জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ গুরুতর অসুস্থ। রক্তে হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়া ও লিভারের সমস্যার কারণে তিনি উন্নত চিকিৎসার জন্য গতকাল আবারও সিঙ্গাপুর গেছেন। এর আগে গত ১০ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলেন এরশাদ। ১৬ দিন চিকিৎসা শেষে নির্বাচনের আগে ২৬ ডিসেম্বর দেশে ফিরে আসেন।
এবার এরশাদের সিঙ্গাপুরে যাওয়া নিয়ে দলের নেতারা বেশ উদ্বিগ্ন। অন্যবার যাওয়ার সময় দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে কিছু বললেও গতকাল তিনি কিছুই বলতে পারেননি। হুইল চেয়ারে করে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বারিধারার পার্ক রোডের বাসার নিচতলায় নামিয়ে আনা হয় তাকে। এ সময় এরশাদকে শুধু তাকিয়ে থাকতে দেখা গেছে। কারও সঙ্গে ইঙ্গিতেও কথাবার্তা বলতে দেখা যায়নি।
সিঙ্গাপুরে যাওয়ার আগে কাউকে কোনো বিশেষ নির্দেশনাও দিয়ে যাননি বলেও জানিয়েছেন দলের নেতারা। এ ব্যাপারে দলের মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্যারের সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। কোনো বিশেষ নির্দেশনাও দেননি তিনি। দল যেভাবে চলছে সেভাবেই চলবে। তিনি যে নির্দেশনা দিয়েছেন, সেভাবেই সাংগঠনিক কাজ হবে। বর্তমান চেয়ারম্যানের (জি এম কাদের) সঙ্গে আলোচনা করে প্রেসিডিয়াম সদস্যদের একটি বৈঠক করতে পারি। আমি নির্বাচনে যারা হেরে গেছেন, তাদের সঙ্গে বসব।
‘গুরুতর অসুস্থ’ এরশাদ আগামী ৩০ জানুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া একাদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে থাকছেন না বলে জানিয়েছেন এরশাদের ছোট ভাই ও দলের কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের। মশিউর রহমান রাঙ্গা দেশ রূপান্তরকে বলেন, তার বয়স হয়েছে। এই বয়সে আর কত সুস্থ থাকবেন। আগামী সংসদ অধিবেশনে তার উপস্থিত থাকার সম্ভাবনা নেই।
দলের নেতারা দেশ রূপান্তরকে জানান, নব্বই ছুঁইছুঁই এরশাদ নির্বাচনের আগে থেকেই বেশ অসুস্থ। সাংসদ হিসেবে শপথ নেওয়ার আগের দিন ৫ জানুয়ারি রাতে হঠাৎ তাকে অসুস্থ অবস্থায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ৬ জানুয়ারি সেখান থেকেই হুইল চেয়ারে বসে সংসদে প্রবেশ করেন। শপথ গ্রহণের সময় তিনি জি এম কাদেরের সহযোগিতায় হুইল চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে শপথ নেন।
শপথ নেওয়ার পর সংসদের বিরোধী দলের চেয়ারে বসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন এরশাদ। সেদিনই ছিল তার শেষ কথা বলা। এরপর গতকাল দেশত্যাগের আগে পর্যন্ত তাকে কোনো কথা বলতে শোনা যায়নি। শপথের পর আবার তিনি হাসপাতালে চলে যান। সিঙ্গাপুরে যাওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি হাসপাতালেই চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে ছিলেন।
দলের নেতারা এরশাদ ‘অসুস্থ’ বললেও ঠিক কতটা অসুস্থ তা প্রকাশ্যে বলতে নারাজ। এরশাদ কাউকে চিনতে পারছেন নাÑ এর সত্যতা জানতে চাইলে দলের ভাইস চেয়ারম্যান আলমগীর শিকদার লোটন দেশ রূপান্তরকে বলেন, তিনি খুব অসুস্থ। হুইল চেয়ারে করেই চলাফেরা করছেন। একা দাঁড়াতেও পারেন না। দোয়া করি তিনি সুস্থ হয়ে ফিরে আসুন।
দলের এক প্রেসিডিয়াম সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, শপথ নেওয়ার আগে থেকেই এরশাদ ভীষণ অসুস্থ। শপথ নেওয়ার আগের দিন থেকে গতকাল সিঙ্গাপুর যাওয়ার আগের রাত পর্যন্ত হাসপাতালেই ছিলেন। সেখানে থেকেই দলের কাজ করেছেন। বিভিন্ন কাগজপত্রে স্বাক্ষর করেছেন। এবারের মতো এতটা অসুস্থ তাকে আর কখনই দেখিনি। মাঝে মাঝেই খেই হারিয়ে ফেলেন। অনেক সময় নেতাকর্মীদের নাম মনে করতে পারেন না। কখনো কখনো খুব পরিচিত জনকেও চিনতে পারেন না।
শারীরিক অবস্থা আঁচ করতে পেরে এরশাদ নিজেই জি এম কাদেরকে তার অবর্তমানে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। দল নিজের আয়ত্তে রাখতে সংসদে তিনি নিজে বিরোধীদলীয় নেতা, ভাই জি এম কাদেরকে বিরোধীদলীয় উপনেতা এবং ঘনিষ্ঠজন মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গাকে বিরোধীদলীয় হুইপ করেছেন। এমনকি গত কয়েক দিনে তার কাছের তিনজনকে তিনি দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের এক শীর্ষ নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এরশাদের যে শারীরিক অবস্থা, তাতে এখন তাকে ছাড়াই দলের কথা ভাবতে হবে। তিনি সুস্থ হয়ে ঠিক কতটা হাল ধরতে পারবেন দলের, সে নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। তবে এরশাদের অনুপস্থিতিতে দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের কী হবেÑ তা এখনই বলা যাচ্ছে না।
এ ব্যাপারে এক ভাইস চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এরশাদ গত ১ জানুয়ারি এক চিঠিতে তার ‘অবর্তমানে’ জাপার চেয়ারম্যান পদে ভাই জি এম কাদেরের নাম ঘোষণা করেছিলেন। ‘অবর্তমান’ শব্দটি স্পষ্ট না হওয়ায় দলের ভেতরে এই নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়। পরে গত শুক্রবার আরেক চিঠিতে তার ‘অবর্তমানে’ বা চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিদেশে থাকাকালে জাপার কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানান। তবে বিষয়টি নিয়ে দলের মধ্যে অস্থিরতা রয়েছে। এরশাদের স্ত্রী দলের আরেক কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ ও তার সমর্থকরা এরশাদের এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছেন না। অসুস্থতার মধ্যেও এই নিয়ে এরশাদের সঙ্গে রওশন এরশাদের পারিবারিক দ্বন্দ্ব চলছিল।
এই ভাইস চেয়ারম্যান আরও বলেন, দলের নতুন নেতৃত্ব নিয়ে ভাবতে হবে। এ জন্য তারা আগামী সম্মেলনের অপেক্ষায় আছেন। তারা জি এম কাদেরের নেতৃত্ব মানতে রাজি, তবে গঠনতন্ত্রে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। চেয়ারম্যানের সর্বময় ক্ষমতা খর্ব করতে হবে। দলের মধ্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।