প্রথমে বিউগলে সুর, তারপর জাতীয় সংগীত, এরপর শপথ ও গোপনীয়তার শপথবাক্য পাঠ এবং শপথপত্রে স্বাক্ষর করে হ্যাটট্রিকসহ চতুর্থবার বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হলেন বঙ্গবন্ধুর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। বিশ্ব ইতিহাসে বিরল ঘটনা। এক জনমে একই ব্যক্তির চারবার সরকার প্রধান হওয়ার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে খুব বেশি নেই।
‘আমি .... সশ্রদ্ধ চিত্তে শপথ করিতেছি যে, আমি আইন অনুযায়ী সরকারের মন্ত্রী পদের কর্তব্য বিশ্বস্ততার সহিত পালন করিব। আমি বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করিব। আমি সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করিব। এবং আমি ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হইয়া সকলের প্রতি আইন অনুযায়ী যথাবিহিত আচরণ করিব।’ এই শপথবাক্য পাঠ করে আওয়ামী লীগের চতুর্থবার সরকারে ২৪ জন মন্ত্রী, ১৯ জন প্রতিমন্ত্রী ও ৩ জন উপমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এবারের মন্ত্রিসভায় আওয়ামী লীগের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতার জায়গা হয়নি, মন্ত্রিত্ব পায়নি শরিক দলগুলোও। এ নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। বিচার-বিশ্লেষণ চলছে সর্বত্র। আনন্দ-হতাশা দুই-ই আছে। যারা মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন তারা এবং তাদের সমর্থকরা উল্লসিত। যারা মন্ত্রিত্ব পাননি তারা এবং তাদের সমর্থকরা খানিকটা হতাশ, যা স্বাভাবিক। কেউ কেউ আশাবাদী, কারণ মন্ত্রিসভা এখনো পূর্ণাঙ্গ হয়নি। যারা মন্ত্রিত্ব পাননি তাদের কেউই নতুন মন্ত্রিসভা সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য বা কটূক্তি করেননি বরং সফলতা কামনা করেছেন, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড গতিশীল হবে বলে মন্তব্য করেছেন। এই মন্তব্যগুলোর মাধ্যমে জ্যেষ্ঠ নেতারা পরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি তাদের আনুগত্য পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তাদের এই আচরণ আওয়ামী রাজনীতিতে নিঃসন্দেহে শুভ প্রভাব ফেলবে।
বিগত এক দশকে জননেত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বে নানাবিধ সামাজিক সূচকসহ অর্থনৈতিক আকাশচুম্বী উন্নয়ন হয়েছে যার কারণে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশ, বিশ্বের ৪১তম অর্থনীতি, ২০৩২ সালে ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতি হবে। জননেত্রী শেখ হাসিনা এখন বিশ্ব নেতা ও মাদার অব হিউম্যানিটি। বিশ্বাঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদা বেড়েছে। কথিত তলাবিহীন ঝুড়ি এখন উন্নয়নের রোল মডেল। বাংলাদেশের মানুষ এই উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে লাভবান হয়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে, খানিকটা স্বস্তিতে আছে মানুষ। মঙ্গায় পীড়িত হচ্ছে না, অনাহারে থাকছে না। আরও অনেক দূর এগোতে হবে। আশায় বুক বাঁধছে মানুষ। গত দশ বছরের উন্নয়ন মানুষকে আশাবাদী করেছে। আশাবাদী হওয়ার কারণ জননেত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্ব। তাই তিনি বাংলাদেশের মানুষের অন্তরে জায়গা করে নিয়েছেন। জননেত্রী শেখ হাসিনার ওপর আস্থা রেখেই বাংলাদেশের জনগণ গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটকে একচ্ছত্র বিজয় অর্জনে সমর্থন জানায়। নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলে ঐক্যফ্রন্ট জনগণের সাড়া পায়নি। কারণ বিরামহীন উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে রাজি নয় মানুষ। বিদেশিদের কাছে নালিশ করেও সাড়া পাচ্ছে না ঐক্যফ্রন্ট। বিদেশিরাও বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখার পক্ষে।
