শিক্ষকদের সাত হাজার কোটি টাকা লোপাট

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৪৭ এএম

এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর-সুবিধা ও কল্যাণ তহবিলের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। শুধু তা-ই নয়, বিধি লঙ্ঘন করে বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংকে টাকা রাখায় আটকে আছে আরও প্রায় ৬৪০ কোটি টাকা। দীর্ঘদিন ধরে তহবিলের অর্থ না পাওয়ায় ১ লাখ ২৩ হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারী ভোগান্তিতে রয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, অবসর ও কল্যাণ বোর্ডে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের শাসনামলে ৭ হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

দীর্ঘ চাকরিজীবন শেষে শিক্ষক-কর্মচারীরা যখন অবসর ও কল্যাণ তহবিলের টাকা পেতে পাখির পলকে তাকিয়ে থাকেন তখন ঘটছে লুটপাটের ঘটনা। এক দুই টাকা নয়, প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। অবসর ও কল্যাণ বোর্ডের শীর্ষ কর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এর মধ্যে রয়েছেন। নিয়ম লঙ্ঘন করে সরকারি ব্যাংকের পরিবর্তে বেসরকারি ব্যাংকে টাকা রাখায় প্রায় ৬৪০ কোটি টাকা আটকে আছে। অন্যদিকে নামে-বেনামে ভুয়া ইনডেক্স তৈরি করে কোটি কোটি টাকা  লোপাটের ঘটনা ঘটেছে।

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অবসর-সুবিধা ও কল্যাণ তহবিলের ৭ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। একই কথা জানিয়েছেন বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শিক্ষকদের অবসরভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। কারা এর পেছনে জড়িত তা খুঁজে বের করবে বর্তমান সরকার।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অবসর ও কল্যাণ বোর্ডের যাবতীয় অনিয়ম খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। কমিটিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা ও আইন শাখার অতিরিক্ত সচিবকে আহ্বায়ক করা হয়েছে। সদস্য করা হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আইন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ) ফায়িম ফয়সালসহ আরও তিন উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাকে। তদন্তের স্বার্থে মুখ খুলতে চান না কোনো সদস্য।

অবসর-সুবিধা বোর্ডের সচিব মোশাররফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অবসর ও কল্যাণ বোর্ডে যেসব অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে তা খতিয়ে দেখতে এ কমিটি হয়েছে। দুর্নীতির সঙ্গে যারা জড়িত তাদের প্রত্যেকের পরিচয় প্রকাশ করা হবে।

এর আগে ২০২৫ সালের শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের বিশেষ নিরীক্ষায় অবসর সুবিধা বোর্ডের অর্থ ব্যবস্থাপনায় নানা অনিয়ম ও অসংগতি ধরা পড়ে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইন লঙ্ঘন করে সরকারি ব্যাংকের পরিবর্তে বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংকে রাখা আমানতের অর্থ ফেরত না পাওয়ায় বোর্ডের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৬৩৯ কোটি ৬০ লাখ ৬১ হাজার ৭২৫ টাকা। প্রতিবেদনে বিভিন্ন অনিয়মের চিত্র উঠে আসে। নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের নামে ভুয়া ইনডেক্সে জাল আবেদনের মাধ্যমে টাকা তোলা হয়েছে। এ বাবদ যে কমিশন আসে তা বোর্ডের নামে ভুয়া অ্যাকাউন্ট তৈরি করে হাতিয়ে নেওয়া হয়। ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে এ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।

সরকারি ওই প্রতিবেদনে, অবসর-সুবিধা বোর্ডের সাবেক সচিব অধ্যক্ষ শরীফ আহমদের নাম উঠে এসেছে। বর্তমানে তিনি পলাতক। অধ্যক্ষ শরীফ আহমদের নেতৃত্বে পরিচালিত দুর্নীতিতে আরও তিনজনের নাম উঠে এসেছে। তারা হলেন অবসর বোর্ডের প্রোগ্রামার জামাল হোসেন এবং সফটওয়্যার কোম্পানির মালিক গোলাম সারোয়ার ও মোফাজ্জল মওদুদ এলাহী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৭ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সরকার পতন পর্যন্ত প্রায় আট বছর অবসর বোর্ডের সচিবের দায়িত্বে ছিলেন অধ্যক্ষ শরীফ। তিনি দুর্নীতির মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য গ্রিন বি সফটওয়্যারের সঙ্গে চুক্তি করেন। এ কোম্পানির মালিক ছিলেন গোলাম সারোয়ার ও মোফাজ্জল মওদুদ এলাহী। মোফাজ্জল মওদুদী অধ্যক্ষ শরীফ আহমদের ভাতিজা।

অন্যদিকে, শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইন লঙ্ঘন করে সরকারি ব্যাংকের পরিবর্তে সাতটি বেসরকারি ব্যাংকে রাখা আমানতের অর্থ ফেরত না পাওয়ায় বোর্ডের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৬৩৯ কোটি ৬০ লাখ ৬১ হাজার ৭২৫ টাকা। ব্যাংকগুলো হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সিটিজেনস ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক। এসব ব্যাংকে রাখা অর্থের বড় একটি অংশ এফডিআর ও এসটিডি হিসেবে ছিল।

অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবসর সুবিধা বোর্ডের আইন ও সংশ্লিষ্ট প্রবিধান লঙ্ঘন করে বেসরকারি ব্যাংকে এসব অর্থ রাখা হয়েছিল। পরে ব্যাংকগুলো থেকে আমানতের অর্থ ফেরত চাওয়া হলেও তা পাওয়া যায়নি। এতে তহবিলের ওপর তৈরি হয়েছে বড় ধরনের আর্থিক চাপ।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত