কিশোরগঞ্জের ভৈরবের পুরাতন ফেরিঘাট এলাকা থেকে শুরু করে শহীদ হাবিলদার আব্দুল হালিম রেলওয়ে সেতুর নিচ পর্যন্ত এলাকাজুড়ে অনুমোদন ছাড়া ও পরিবেশের ক্ষতিকারক কয়লার ব্যবসা চলছে। এই এলাকায় হাজার হাজার টন কয়লা পাহাড়সম স্তূপাকারে জমিয়ে রাখার কারণে অপ্রাতিষ্ঠানিক এই পর্যটন এলাকায় পরিবেশের বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কয়লার তেজষ্ক্রিয়তার কারণে এরই মধ্যে এখানকার শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সড়ক সেতু রক্ষায় নদীর তীর ঘেঁষে রোপণ করা শত শত গাছ মরে গেছে; ছায়াবীথি অঞ্চলটি পরিণত হয়েছে বিরানভূমিতে। কয়লার ধূলিকণা বাতাসে মিশে মানুষের নিঃশ্বাসের সঙ্গে ভেতরে ঢুকে শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে আক্রান্ত করছে।
স্থানীয়রা জানান, আশপাশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার ভ্রমণপিপাসু মানুষের আসা-যাওয়ার কারণে ভৈরবের মেঘনা নদীর ওপর নির্মিত দুটি রেলসেতু ও একটি সড়ক সেতুর নিচের এলাকাটি অলিখিত বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন উৎসব-পার্বণে পরিবার-পরিজন নিয়ে মনোরঞ্জনের জন্য মানুষ এখানে আসে। কিন্তু চার-পাঁচ বছর ধরে একটি প্রভাবশালী মহল নদীপথে ইন্দোনেশিয়া, সাউথ আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশ থেকে কয়লা এনে এখানে স্তূপ করে রাখছেন। এখান থেকে ট্রাকে করে সড়কপথে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করছেন।
ভৈরব এবিসি স্কুলের অধ্যক্ষ কামাল পাশা দেশ রূপান্তরকে বলেন, একই এলাকায় পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তেল কোম্পানির ডিপো রয়েছে। প্রতিদিন এখান থেকে আটটিরও বেশি জেলায় ট্যাংকলরির মাধ্যমে তেল সরবরাহ করা হয়। কয়লা, তেল ও গ্যাস- তিনটিই দাহ্য পদার্থ। কয়লার স্তূপে রোদের তাপে প্রায়ই আগুন ধরে যায়। তখন ধোঁয়ায় এলাকাটিতে ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। এই আগুন যদি কখনো তেল বা গ্যাসের সংস্পর্শ পায়, তখন আশপাশের কয়েক মাইল এলাকা পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।
গতকাল শুক্রবার প্রাতঃভ্রমণে আসা ভৈরব প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক শামসুজ্জামান বাচ্চু ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মো. নজরুল ইসলাম রিপন দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কয়লাভর্তি শত শত ট্রাকের যাতায়াতে পুরো এলাকা হয়ে ওঠে ধূলিময়। হাজার হাজার শ্রমিকের হৈ-হুল্লোড়ে শান্ত-নীরব এলাকাটি পরিণত হয়েছে কোলাহলপূর্ণ ও দূষিত এলাকায়। নির্মল সতেজ নিঃশ্বাস নিতে এসে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।
এখানে অবস্থিত বাংলাদেশ রেলওয়ে উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত দুই সহস্রাধিক শিক্ষার্থীও মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছেন বলে প্রধান শিক্ষক এম এ আব্দুল মান্নানের আশঙ্কা। তিনি বলেন, কয়লার কারণে শিক্ষার্থীরা প্রায়ই সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এখানকার রেলওয়ে কলোনির বাসিন্দারাও শ্বাসকষ্টজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে দ্রুত যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।
এ বিষয়ে ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. কে এন এম জাহাঙ্গীর বলেন, কয়লার ধুলাবালু ও কার্বন শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে ভেতরে গিয়ে ফুসফুসে জমা হয়ে স্থায়ী শ্বাসকষ্টসহ ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আছে।
ইউসুফ বাবু মডেল টাউনের প্রকল্প ব্যবস্থাপক বশির আহমেদ বিপ্লব দেশ রূপান্তরকে বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এলাকাটিতে বিনোদনকেন্দ্র বানাতে সরকারের কাছে প্রস্তাবনা দেওয়া হলেও ‘কেপিআই’ এলাকা হওয়ার কারণে তা ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ কয়লার মতো একটি দাহ্য পদার্থ রেখে দিনের পর দিন ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে একটি মহল।
ভৈরবের মেঘনাপাড়ে রেলওয়ের দুটি ও সড়কপথের একটিসহ মোট তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু থাকায় সরকার এই এলাকাকে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা (কেপিআই) ঘোষণা করেছে।
এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অনুমোদন ও পরিবেশের ছাড়পত্র ছাড়া কয়লা মজুদ করে ব্যবসার বিষয়ে জানতে চাইলে ভৈরব কয়লা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মজনু সওদাগর হাসান বলেন, কয়লা রাখার মতো বিকল্প স্থান না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে এখানে কয়লা রাখছেন। প্রশাসনসহ স্থানীয় এমপিকে সমস্যাটি জানানো হয়েছে। ফেরিঘাটের জেটি থেকে কালিপুর নদীর তীর পর্যন্ত একটি রাস্তা নির্মাণ করে দিলে তারা কয়লার আড়তটি নিয়ে যেতে পারবেন। তখন এই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
ভৈরব পৌরসভার স্বাস্থ্য পরিদর্শক নাসিমা বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, তার কার্যালয়ে থেকে কয়লা ব্যবসায়ীরা পরিবেশের কোনো সনদপত্র না নিয়ে অবৈধভাবে কয়লার ব্যবসার করছেন। ওখানে কয়লা রাখায় পরিবেশের মারাত্মক অবনতি হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের ভৈরবের সহকারী প্রকৌশলী আহসান হাবিব বলেন, রেল কর্র্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া রেলওয়ের জায়গায় কয়লা রাখা সম্পূর্ণ অবৈধ। তিনি এখানে কয়লা রাখায় একবার বাধা দেওয়া হলেও তা সফল হয়নি।
ভৈরব উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত সাদমীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উন্মুক্ত জনসমাগমস্থলে কয়লা রাখাটা অবশ্যই পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। আমি নির্বাচনের আগে ভৈরবে যোগদান করেছি। বিষয়টি জনগুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় খোঁজ-খবর নিয়ে শিগগিরই ব্যবস্থা নেব।’