থাইরয়েড গ্রন্থিতে ঘাতক নেই তো

থাইরয়েডের সমস্যা এখন প্রায় ঘরে ঘরে। এই সমস্যা এখন স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার বলতে গেলে এ রোগটি কিন্তু অন্য সব সাধারণ রোগের মতোও নয়। কারণ সমস্যার উপসর্গ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অস্পষ্ট থাকে। লক্ষণগুলো খুব ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এর সংক্রমণ টের পেতে দেরি হয়ে যায়। তখন এটি রূপ নিতে পারে প্রাণঘাতী ক্যানসারে! তাই আগেই সচেতন হওয়া জরুরি। লিখেছেন লায়লা আরজুমান্দ

থাইরয়েড কী?
শরীরের গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থি থাইরয়েড। এটি থাকে আমাদের গলার স্বরযন্ত্রের দুই পাশে। দেখতে প্রজাপতির ডানার মতো। আর এর রংটা হলো বাদামি। এই গ্রন্থির কাজ হলো আমাদের শরীরের কিছু অত্যাবশ্যকীয় হরমোন উৎপাদন করা। এই হরমোন শরীরের সব রেচন প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে। শরীরে থাইরয়েড হরমোন বেড়ে গেলে দেখা দেয় বিভিন্ন সমস্যা।

থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা
থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে সাধারণত দুই ধরনের সমস্যা দেখা যায়, গঠনগত ও কার্যগত। কার্যগত সমস্যা দুই রকমের হয়ে থাকে। তা হলো হাইপোথাইরয়েডিজম ও হাইপারথাইরয়েডিজম।

হাইপোথাইরয়েডিজম
হাইপোথাইরয়েডিজমে থাইরয়েড গ্ল্যান্ড কাজ করে না। শরীরের যে পরিমাণ থাইরক্সিন হরমোন প্রয়োজন, কোনো কারণে যদি তার কম পরিমাণ নিঃসৃত হয় তবে তাকে বলে হাইপোথাইরয়েডিজম। এটি হাশিমটো ডিজিজ বা হাশিমটো থাইরয়েডাইটিস নামেও পরিচিত। এটি একটি অটোইমিউন ডিজিজ।
যখন দেহের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায় তখন ইমিউন সিস্টেম দেহের সুস্থ কোষ ও অঙ্গকে আক্রমণ করে। খুব ধীরে ধীরে হয় বলে এর লক্ষণগুলো অনেকের নজরে আসে না।হাইপোথাইরয়েডিজমের রোগীদের প্রতিদিন ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকরা।

হাইপারথাইরয়েডিজম
হাইপারথাইরয়েডিজমে থাইরয়েড গ্ল্যান্ড বেশি মাত্রায় সক্রিয় হয়ে পড়ে। হাইপারথাইরয়েডিজমকে গ্রেভস ডিজিজও বলা হয়ে থাকে। সাধারণত গ্রেভস ডিজিজ হয়ে থাকে যখন শরীরের ইমিউন সিস্টেম থাইরয়েড গ্ল্যান্ড দ্বারা আক্রান্ত হয়। হাইপারথাইরয়েডিজম সাধারণত ২০ থেকে ৩০ বছরের বেশি বয়সী নারীদের হয়ে থাকে। হাইপারথাইরয়েডিজমের চিকিৎসা হচ্ছে অ্যান্টিথাইরয়েড ওষুধ, যা কিনা থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতাকে কমিয়ে দেবে। অথবা সার্জারি করে পুরো বা  কিছু অংশ কেটে কার্যকারিতা কমিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

গয়টার বা গলগন্ড
থাইরয়েড গ্রন্থির গঠনগত সমস্যায় থাইরয়েড গ্রন্থি ফুলে যায় বা বড় হয়ে যায়, যেটাকে বলা হয় গয়টার বা গলগন্ড। এটা বিভিন্নভাবে বিভিন্ন কারণে হতে পারে। তবে গলগন্ড বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হয়ে থাকে আয়োডিনের স্বল্পতার কারণে। এটার চিকিৎসা নির্ভর করে লক্ষণ, গলগন্ডের আকার ও অন্যান্য সমস্যার ওপর।

