শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে নতুন মন্ত্রী যোগদানের পরই প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সব অস্থিরতা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা খাতে গত কয়েক বছরের সবচেয়ে সমালোচিত বিষয় প্রশ্নপত্র ফাঁস ও কোচিং বাণিজ্য। আসন্ন এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস রোধে কেন্দ্রে কেন্দ্রে ম্যাগনেট অপটিক ও ফ্রিকোয়েন্সি ডিটেকটর ব্যবহারসহ নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিক্ষকদের ফাঁকিবাজি ঠেকাতে দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একই সময়ে একই পাঠ এবং শিক্ষকের সন্তানদের কিন্ডারগার্টেনে পড়ানো যাবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় বলছে, জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ বাস্তবায়নে কঠোরভাবে কাজ করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
গত ৭ জানুয়ারি শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি, উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন শপথ গ্রহণ করেন। এরপর থেকে তারা শিক্ষাব্যবস্থায় নানা সংস্কারের উদ্দেশ্যে দফায় দফায় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তিন মন্ত্রী যোগদানের পর থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে ১০ টিরও বেশি বৈঠক করেছেন বলে দুই মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন।
গত ৯ জানুয়ারি শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি ও উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী গত ১৩ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ে প্রথম অফিস করেন। দ্বিতীয় দিন এসেই তারা মন্ত্রণালয়ের সার্বিক কার্যক্রম সম্পর্কে বৈঠক করে অবহিত হন। ওই বৈঠকেই তারা আসন্ন এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় যেকোনো মূল্যে প্রশ্ন ফাঁস ঠেকানো, নতুন শিক্ষাবর্ষে চলমান ভর্তি কার্যক্রমে অতিরিক্ত ফি আদায় ও কোচিং বাণিজ্য বন্ধসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে কর্মকর্তাদের আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেন। দুই মন্ত্রীই পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস ও অসদুপায় রোধের ব্যাপারে আলোচনায় বেশি গুরুত্ব দেন বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা। তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রশ্ন ফাঁস রোধসহ পরীক্ষায় অসদুপায় প্রতিরোধে কেন্দ্রে কেন্দ্রে ম্যাগনেট অপটিক ও ফ্রিকোয়েন্সি ডিটেকটর ব্যবহার করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে কেন্দ্রপ্রধান ও নিয়োজিত ব্যক্তি এসব ডিভাইস ব্যবহার করবেন। এই প্রযুক্তি দিয়ে অসদুপায় অবলম্বনকারীদের শনাক্ত করা যাবে। এ ছাড়া প্রশ্ন ফাঁস ও গুজব রোধে পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট সোশ্যাল মিডিয়ায় নজরদারি বাড়িয়েছে বলেও জানান তারা।
সংশ্লিষ্টরা জানায়, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশ্ন ফাঁসকারী ও গুজব রটনাকারীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে সাইবার ইউনিট ও গোয়েন্দা পুলিশের সমন্বয়ে ১০টি ‘স্পিয়ার হিট টিম’ গঠন করা হয়েছে। আগামী ২ ফেব্রুয়ারি শুরু হচ্ছে এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষা। এই পরীক্ষা সামনে রেখেই এসব পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও পুলিশ।
এ সব বিষয়ে জানতে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনিকে কয়েকবার ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা গ্রহণে অনেক পরিকল্পনা করেছি। আশা করছি, এইসব পরিকল্পনায় আমরা সাকসেস হব।’ তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি তিনি।
শিক্ষা প্রশাসন কিংবা ব্যবস্থাপনায় কোনো পরিবর্তন আসবে কি না, এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে তিনি বলেন, ‘গত ১০ বছরে শিক্ষায় বড় সাফল্য রয়েছে। এই সাফল্য ধরে রাখার জন্য আমরা কাজ করছি।’
এদিকে গত বুধবার নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের নেতাকর্মীরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এসে তাদের সমস্যা ও দাবি তুলে ধরলে মন্ত্রী ও উপমন্ত্রী দ্রুত সেগুলো সমাধানের আশ্বাস দেন। এর আগে গত ১৫ জানুয়ারি শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকে কর্মকর্তাদের কাছে মন্ত্রণালয় ও শিক্ষার সার্বিক পরিস্থিত সম্পর্কে জানতে চান তারা। একই সঙ্গে শিক্ষা খাতের সমস্যা চিহ্নিত করে তা দ্রুত সমাধানসহ নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
একই দিন গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন ভিডিও কনফারেন্সে ঢাকার সাভার, ধামরাই, দোহার ও নবাবগঞ্জ উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের সঙ্গে সভা করেন। প্রতিমন্ত্রী ও সচিব আকরাম-আল-হোসেন সভায় উপস্থিত কর্মকর্তা, কনফারেন্সে অংশ নেওয়া শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তাদের জানান, এখন থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষকের সন্তান কিন্ডারগার্টেনে পড়তে পারবে না। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, সারা দেশের স্কুলে একই সময়ে একই পাঠ দেওয়া হবে। আর এই পরিকল্পনাটি ইতিমধ্যে সম্পন্ন করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন যোগদানের দিন গত ৮ জানুয়ারি সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রাথমিক শিক্ষা সেক্টরে দুর্নীতির ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ, শিক্ষার মান নিশ্চিত ও বেতন-বৈষম্য দূর করার উদ্যোগ নেবেন বলে জানান। জানতে চাইলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব আকরাম-আল-হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বেশ কিছু পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে প্রাক্-প্রাথমিকে ভর্তির বয়স পাঁচ থেকে কমিয়ে চার বছর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে শিক্ষার মানোন্নয়ন নিশ্চিত করতে যা যা করণীয় তার একটি প্ল্যান প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে অনুমোদন করিয়ে নেওয়ার বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছি।’