সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর ৩৭টি সেবা বিনামূল্যে দেয় সোনালী ব্যাংক, ১৪টি দেয় নামমাত্র মূল্যে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৯৪ হাজার কোটি টাকার ঋণপত্র খুলে কমিশন পাওয়ার কথা পাঁচ হাজার কোটি টাকারও বেশি। সেখানে সোনালী ব্যাংক দুই কিস্তিতে পেয়েছে মোটে ২০ কোটি।
সরকারের বিভিন্ন সংস্থা সংকটকালে সোনালী ব্যাংক ১৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করে না। বিনিময়ে ৫ শতাংশ সুদহারে ২০ থেকে ৩০ বছর মেয়াদি বন্ড ইস্যু করে ওই ঋণ সমন্বয় করে সরকার। এত বঞ্চনার পরেও বিদায়ী বছরে দুই হাজার ৫৯ কোটি টাকা মুনাফা করা সোনালী ব্যাংক মূলধন ঘাটতি মেটাতে সরকারের কাছে শুধু কাগজে-কলমে একটি পত্র চাচ্ছে। নগদ কোনো টাকা-পয়সা নয়; বন্ডও নয়- শুধু কাগজে-কলমে ছয় হাজার কোটি টাকার সরকারি গ্যারান্টিপত্র ইস্যু হলেই মূলধন ঘাটতি থাকবে না ব্যাংকটির।
এই গ্যারান্টিপত্র চেয়ে গত ১০ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে চিঠি পাঠিয়েছেন সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ।
গত বছর মার্চেও একই ধরনের পত্র দিলেও মন্ত্রণালয় থেকে ওই গ্যারান্টিপত্র দেওয়া হয়নি। ২০১৮ সালে আগের বছরের চেয়ে ৮৬৩ কোটি টাকা বেশি মুনাফা করে আবার ওই সুবিধা চেয়েছে ব্যাংকটি। ২০১৮ সালে ব্যাংক খাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করা সোনালী ব্যাংক বলছে, ওই গ্যারান্টিপত্র পেলে ব্যাসেল-৩ অনুযায়ী ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি থাকবে না।
২০১৮ সালকে ‘এগিয়ে যাওয়ার বছর’ হিসেবে ঘোষণা করে সোনালী ব্যাংক বিভিন্ন সূচকে অগ্রগতি অর্জন করেছে। ২০১৭ সালের তুলনায় গত বছর আমানত বেড়েছে চার হাজার ২৫৭ কোটি টাকা, ঋণ ও অগ্রিম বেড়েছে চার হাজার ১৯ কোটি। ২০১৭ সালে খেলাপি ঋণ থেকে আদায়ের পরিমাণ ছিল এক হাজার ৯১ কোটি টাকা, যা পরের বছর তিন হাজার ৬৭৫ কোটিতে উন্নীত হয়েছে।
এই সময়ে শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ ১৪ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা থেকে কমে ১১ হাজার ৮০০ কোটিতে নেমেছে, লোকসানি শাখার সংখ্যা ১৮১ থেকে ৯৩-তে নেমেছে। ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় ২০১৭ এর ৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ থেকে পরের বছর ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশে নেমেছে।
মো. ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ এ প্রসঙ্গে বলেছেন, মুনাফার ধারা অব্যাহত থাকলেও ব্যাসেল-৩ এর কঠোর নিয়মের কারণে নিট মুনাফা অর্জনের মাধ্যমে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
ব্যাংকের বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় নেওয়া হলে ২০১৯ সালে ১৭ দশমিক ৫০ শতাংশ হিসেবে মূলধন সংরক্ষণ করতে হতে পারে। এতে মূলধন ঘাটতি আরও বাড়তে পারে। এ অবস্থায় সরকারের সহযোগিতা ছাড়া মূলধন ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়।
এর আগে গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সোনালী ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে তখনকার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে সোনালী ব্যাংকের বঞ্চনার নানা তথ্য তুলে ধরে ছয় হাজার কোটি টাকার সরকারি গ্যারান্টিপত্র ইস্যুর অনুরোধ করেন
ব্যাংকটির চেয়ারম্যান। তখন সরকারের পক্ষে সোনালী ব্যাংকের দেওয়া বিভিন্ন বিনামূল্যের সেবার বিপরীতে যৌক্তিক হারে ফি নির্ধারণের প্রস্তাব করে ব্যাংকটি।
বঞ্চনার তথ্য তুলে ধরে ব্যাংকটি বলেছে, নিজস্ব মুনাফার কথা বিবেচনার বাইরে রেখে সরকারের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে সোনালী ব্যাংককে সব সময় কাজ করতে হয়, যা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টিভঙ্গিতে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
এ ক্ষেত্রে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ৯৪ হাজার ২৪৬ কোটি টাকার ঋণপত্র খোলার তথ্য তুলে ধরে ব্যাংকটি বলেছে, সরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে পরিমিত (স্ট্যান্ডার্ড) কমিশন হার দশমিক ৪ শতাংশ। সে হিসেবে সোনালী ব্যাংকের পাঁচ হাজার কোটি টাকারও বেশি কমিশন পাওয়ার কথা। কিন্তু পেয়েছে মোটে ২০ কোটি টাকা। ওই পাঁচ হাজার কোটি টাকা পেলে ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি অনেকটা পূরণ করা সম্ভব হতো বলে মনে করছে ব্যাংকটি। সোনালী ব্যাংক সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর ৩৭টি সেবা বিনামূল্যে দেওয়াসহ সরকারের পক্ষে পেনশন, সঞ্চয়পত্র, ওয়েজ আর্নার্স বন্ড ইস্যু করে থাকে। সরকার থেকে এসব অর্থ পুনঃভরণ পেতে অনেক সময় লাগে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি) ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনসহ (বিএডিসি) সরকারের বিভিন্ন সংস্থা সংকটকালীন সময়ে ১৪ শতাংশ সুদে ঋণ নেয়।
পরে সরকারি সিদ্ধান্তে ৫ শতাংশ হারে ২০ থেকে ৩০ বছর মেয়াদি বন্ড দিয়ে ওই ঋণ সমন্বয় করা হয়। ঋণের বিপরীতে স্বল্পসুদের দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ড পাওয়ায় প্রতিবছর সোনালী ব্যাংকের এক হাজার ৬০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে।