পেঁয়াজের দাম কমায় দুশ্চিন্তায় আমদানিকারকরা

ভারতে বেশি উৎপাদন এবং দাম বেশি কমে যাওয়ায় বাংলাদেশে পেঁয়াজের দাম এক সপ্তাহে কেজিপ্রতি পাঁচ টাকা কমেছে। এতে বেশি বিপাকে পড়েছেন পেঁয়াজ আমদানিকারকরা। পাশাপাশি ভারতীয় পেঁয়াজের ছড়াছড়িতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিগত কয়েক বছরের মধ্যে পেঁয়াজের দাম এখনকার মতো এমনভাবে কমেনি। যেখানে গত বছরের একই সময়ে আমদানীকৃত পেঁয়াজ ৩২ টাকা থেকে ৩৪ টাকা কেজিদরে বিক্রি হয়েছিল। এই অবস্থায় আমদানির ওপর ভ্যাট বসালে বাজারও স্থিতিশীল থাকবে, কৃষকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।

দেশ রূপান্তরের দিনাজপুরের হাকিমপুর প্রতিনিধি জানান, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দেশীয় জাতের পেঁয়াজ ওঠার ফলে দেশের বাজারে দেশীয় জাতের পেঁয়াজের ব্যাপক সরবরাহ রয়েছে। এ ছাড়া দাম কিছুটা কম হওয়ার ফলে দেশের বাজারে আমদানীকৃত ভারতীয় পেঁয়াজের চাহিদা একেবারেই কমেছে। কিন্তু বন্দর দিয়ে পেঁয়াজ আমদানি অব্যাহত থাকায় চাহিদার তুলনায় পেঁয়াজের সরবরাহ অনেক বেড়ে গেছে। ফলে মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে হিলি স্থলবন্দরে পাইকারিতে পেঁয়াজের দাম কমেছে কেজিপ্রতি পাঁচ টাকা। বর্তমানে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৬-৮ টাকা কেজিদরে বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগে ৮ টাকা থেকে ১৩ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছিল।

মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজি মো. গোলাম মওলা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পেঁয়াজের দাম কমে গেছে। গত সপ্তাহে যে পেঁয়াজের কেজি ছিল ১৬-১৭ টাকা, এ সপ্তাহে সেই পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৪-১৫ টাকা। বাজারভেদে দাম আরও কম হতে পারে।

দাম কমার কারণ জানতে চাইলে এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, প্রথম কারণ হলো এখন ভারত ও বাংলাদেশে প্রচুর পেঁয়াজ উৎপাদন হচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী বাজারে পেঁয়াজ পর্যাপ্ত। তাই দাম কম। কিন্তু কৃষকরা এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কারণ আগামী ফেব্রুয়ারিতে যে পেঁয়াজ উঠবে, তখন তাদের কম দামে সে পেঁয়াজ বিক্রি করতে হবে। তাতে বড় ক্ষতি হবে কৃষকের।

রাজধানীর শ্যামবাজারের পেঁয়াজ আমদানিকারক আবুল মাজেদ জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার পাইকারি বাজারে ৭-১২ টাকা কেজিদরে বিক্রি করা হয়েছে ইন্ডিয়ান পেঁয়াজ। দেশি ভালো পেঁয়াজ সর্বোচ্চ ১৫ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে।

হাতিরপুল খুচরা বাজারের পেঁয়াজ বিক্রেতা শাহেদ আলম বলেন,‘ গত সপ্তাহে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি করেছি ৩২-৩৫ টাকা। এখন বিক্রি করছি ৩০ টাকা কেজিদরে। ইন্ডিয়ান পেঁয়াজের দামও ২-৩ টাকা কমেছে কেজিতে। বর্তমানে ইন্ডিয়ান পেঁয়াজ ২৭ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি করছি।’

দেশ রূপান্তরের দিনাজপুর প্রতিনিধি সরেজমিন হিলি স্থলবন্দর ঘুরে জানিয়েছেন, বন্দর দিয়ে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি অব্যাহত রয়েছে। এক সপ্তাহ ধরে বন্দর দিয়ে একই হারে ৩৫-৪০ ট্রাক করে পেঁয়াজ আমদানি হচ্ছে। বর্তমানে বন্দর দিয়ে ভারত থেকে নাসিক, ইন্দোর, গোলাপবাগ জাতের পেঁয়াজ আমদানি হচ্ছে। বন্দরের ভেতরে আমদানীকৃত ইন্দোর জাতের পেঁয়াজ পাইকারিতে (ট্রাকসেল) বিক্রি হচ্ছে ৬ টাকা কেজিদরে। একই জাতের কিছু কিছু পেঁয়াজ ৪-৫ টাকা কেজিদরে বিক্রি হয়েছে। আর নাসিক জাতের পেঁয়াজ ৮ টাকা কেজিদরে বিক্রি হচ্ছে। পাঁচদিন আগে এসব জাতের পেঁয়াজ ৮-১৩ টাকা কেজিদরে বিক্রি হয়েছিল।

এদিকে বাংলাহিলি বাজার ঘুরে প্রতিনিধি আরও জানিয়েছেন, আমদানীকৃত পেঁয়াজের দাম কমার প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারেও। আমদানীকৃত প্রতি কেজি ভারতীয় পেঁয়াজ খুচরা ১০-১২ টাকা বিক্রি হচ্ছে। কয়েক দিন আগে এসব পেঁয়াজ ৫-৬ টাকা বাড়তি দামে বিক্রি হয়েছিল। এদিকে বাজারে দেশীয় জাতের পেঁয়াজ কিছুটা কমে ১৬ টাকা থেকে ২০ টাকা কেজিদরে বিক্রি হচ্ছে।

হিলি স্থলবন্দরের পেঁয়াজ আমদানিকারক বাবলুর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন জাতের পেঁয়াজ উঠতে শুরু করার ফলে ভারতের বাজারে পেঁয়াজের ব্যাপক সরবরাহ রয়েছে যার ফলে দামও কিছুটা কম রয়েছে। কিন্তু এর পরেও ভারত থেকে দেশে পেঁয়াজ আমদানি করে আমাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। এর কারণ হলো আমাদের ভারতে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৩ টাকা কেজিদরে কিনতে হচ্ছে। তার সঙ্গে গাড়ি ভাড়া রয়েছে ৬ থেকে সাড়ে ৬ টাকা। এ হিসেবে দেশের বাজারে কেজিপ্রতি ১২-১৩ টাকা হলে আমাদের পোষায়। কিন্তু আমাদের বিক্রি করতে হচ্ছে ৬-৮ টাকা কেজিদরে। এ কারণে আমরা আমদানিকারকরা পেঁয়াজ আমদানি করে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছি। আমরা নতুন করে পেঁয়াজ আমদানির জন্য এলসি খোলা আপাতত বন্ধ রাখছি। দেশের বিভিন্ন স্থানে মুড়িকাটাসহ বিভিন্ন জাতের দেশীয় পেঁয়াজের আমদানি রয়েছে। কয়েকদিনের ভেতরে মেহেরপুর অঞ্চলের পেঁয়াজ উঠতে শুরু করবে। এর ফলে আমাদের দেশেই পর্যাপ্ত পরিমাণে পেঁয়াজের সরবরাহ রয়েছে। আগামী দুই থেকে তিন মাস পেঁয়াজের দাম বাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।’

এই আমদানিকারক আরও বলেন, ‘ভারত সরকার পেঁয়াজ রপ্তানিতে রপ্তানিকারকদের ১০ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়ার কারণে আমরা যদি ভারত থেকে ১ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি করি, তাহলে পেঁয়াজের দাম এপারে যা পাচ্ছে তার সাথে সরকারের পক্ষ থেকে ১০ লাখ টাকা পাবে ভর্তুকি বাবদ। পেঁয়াজ রপ্তানি করে তারা লাভবান হচ্ছে, কিন্তু আমরা পেঁয়াজ আমদানি করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।’

আমাদের ফরিদপুর প্রতিনিধি জানান, ফরিদপুরের কানাইপুর বাজারের ইজারাদার সেলিম মাদবর বলেন, গত মঙ্গলবার হাটের দিনে কৃষকের কাছ থেকে ৮০০ টাকা মণ দরে পেঁয়াজ কেনা হয়, যা আগের সপ্তাহে ছিল ৯০০-১০০০ টাকাদরে। কাজিরদির রূপিয়ার এলাকার চাষি মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, তারা মানভেদে ৮০০-১০০০ টাকায় বিক্রি করছেন। আরও ২০০ টাকা বেশি হলে তাদের লাভ হতো।

গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজের আড়তের মালিকরা অনেকটা আক্ষেপের সুরে বলেছেন, পেঁয়াজের কেজি ৭ টাকা, মানভেদে সর্বোচ্চ ১২ টাকা। এমন হলে পেঁয়াজের বস্তা এবং পরিবহনের খরচ উঠবে না বলে জানান খাজা ইরা ট্রেডার্সের মালিক মো. ফারুক। তিনি জানান, ভারতীয় নাসিক পেঁয়াজে বাজার সয়লাবের কারণে দাম কম। এই পেঁয়াজ কয়দিন পর ডাস্টবিনে ফেলবে বলে জানান আমদানিকারক ফয়েজ। কারণ কিছুদিন পর দেশি পেঁয়াজ বাজারে এলে তখন এই পেঁয়াজ কেউ কিনবে না বলে জানান তিনি।