উপরোক্ত শপথবাক্য পাঠ করেই গত দশকের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরাও দায়িত্ব নিয়েছিলেন। বাদপড়া জ্যেষ্ঠ নেতা ও মন্ত্রীবর্গের অনেকে এই শপথ ধারণ করে উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় কম-বেশি অবদান রেখেছেন। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে, বাদ পড়েছেন বলে তারা ব্যর্থ হয়েছেন তা ঠিক নয়। আগামীর বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য নতুনদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে তারা কঠোর নজরদারিতে থাকবেন। কিন্তু এ কথা সত্যি যে, কেউ কেউ এই শপথবাক্য ধারণ করেননি, মনেও রাখেননি। বরং উল্টোটাই করেছেন। চলন-বলন, আচার-আচরণ, কথা-বার্তা বদলে যায় কারও কারও। রাষ্ট্রীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দেন, জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হন। বেশ ক’জন মন্ত্রী ব্যাপক সমালোচনার মুখেও পড়েন, যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে। যারা নিজেদের কৃতকর্মের জন্য মন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন তাদের উচিত হবে তাদের অতীত কর্মকাণ্ডগুলো মূল্যায়ন করা। ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো সংশোধন করে দল, জনগণ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে আত্মনিয়োগ এবং সংশোধিত মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করা।
নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করায় বর্তমান সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশাও অনেক। মানুষের আশা ভঙ্গ হোকÑ জননেত্রী শেখ হাসিনা কিছুতেই তা চাইবেন না। তাছাড়া বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার দায়িত্ব তার ওপর বর্তেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুই অংকে উন্নীত করা, মাথাপিছু আয়বৃদ্ধি, সব মানুষের জন্য পুষ্টিসম্পন্ন খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, উন্নয়নের সুফল ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া, অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে আনা, দারিদ্র্য দূরীকরণ, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা দূরীকরণ, মানবসম্পদ সৃষ্টির লক্ষ্যে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি, শিক্ষা ও গবেষণার মান উন্নয়ন, ঘরে ঘরে তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা প্রদান, সামাজিক অরাজকতার অবসান, মাদক ও দুর্নীতি রোধ, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, গ্রামে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ সৃষ্টি করে গ্রাম থেকে শহরে মাইগ্রেশনের হার কমানো, কৃষিকে যুগোপযোগী করা, গ্রামে শহুরে সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি, সারা দেশে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রপ্তানি খাত ও বাজার সম্প্রসারণ করে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, শিল্প খাত সম্প্রসারণ, মেগা প্রজেক্টগুলো সফলভাবে সময়মতো সম্পন্নকরণ, সারা দেশে আধুনিক রেলসার্ভিস সৃষ্টি, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানসহ বহুবিধ কর্মকাণ্ড সফলতা ও গতিশীলতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে আগামী ৫ বছর।
এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে উন্নত প্রযুক্তি ও নিবিড় প্রতিযোগিতার শতকে টিকে থাকতে এবং এগিয়ে যেতেই হয়তো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পরিচ্ছন্ন ইমেজ সম্পন্ন তুলনামূলক কমবয়সী বা তরুণ কিন্তু মেধাবী, উদ্যমী, কর্মতৎপর, সৎ ও নিষ্ঠাবান মনে করে বর্তমান মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। জননেত্রীর মতো বাংলাদেশের মানুষেরও বর্তমান মন্ত্রিপরিষদের কাছে প্রত্যাশা অনেক। মানুষ আশা করে বর্তমান মন্ত্রিসভার প্রতিটি সদস্য চলনে-বলনে, কথা-বার্তায়, আচার-আচরণে, চিন্তা-চেতনায় সৎ, পরিচ্ছন্ন ও মার্জিত হবেন, জনবিচ্ছিন্ন না হয়ে জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবেন, জনগণের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করবেন, জনগণের কল্যাণে ও বাংলাদেশকে উন্নত দেশে উন্নীত করার বঙ্গবন্ধু ও জননেত্রী শেখ হাসিনার লক্ষ্য বাস্তবায়নে নিজেকে উৎসর্গ করে পঠিত শপথবাক্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবেন এবং শপথবাক্যের যথার্থতা প্রমাণ করবেন।
লেখক: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ও অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক