ভিটামিন ‘এ’-র ঘাটতি পূরণ করতে বিটা ক্যারোটিন-সমৃদ্ধ নতুন জাতের ধান নিয়ে আসছেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা। ব্রি-২৯ ধানের মধ্যে বিটা ক্যারোটিন-সমৃদ্ধ করে নতুন জাতের এই ধান মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষা শেষ করে ন্যাশনাল বায়োসেইফটি কমিটির অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। কমিটির অনুমোদন পেলে নতুন জাতের এ ধান চাষাবাদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিটা ক্যারোটিন-সমৃদ্ধ ধানের চালের রং হবে হলুদ, ভাতের রংও হবে হলুদ। ভাতের মাধ্যমে বিটা ক্যারোটিন শরীরে প্রবেশ করে ভিটামিন ‘এ’তে রূপান্তরিত হবে। ফলে এই জাতের ধানের ভাত খেলে মানবদেহে ভিটামিন ‘এ’-র অভাব দূর হবে। বিটা ক্যারোটিন স্বাদহীন, গন্ধহীন হওয়ায় এ চালের ভাত খেতে সাধারণ ব্রি-২৯ চালের ভাতের মতোই লাগবে। নতুন জাতের ধানের উৎপাদনও ব্রি-২৯ ধানের সমানই হবে, গাছের আকার কিংবা রঙে কোনো হেরফের হবে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ের প্রতি পাঁচ শিশুর মধ্যে একজন ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতিতে আক্রান্ত। আর গর্ভবতী নারীদের মধ্যে ২৩ দশমিক ৭ শতাংশের এ সমস্যা রয়েছে। শিশুদের দেহে ভিটামিন এ-এর অভাব মেটাতে সরকার প্রতিবছর সারা দেশে বিনা মূল্যে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর কর্মসূচি নিয়েছে।
নতুন ধানের জাত নিয়ে কাচঘেরা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে প্রথম চাষাবাদের পর দুই বছর ‘আবদ্ধভাবে’ মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষামূলক চাষের পর ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। ব্রি-র গবেষকরা চূড়ান্ত পর্যায়ে একাধিক জায়গায় চাষ করেছেন। খোলা মাঠে চাষাবাদের জন্য ন্যাশনাল বায়োসেইফটি কমিটির অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) পরিচালক (প্রশাসন ও সাধারণ পরিচর্যা) ড. মো. আনছার আলী গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, নতুন উদ্ভাবিত বিটা ক্যারোটিন-সমৃদ্ধ ধানের মাঠ পর্যায়ের সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হয়েছে। এখন ন্যাশনাল বায়োসেইফটি কমিটির অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। তাদের অনুমোদন পেলে এটি কৃষকের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
কৃষক পর্যায়ে পৌঁছাতে কত দিন লাগতে পারেÑ এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, গত এক বছর ধরে বায়োসেইফটি কমিটির বৈঠক হয়নি। ধারণা করা যায়, কমিটির অনুমোদন পেলে ২০১৯ সালের মধ্যে সম্ভব না হলেও পরের বছরের মধ্যে উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ব্রি-২৯ ধানের জিনগতভাবে পরিবর্তন করা বিটা ক্যারোটিন-সমৃদ্ধ সোনালি চালের একটি জাত গত বোরো মৌসুমে চাষ করে প্রতি গ্রামে ১০ থেকে ১২ মাইক্রোগ্রাম (এক গ্রাম সমান ১০ লাখ মাইক্রোগ্রাম) বিটা ক্যারোটিন পাওয়া গেছে। যা ভাত খাওয়া মানুষের প্রতিদিনকার ভিটামিন ‘এ’-র চাহিদার প্রায় অর্ধেক পূরণ করতে পারবে বলে গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন ব্রি-র সোনালি চাল প্রকল্পের পরিচালক ড. পার্থ এস বিশ্বাস।
তিনি বলেন, আমরা গবেষণায় দেখতে পেয়েছি যে, মানবদেহে প্রতিদিন যে পরিমাণ ভিটামিন ‘এ’ দরকার, শুধু এই চালের ভাত খাওয়ার মাধ্যমে তার ৩৫ থেকে ৪৫ শতাংশই পূরণ করা সম্ভব। নিরাপদ খাদ্য ও নিরাপদ পরিবেশের যেসব প্যারামিটার (মাপকাঠি) রয়েছে, নতুন জাতের ধান তার সব কটি পরীক্ষাতেই উত্তীর্ণ হয়েছে। আমরা সেসব তথ্য কমিটির কাছে পাঠিয়েছি। কমিটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সরকারকে সুপারিশ করবে। তারপর সরকার সিদ্ধান্ত দিলে জাতটি উন্মুক্ত করা হবে।
বিটা ক্যারোটিন-সমৃদ্ধ নতুন জাতের এই ধান উদ্ভাবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন হার্ভেস্ট প্লাস বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ম্যানেজার ড. খায়রুল বাশার। গতকাল দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, নতুন উদ্ভাবিত এ ধান কৃষক পর্যায়ে পৌঁছাতে আরও প্রায় দুই বছর সময় লাগবে। ব্রি-২৯ ধানে বিটা ক্যারোটিন-সমৃদ্ধ করার কারণে এর ফলন কমবে না, গাছের আকৃতিতেও কোনো পরিবর্তন আসবে না।
আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ইরি) কনসালট্যান্ট ড. জীবনকৃষ্ণ বিশ্বাস ব্রি-তে মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালনের সময় নতুন জাতের এ ধান নিয়ে কাজ শুরু হয়। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের দেশের কোনো জাতের ধানে ভিটামিন ‘এ’ নেই। সবজিতে আছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক গরিব মানুষ রয়েছে, যারা ঠিকমতো সবজি খেতে পারে না, শুধু ভাত খায়। বিটা ক্যারোটিন-সমৃদ্ধ ব্রি-২৯ জাতের চালের ভাত খেলে তাদের উপকার হবে, বিশেষ করে শিশুদের দেহে ভিটামিন ‘এ’-র অভাব দূর হবে।
তিনি বলেন, ক্যারোটিনের কারণে চাল ও ভাতের রং হলুদ হবে। বিজ্ঞানীদের মতে, বিটা ক্যারোটিন-সমৃদ্ধ ধান জিএমও (জেনেটিক্যালি মডিফাইড অর্গানিজম) হলেও এটি মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর নয়। এ ধান চাষ হলে উৎপাদিত ধান থেকেই বীজ সংরক্ষণ করা যাবে।
১৯৯৯ সালে সুইজারল্যান্ড ও জার্মানির বিজ্ঞানীরা এ ধরনের ধানে নতুন জাত উদ্ভাবন করে। পরে তা ইরিকে দেন তারা। তখন থেকেই বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরাও কাজ শুরু করেন। ২০০২-০৩ সালে ব্রি-২৯-এ বিটা ক্যারোটিন সৃষ্টিকারী জিন প্রয়োগে সফল হওয়ার পরই গবেষণায় নতুন মাত্রা যোগ হয়। ভারত, ইন্দোনেশিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশ বিটা ক্যারোটিন-সমৃদ্ধ ধান উদ্ভাবনে কাজ করছে। অন্যদের তুলনায় বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ড. জীবনকৃষ্ণ।