লাখ টাকায় মিলছে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদ!

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৪৬ এএম

বিদেশে উচ্চশিক্ষা, মাইগ্রেশন, ঘুরতে যাওয়া, চাকরি ইত্যাদি ক্ষেত্রে পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের বিকল্প নেই। থানা, জেলা কিংবা নগর পুলিশ থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে যাচাই-বাছাই শেষে পাওয়া যায় ‘পুলিশ ক্লিয়ারেন্স’ সার্টিফিকেট। তবে ইদানীং একটি জালিয়াতচক্র স্ক্যান করা নথিতে এডিটিং সফটওয়্যার, পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ভুয়া সিল ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে হুবহু পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট তৈরি করছে। ভুয়া কিউআর কোডসহ নকল ওয়েবসাইট তৈরি করে এবং নথিপত্রে ভুয়া এনআইডি বা জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ায় ধোঁকা দিয়ে সাধারণ মানুষকে বোকা বানাচ্ছে চক্রটি।

গত ১৬ আগস্ট রাতে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ কর্তৃপক্ষ এমন একটি চক্রের সন্ধান পেয়েছে। জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, “পুলিশের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা ছাড়াই জালিয়াতির মাধ্যমে চক্রটি জাল ‘পুলিশ ক্লিয়ারেন্স’ সার্টিফিকেটের বিনিময়ে হাতিয়ে নিচ্ছিল মোটা অঙ্কের টাকা।’ পুলিশ বলছে, ভুয়া ‘পুলিশ ক্লিয়ারেন্স’ নিয়ে কারা বিদেশ যাচ্ছেন সে ব্যাপারে নেই কোনো ভেরিফিকেশন। বিদেশ গমনেচ্ছুকদের নেওয়া পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট যাচাই-বাছাই করার মতো থার্ড কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। যে কারণে সহজেই ‘ভুয়া পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট’ দিয়ে বিদেশ যাওয়া যাচ্ছে। জাল পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদ তৈরি করে একেকটি বিক্রি হতো লাখ টাকার বেশি।”

জেলা পুলিশ জানিয়েছে, ১৬ আগস্ট রাতে চট্টগ্রাম নগর ও জেলার বাঁশখালীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন মো. আশরাফ আলী খান (৩৬), মো. নিশান (৩৬), মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন (৪৮) ও মো. আবদুর রহমান (৪৬)। গ্রেপ্তার আশরাফ আলী খান রাঙ্গুনিয়া থানার রাজানগর ইউনিয়নের বগাবিল এলাকার, মো. নিশান সন্দ্বীপ পৌরসভার হরিষপুর এলাকার, আব্দুল্লাহ আল মামুন রাঙ্গুনিয়ার মধ্যম ঘাগড়া এলাকার এবং আব্দুর রহমান বাঁশখালী পৌরসভার দক্ষিণ জলদি এলাকার বাসিন্দা।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তাররা জানিয়েছেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে পুলিশ ও সরকারি কর্মকর্তাদের সই জাল করে নথি তৈরি এবং সেটিকে বিশ্বাসযোগ্য করতে নকল ওয়েবসাইট তৈরি ও কিউআর কোড ব্যবহার করে আসছিল। পুলিশ জানায়, সম্প্রতি বাঁশখালীর জাকির হোসেন নামে এক ব্যক্তির পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের প্রয়োজন পড়ে। দ্রুততম সময়ে তাকে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদ দেওয়ার আশ্বাসে তার কাছ থেকে ১ লাখ ২৩ হাজার টাকা নেয় চক্রটি। পরে তাকে একটি জাল ‘পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদ’ দেয় তারা। সাধারণভাবে দেখে বোঝার উপায় নেই, এটি জাল। সনদে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের সই ও সিল রয়েছে। রয়েছে কিউআর কোড। স্ক্যান করলে বাংলাদেশ পুলিশ পরিচয়ে একটি ওয়েবসাইটেও সনদটি দেখা যাচ্ছে। জাল ‘পুলিশ ক্লিয়ারেন্স’ পাওয়ার পর জাকির হোসেন নির্দিষ্ট ট্রাভেল এজেন্সিতে সনদটি জমা দেন। তবে সেখানে বিষয়টি ধরা পড়লে জাকির হোসেন চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দেন। এরপর চক্রটির সন্ধানে নামে পুলিশ।

পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ‘জাকিরের অভিযোগ পাওয়ার পর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চক্রটিকে শনাক্তের জন্য কাজ শুরু করে পুলিশ। অল্প সময়ের মধ্যে চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। চক্রের বাকি সদস্যদের গ্রেপ্তারের অভিযান চলছে। এই ঘটনায় ভুক্তভোগী বাঁশখালী থানায় মামলা করেছেন।’ জেলা পুলিশের শীর্ষ এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘দালালরা জাকির হোসেনের কাছ থেকে ১ লাখ ২৩ হাজার টাকা নিয়েছেন। তবে সব মিলিয়ে এটি তৈরি ও ভুয়া ওয়েবসাইটে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে খরচ হয়েছে ৩ হাজার টাকা। বাকি ১ লাখ ২০ হাজার টাকাই তাদের লাভ।’

অতিরিক্ত চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার রাসেল (ট্রাফিক) বলেন, ‘জাকির যখন আমাদের কাছে কথিত পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদটি নিয়ে আসেন, তখন দেখলাম কিউআর কোড স্ক্যান করলেই বাংলাদেশ পুলিশের ওয়েবসাইট ক্লোন করে তৈরি করা একটি জাল ওয়েবসাইটে সনদটি দেখাচ্ছে। চক্রটিতে কয়েক স্তরের লোক রয়েছে। কয়েকজন রয়েছে দালাল। আর কিছু ব্যক্তি অনলাইনে কাজ করেন। তারা কিউআর কোড, ওয়েবসাইট তৈরিতে পারদর্শী। গ্রেপ্তার হওয়া চারজন মূলত দালাল।’

জাকির হোসেনের ভাই নূর হোসেন দেশ রূপান্তরকে জানান, তার ভাইয়ের নামে থানায় ফৌজদারি মামলা রয়েছে। তাকে বিদেশ পাঠাতে পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের দরকার হলেও মামলা থাকায় তারা সরাসরি আবেদন করেনি পুলিশের কাছে। পূর্বপরিচিত এক ব্যক্তি বাঁশখালীর একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে চাকরি করেন। এ বিষয়ে সহায়তা পেতে তার কাছে শরণাপন্ন হয়েছিলেন তারা। আবদুর রহমান নামের ওই ব্যক্তিই ১ লাখ ২৩ হাজার টাকায় পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিয়ে দিতে পারবেন বলে জানান। এ জন্য গত ২১ জুলাই ৮০ হাজার টাকা অগ্রিম দেন। ১২ আগস্ট জাল পুলিশ ক্লিয়ারেন্স হাতে পাওয়ার পর বাকি টাকা পরিশোধ করেন।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, পুলিশের ক্লিয়ারেন্স নিতে এখন আর থানায় থানায় ঘুরতে হয় না। ঘরে বসে অনলাইনে আবেদন করেই স্বল্প সময়ে পাওয়া যায়। বিদেশগামী বা বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশি নাগরিকরা দেশে বা দেশের বাইরে যেকোনো স্থান থেকেই ইন্টারনেট ব্যবহার করে ঢ়পপ.ঢ়ড়ষরপব.মড়া.নফ ঠিকানায় অথবা বাংলাদেশ পুলিশের ওয়েবসাইটে (www.police.gov.bd) থেকে পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের আবেদন করতে পারবেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত