মানের এনওসি না থাকার অভিযোগ ভারতীয় কোম্পানির লাল ক্যাপসুলেই সমস্যা

বাতিল হওয়া ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনের দুই ধরনের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের মধ্যে লাল রঙের ক্যাপসুলের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই ক্যাপসুলটি সরবরাহ করেছে ভারতের সেপটিসিউল ওষুধ কোম্পানি। প্রায় তিন বছর আগের উৎপাদিত ও মজুদ করে রাখা ক্যাপসুলের শেষ চালানটি এবার সরবরাহ করা হয়েছিল ক্যাম্পেইনের জন্য। এর মেয়াদ আগামী জুন পর্যন্ত। কেনার ব্যাপারে এই ক্যাপসুলগুলোর কোনো এনওসি (নন অবজেকশন সার্টিফিকেট) ছিল না বলেও অভিযোগ রয়েছে। এই কোম্পানির বাংলাদেশের এজেন্ট অ্যাজটেক ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানির উৎপাদিত ওষুধের   মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এর আগে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা অনুসরণ করে উৎপাদনে ব্যর্থ দেশের যে ২৮টি ওষুধ কোম্পানির অ্যান্টিবায়োটিক (পেনিসিলিন ও সেফালোস্পোরিন) স্টেরয়েড ও ক্যানসার প্রতিরোধক ওষুধের উৎপাদন ও বিপণন বন্ধের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট, তাদের মধ্যে অ্যাজটেক একটি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল পরিচালনা প্রতিষ্ঠান জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

গত শুক্রবার স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসানও ওষুধগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কিশোরগঞ্জ সার্কিট হাউসে ‘ভিটামিন এ প্লাস ক্যাপসুলের’ নমুনা পর্যবেক্ষণের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, মামলা করে ভারতীয় একটি অখ্যাত কোম্পানির কাছ থেকে নিম্নমানের ক্যাপসুল কিনতে বাধ্য করা হয়েছে। ভারতীয় ওই কোম্পানির কোনো সুনাম নেই। সরবরাহ করা এসব ক্যাপসুল কৌটার সঙ্গে লেগে আছে। আলাদা করা যাচ্ছে না। কেন এ রকম হলো পরীক্ষার পর তা বলা যাবে। নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে দেশের কোম্পানি থেকে কেনা নীল রঙের ট্যাবলেটে কোনো সমস্যা নেই বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।

তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ক্যাপসুলগুলো পরীক্ষার পরই বলা যাবে মান ছিল কি না। অভিযোগ আসায় ক্যাম্পেইন স্থগিত করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্তের জন্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর সব জানা যাবে। ওষুধে কোনো ত্রুটি থাকলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীও এ ব্যাপারে অবগত রয়েছেন বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগামীকাল (আজ) রবিবার বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে বৈঠক হবে। সেই বৈঠকে ক্যাম্পেইনের পরবর্তী সময় নির্ধারণ করা হবে। মন্ত্রণালয় চাইলে আগামী ২৬ জানুয়ারি এ ক্যাম্পেইন পরিচালনার জন্য অধিদপ্তর প্রস্তুত এবং পর্যাপ্ত ওষুধ মজুদ রয়েছে বলেও জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক।

মহাপরিচালক বলেন, মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর কর্মসূচি স্থগিত করে বৃহস্পতিবারই পৃথক দুটি কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর। আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ আসার পরও ওষুধগুলোর চালান ছেড়ে দেওয়ার জন্য কর্মকর্তাদের ওপর চাপ ছিল- উল্লেখ করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বুধবার অভিযোগ আসার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও এই প্রতিষ্ঠানের এক শ্রেণির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা চেয়েছিলেন চালান ছেড়ে দিতে। অর্থাৎ তাদের ইচ্ছে ছিল এই ক্যাপসুলেই ক্যাম্পেইন করা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী কোনো ঝুঁকি নিতে চাননি বলেও ওই কর্মকর্তা জানান।

প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, মানের এনওসি ছিল না কি না, তা তাদের জানা নেই। নতুন করে পরীক্ষাও করা হয়নি। তবে এটা ঠিক ভারতীয় কোম্পানিটি নিয়ম মানেনি। সাধারণত ক্যাম্পেইনে খাওয়ানো ক্যাপসুলগুলোর মোট মেয়াদের এক-তৃতীয়াংশ সময়, অর্থাৎ সর্বশেষ এক বছর মেয়াদ থাকতে হয়। কিন্তু লাল ক্যাপসুলগুলোর মেয়াদ ছিল মাত্র ছয় মাস। এমন হতে পারে মজুদ করা ক্যাপসুলগুলো ঠিকমতো সংরক্ষণ করা হয়নি। তাপমাত্রা বেশি ছিল। সে কারণে ক্যাপসুলের খোসাগুলো গলে গেছে।

এই কর্মকর্তারা আরও জানান, ক্যাম্পেইনের নীল ক্যাপসুলগুলো ভালো ছিল। সেগুলো দেশি প্রতিষ্ঠান গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালের সরবরাহ করা। সেগুলোর ২০২১ সাল পর্যন্ত মেয়াদ রয়েছে। এমনকি আগামীতে যে ক্যাপসুলগুলো খাওয়ানোর জন্য মজুদ রাখা হয়েছে, সেগুলো সরবরাহ করেছে দেশি রেনেটা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি। সেগুলোর মেয়াদও ২০২১ সালের ১ মার্চ পর্যন্ত।

জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ক্যাপসুল কেনার কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালে। প্রথমে একটি দেশি ওষুধ কোম্পানি সরবরাহের কার্যাদেশ পেয়েছিল। কিন্তু ওই কার্যাদেশের বিরুদ্ধে আদালতে যায় অ্যাজটেক নামে ভারতীয় একটি কোম্পানি। ওই ভারতীয় কোম্পানিকে সরবরাহের কাজ দেওয়ার নির্দেশ দেয় আদালত। এরপর থেকে লাল রঙের ‘এ’ ক্যাপসুল সরবরাহ করে আসছে কোম্পানিটি।

কর্মকর্তারা আরও জানান, ভিটামিন এ ক্যাপসুলগুলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অর্থায়নে ক্রয় করা হয় ২০১৬ সালে। তাদের শর্ত অনুযায়ী আন্তর্জাতিকভাবে ওষুধ ক্রয়ের দরপত্র আহ্বান করা হয়। সেখানে ভারতীয় একটি অপরিচিত প্রতিষ্ঠান সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে কার্যাদেশ পায়। পুরো বিষয়টির সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি প্রভাবশালী চক্র সম্পৃক্ত ছিল। ভারতীয় এই কোম্পানির ওষুধের মান নিয়ে সে সময় দেশের কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানের কোম্পানি আপত্তি জানায়। কিন্তু সেই আপত্তি আমলে নেওয়া হয়নি। এমনকি ক্যাপসুলগুলোর ব্যাপারে এনওসি পাওয়া যায়নি বলেও অভিযোগ ছিল।