গলগন্ড
থাইরয়েড গ্রন্থির কোনো অংশে টিউমারের মতো ফুলে উঠলে বলা হয় থাইরয়েড নডিউল। এক কিংবা একাধিক হতে পারে এই টিউমার সংখ্যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই থাইরয়েড গ্রন্থি বা এর অংশবিশেষ ফুলে ওঠা ক্যান্সার নয়। তবে এটা অনেক সময় ক্যান্সারেও রূপ নিতে পারে।
লক্ষণ
থাইরয়েডের লক্ষণগুলো খুব ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। আর এ জন্য বেশির ভাগ রোগী জানেই না যে তার এই রোগ আছে।
তবে কিছু কিছু লক্ষণ দেখলে সাবধান হওয়া জরুরি। চলুন দেখে নেই সেই লক্ষণগুলো :

ঘুমের পরিবর্তন
আগে রাতে ঠিকমতো ঘুম হতো কিন্তু হঠাৎ ঘুমের সমস্যা হচ্ছে? তাহলে এটা হতে পারে ওভারঅ্যাকটিভ থাইরয়েডের কিছু হরমোনের কারণে। সেই হরমোন অত্যধিক পরিমাণে নিঃসরণ করে সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমকে অতিরিক্ত উত্তেজিত করে। ধীরে ধীরে এটা এগিয়ে যেতে থাকে ইনসমনিয়া বা অনিদ্রা রোগের দিকে। আবার যদি কেউ সারা রাত ঘুমানোর পরেও ক্লান্তি অনুভব করে বা স্বাভাবিক ঘুমের তুলনায় যদি বেশি ঘুমের প্রয়োজন হয় তবে সেটা আন্ডারঅ্যাকটিভ থাইরয়েডের কারণে হতে পারে। আন্ডারঅ্যাকটিভ থাইরয়েডে শরীর পর্যাপ্ত পরিমাণ হরমোন উৎপাদন করতে পারে না।

চুল পাতলা হওয়া
থাইরয়েড সমস্যার লক্ষণ হচ্ছে চুল পাতলা হয়ে যাওয়া, বিশেষ করে ভ্রু। আন্ডারঅ্যাকটিভ বা ওভারঅ্যাকটিভ থাইরয়েড চুলের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। সাধারণত বেশির ভাগ সময়ে কিছু পরিমাণ চুল বিশ্রাম নেয় বা তার বৃদ্ধি স্থগিত থাকে। কিন্তু থাইরয়েডের কারণে বেশির ভাগ চুল একসঙ্গে বিশ্রাম নেয় বা বৃদ্ধি স্থগিত করে। যার কারণে চুল পাতলা হয়ে যায়।

কারণ ছাড়া ঘামা
কোনো পরিশ্রম না করেই বা কারণ ছাড়া যদি শরীরে বেশি ঘাম উৎপন্ন হয়, তবে সেটা হতে পারে হাইপারঅ্যাকটিভ থাইরয়েডের কারণে। যখন শরীরে স্বাভাবিকের থেকে বেশি হয়ে যায় হরমোনের মাত্রা, তখন ব্যক্তি গরম অনুভূত হয়।
ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া গরমের দিনেও যদি কারও ত্বক শুষ্ক থাকে তবে সেটা হতে পারে হাইপোথাইরয়েডিজমের কারণে। কারণ হাইপোথাইরয়েডিজমে থাইরয়েড গ্রন্থি কাজ করে না। ত্বক হারায় তার আর্দ্রতা, ফলে ত্বক হয়ে যায় শুষ্ক।

