স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে বের হয়ে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পথে বাংলাদেশের সামনে রোহিঙ্গা সংকটসহ চারটি বড় প্রতিবন্ধকতা রয়েছে বলে মনে করছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সামনে উপস্থাপিত একটি সার-সংক্ষেপ প্রতিবেদনে এই মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট ও পুনর্বাসনে ব্যয় নির্বাহ ছাড়াও সহজ শর্তের ঋণসুবিধা সীমিত হওয়া, অনুদান হ্রাস পাওয়া ও ঋণের সুদহার বৃদ্ধি পাওয়াকে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
সার-সংক্ষেপে ইআরডি বলেছে, রোহিঙ্গা সংকটের কারণে অভ্যন্তরীণ নানা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে দেশ। রোহিঙ্গাদের খাওয়া-দাওয়া, স্বাস্থ্য-চিকিৎসা ও বাসস্থানÑ সব মিলে বাংলাদেশকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হবে। এটা জিডিপির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। জাতিসংঘের উদ্ধৃতি টেনে বলা হয়, এর মধ্যে দুই বছরে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
২০১৭ সালের আগস্টে প্রতিবেশী মিয়ানমারে সেনা নিপীড়নের মুখে রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচিত দেশটির লাখ লাখ নাগরিক বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়। আগে থেকে প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গাসহ সব মিলে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা এ দেশে রয়েছে। তাদের কক্সবাজারের কয়েকটি কেন্দ্রে আশ্রয় দিয়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তায় জরুরি মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছে বাংলাদেশ সরকার।
আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে গত বছর শেষদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করলেও নানা কারণে প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত গত বছর প্রত্যাবাসন শুরুর কথা থাকলেও মিয়ানমারের অসহযোগিতার কারণে তা সফল হয়নি। এ অবস্থায় এসব নাগরিকের ভরণ-পোষণে বাংলাদেশকেই উদ্যোগী হতে হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুধু ভরণ-পোষণ, খাদ্য, স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন বাবদ রোহিঙ্গাদের জন্য বছরে ৯০ থেকে ১০০ কোটি ডলারের প্রয়োজন হবে। প্রতিবছর এই বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করা বাংলাদেশের জন্য খুবই কঠিন। এমনিতেই আমাদের ডেনসিটি অনেক বেশি, কর-জিডিপি হার কম। এই অবস্থায় তাদের বসিয়ে বসিয়ে ভরণ-পোষণ করা মানেই বাড়তি বোঝা।’
গত বছর বাংলাদেশ এলডিসি দেশের তালিকা থেকে বের হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। ২০২১ সালে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার স্বীকৃতি পাবে। তিন বছর অর্থনৈতিকভাবে যোগ্যতা অর্জনে শর্ত ধরে রাখতে পারলে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ চূড়ান্ত স্বীকৃতি পাবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা বিভাগের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. শাসসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হবে খুব ভালোভাবেই। আর্থিকভাবে সমসাময়িক অনেক দেশের চেয়ে অবস্থা অনেক ভালো। তারপরও আমরা ২০২৭ সাল নাগাদ এলডিসির প্রায় সব সুবিধাই পাব। ততদিনে আমরা নিজেদের প্রস্তুত করতে পারব। খুব বেশি সমস্যা হবে না।’
ইআরডির সার-সংক্ষেপে বলা হয়েছে, এলডিসি থেকে বের হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করায় বাংলাদেশ এর মধ্যেই কিছুটা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে। এর মধ্যে উন্নয়ন সহযোগীরা ঋণের শর্ত কঠিন করেছে, যার মধ্যে বিশ্বব্যাংকও রয়েছে। আন্তর্জাতিক এই ঋণদাতা সংস্থার ঋণ এখন পাঁচ বছরের রেয়াতকালসহ ৩০ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে, যা আগে ১০ থেকে ছয় বছরের রেয়াতসহ ৩৮ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে পরিশোধ করা যেত। বিশ্বব্যাংক ঋণের সুদের হারও বাড়িয়েছে। এখন উত্তোলিত অর্থের ওপর শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে সার্ভিস চার্জ ও ১ দশমিক ২৫ শতাংশ হারে সুদসহ মোট দুই শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে, যেখানে আগে শুধু শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জ দিতে হতো।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) একই পথে হেঁটেছে। ম্যানিলাভিত্তিক সংস্থাটির ঋণের জন্য শূন্য দশমিক ১০ হারে ম্যাচুরিটি প্রিমিয়াম ও অব্যয়িত অর্থের ওপর শূন্য দশমিক ১৫ হারে কমিটমেন্ট চার্জ প্রযোজ্য হয়। এই ঋণ পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ২৫ বছরে পরিশোধ করতে হবে। এলডিসি থেকে বের হয়ে গেলে লন্ডন ইন্টার অফার রেট (লাইবর) অনুযায়ী ২ শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে।
জাপানভিত্তিক সংস্থা জাইকা থেকে ঋণের জন্য এতদিন বার্ষিক সুদের হার ছিল মাত্র দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। এলডিসি থেকে বের হলে নতুন শর্তে দিতে হবে দশমিক ৯৫ শতাংশ সুদ। আগে ঋণ শোধ করা হচ্ছিল ৪০ বছরে। এখন সেটা ১০ বছর কমে হবে ৩০ বছর।
ইআরডির তথ্য অনুসারে, নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হলে বেশ কিছু সুবিধাও পাওয়া যাবেÑ আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে নতুন নতুন উন্নয়ন সহযোগী পাওয়া যাবে, জলবায়ু তহবিল-জিসিএফে বাংলাদেশের অংশ বাড়বে এবং দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের জাহিদ বলেন, ‘এলডিসি থেকে বের হলে সুদের হার বৃদ্ধিসহ বৈদেশিক বাণিজ্যে কিছুটা ব্যয় বাড়বে। কিন্তু ঋণের কিছু সুযোগও সৃষ্টি হবে। এখন বিশ্বব্যাংকের সহযোগী সংস্থা আইডা থেকে ঋণ নেওয়া সীমাবদ্ধ থাকতে হয়। তখন আর সীমা থাকবে না। অপর সংস্থা আইবিআরডি থেকেও অনেক বেশি ঋণ নেওয়া সম্ভব হবে।’
ইআরডির সার-সংক্ষেপে বলা হয়, বৈদেশিক সহায়তানির্ভর প্রকল্পগুলো থেকে রিটার্ন পেতে হলে কিছু দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে হবে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের গতি বাড়াতে হবে। উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে দরকষাকষির দক্ষতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে, উন্নয়নকাজে স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।