ছিল লজ্জাজনক।
তিনি বলেন, অব্যাহতভাবে বিরোধী দলের প্রার্থী ও নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার, হয়রানি, ভয়ভীতি দেখানো, সভা-সমাবেশে বাধা দেওয়াসহ সরকারি দলের নানা কর্মকাণ্ডে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মৌনতা ছিল অগ্রহণযোগ্য। তার (সিইসি) ভাগনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া, নির্দিষ্ট একটি প্রতীকে সিল মারতে বাধ্য করার মধ্য দিয়ে যে নির্বাচন হয়েছে তা অভূতপূর্ব। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ছিল আরও বিতর্কিত। ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নির্বাচন নিয়ে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে সরকার বিচার বিভাগীয় তদন্ত করে কিছুটা হলেও জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে। টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সুলতানা কামাল বলেন, টিআইবি যে তথ্য পেয়েছে তাতে এ নির্বাচন ছিল ত্রুটিপূর্ণ ও প্রশ্নবিদ্ধ, দেশের গণতন্ত্র বিকাশের পথে যা বাধা হয়ে থাকবে। এর মধ্য দিয়ে যারা নির্বাচিত হয়েছেন তাদের প্রতি জনগণের আস্থার সংকট সৃষ্টি হবে।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দিন থেকে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত ৪৫টি জেলার ৫০টি আসন থেকে তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিবেদন তৈরি করে টিআইবি। এতে বলা হয়েছে, সবগুলো আসনে প্রচারের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলকে এককভাবে সক্রিয় দেখা গেছে। কোনো কোনো আসনে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে সরাসরি প্রচারের জন্য সুবিধা আদায়, প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রার্থীর প্রচারে অংশগ্রহণ, সরকারি সম্পদ ব্যবহার করে প্রচার হয়েছে। এ ছাড়া গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ৪৪টি আসনে বিরোধী দলের প্রার্থীদের মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকেই দলীয় নেতাকর্মীদের নামে মামলা, পুলিশ, প্রশাসন কর্র্তৃক হুমকি, হয়রানি, প্রার্থী, নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার অব্যাহত ছিল। এসব আসনে ১২ হাজার ৬৮৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়, যাদের মধ্যে তিন হাজার ৭৩৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর বাইরে অক্টোবর মাস পর্যন্ত সারা দেশে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয় চার হাজার ১৩৫টি, যাতে আসামি করা হয় তিন লাখ ৬০ হাজার ৩১৪ জনকে। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী ও কর্মীদের দ্বারা বিভিন্ন সময়ে ভয়-ভীতি দেখানো, গ্রেপ্তার হওয়া ও মামলা থাকার কারণে বিরোধী দলের প্রার্থী ও নেতাকর্মীরা প্রচার চালাতে ব্যর্থ হন। ৫০টি আসনের মধ্যে ১৯টি আসনে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। প্রতিপক্ষ দলের প্রার্থীদের নেতাকর্মীদের মধ্যে মারামারি, সরকারবিরোধী দলের প্রার্থীর সমর্থক ও নেতাকর্মীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, হামলা, নির্বাচনী ক্যাম্প ভাঙচুর করা, পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ৫০টির মধ্যে ৩৬টি আসনে বিরোধী দলের প্রচারে বাধা দেওয়ার ঘটনা আছে বলে তুলে ধরা হয়েছে।
টিআইবি বলেছে, ক্ষমতায় থাকার কারণে বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে ‘থ্যাংক ইউ পিএমসহ সরকারের উন্নয়নমূলক ১০টি অনুষ্ঠান সম্প্রচার হয়েছে, যার মূল্য প্রায় ১৪ কোটি টাকা। এ ছাড়া নিয়ম করে বিটিভির সংবাদ বেসরকারি চ্যানেলগুলোতে প্রচার করায় সরকারি দল আরও বেশি সুবিধা পেয়েছে। ডিজিটাল প্রচার থেকে শুরু করে সরকারি দল ২০১৮ সালের শুরু থেকে নির্বাচনী প্রচারে ছিল। এতে যে খরচ হয়েছে তার সবটাই ছিল রাষ্ট্রের সম্পত্তি, যা নীতিগত দিক থেকে অন্যায়।
টিআইবির অনুসন্ধান অনুযায়ী, মনোনয়ন যাচাই-বাছাই শেষে এবার সর্বোচ্চ ৭৮৬ জনের প্রার্থিতা বাতিল হয়। এর মধ্যে বিএনপির ১৪১ জনের মনোনয়ন বাতিল হয়। অন্যদিকে সরকারি দলের মনোনয়ন বাতিল হয় মাত্র তিনটি। বিরোধী দলের ২৩ জনের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়। এ ছাড়া ৫০টি আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশনের বেঁধে দেওয়া নিয়মের (২৫ লাখ) চেয়ে পাঁচগুণ বেশি খরচ করেছেন।
টিআইবির প্রতিবেদন অনুসারে নির্বাচন অগ্রহণযোগ্য হয়েছে কি না- এমন প্রশ্নের সোজাসুজি উত্তর দেননি ইফতেখারুজ্জামান। কারা ভোট কারচুপি করেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কারা করেছে তা প্রকাশ করা যাবে না।’