হঠাৎ উদ্বিগ্ন হওয়া
কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ উদ্বিগ্ন হয়ে যাওয়া থাইরয়েডের আরেকটি লক্ষণ হতে পারে। থাইরয়েড হাইপারঅ্যাকটিভ হলে এমনটা হয়। কারণ থাইরয়েডের মাত্রা বেশি হলে ব্যক্তি কোনো কারণ ছাড়াই রাগান্বিত, ¯œায়বিক দুর্বলগ্রস্ত কিংবা উদ্বিগ্ন করে তোলে। মস্তিষ্ক অনেক বেশি উত্তেজিত থাকে এ সময়।

ওজন বেড়ে যাওয়া
খাওয়ার পরিমাণ না বাড়ানো সত্ত্বেও হঠাৎ ওজন পরিবর্তিত হলে থাইরয়েড হরমোন পরীক্ষা করানো উচিত। কোনো কারণ ছাড়া ওজন বেড়ে যাওয়াটা আন্ডারঅ্যাকটিভ থাইরয়েডের কারণে হতে পারে।

ওজন কমে যাওয়া
খাওয়াদাওয়ার পরিমাণ একই থাকার পরেও যদি কারও ওজন কমতে থাকে তবে সেটা হতে পারে ওভারঅ্যাকটিভ থাইরয়েডের জন্য যা মেটাবলিজম বৃদ্ধি করে। এ সময় দেখা যায় ব্যক্তির ক্ষুধা বাড়ে এবং তারা অনেক খায়। কিন্তু সে তুলনায় ওজন না বেড়ে বরং কমে যাচ্ছে।

মস্তিষ্ক ঠিকভাবে কাজ না করা
আন্ডারঅ্যাকটিভ থাইরয়েডের কারণে ব্রেইন ফগ বা অস্পষ্ট মস্তিষ্ক হতে পারে। এতে করে মস্তিষ্ক ঠিকভাবে কাজ করে না। অনেকের এই সমস্যাটা হয়।  আবার কারও কারও সাবটেল মেমোরি লস বা অল্প স্মৃতিভ্রংশ হয়। এতে তারা মানসিক ক্লান্তি অনুভব করেন। এটা হতে পারে ওভারঅ্যাকটিভ থাইরয়েডের কারণে। এতে কোনো কিছুতে মনোযোগ ধরে রাখাটা মুশকিল হয়ে পড়ে।

মলত্যাগে পরিবর্তন
ঘন ঘন কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে যদি কারও আন্ডারঅ্যাকটিভ থাইরয়েড থাকে। থাইরয়েড হরমোন খাবার হজমে সহায়তা করে। কিন্তু যদি যথেষ্ট পরিমাণে থাইরয়েড হরমোন উৎপাদন না হয় তাহলে মল ত্যাগ বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে।
এতে কোষ্ঠকাঠিন্য হয়। আবার ওভারঅ্যাকটিভ থাইরয়েড থাকলে মল ত্যাগ নিয়মিত হয় কিন্তু সেটা হয় বারবার।

হার্ট পালপিটেশন
অতিরিক্ত থাইরয়েড হরমোন শরীরের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। চা কফি পান করার পর বা ক্যাফেইন গ্রহণ করার পর যেমন অনুভূত হয় হঠাৎ করেই তেমন অনুভব করতে পারে কেউ। আবার বিশ্রামে থাকলেও বুধ ধড়ফড়ানি বা হার্ট পালপিটিশন হতে পারে কোনো কারণ ছাড়া।

পিরিয়ডের পরিবর্তন
খুব কাছাকাছি সময় যদি দুই বা ততোধিকবার পিরিয়ড হয় তবে বুঝতে হবে থাইরয়েড হরমোন যথেষ্ট পরিমাণে উৎপাদন হচ্ছে না। এ সময় পিরিয়ড দীর্ঘদিন থাকে ও পরিমাণে অনেক বেশি হয়।
আবার থাইরয়েড হরমোন বেশি পরিমাণে উৎপাদন হলে অনেকদিন পর পর পিরিয়ড হয়। পিরিয়ডের পরিমাণও থাকে অনেক কম।