টানা পাঁচ মাস বন্ধ থাকার পর অবশেষে আগামী শনিবার থেকে চালু হচ্ছে দেশের হৃদরোগীদের একমাত্র বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ‘জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের’ অপারেশন থিয়েটার (ওটি) ও আইসিইউ (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট)। জীবাণু মুক্ত করে বড় কলেবরে অস্ত্রোপচারের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে সেগুলো। নতুন তিনটি কার্ডিয়াক সার্জারি ওটি ও ৩০টি আইসিইউ শয্যাসহ বর্তমানে মোট ওটির সংখ্যা ছয়টি ও আইসিইউ শয্যা ৩৮টি। শিশুদের জন্য ১২ শয্যার নতুন একটি আইসিইউ ইউনিট করা হয়েছে। চালু থাকা পুরনো ভাসকুলার ওটি সংস্কার করে আধুনিক করা হয়েছে। এমনকি ওটির সংক্রমণ প্রতিরোধে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটি প্রতি মাসে নমুনা নিয়ে ল্যাবরেটরিতে পাঠাবে।
গত রবিবার থেকে সার্জারির রোগী ভর্তি শুরু হয়েছে। সেদিন দুই নম্বর ওয়ার্ডে তিনটি ইউনিটে চার রোগী ভর্তি করা হয়েছে। তবে তাদের অপারেশনের তারিখ দেওয়া হয়নি। সরেজমিন ওটি কমপ্লেক্সে কাজ করতে দেখা গেছে লোকজনকে। এত দীর্ঘ সময় এমন গুরুত্বপূর্ণ এই সেবা বন্ধ রাখার ঘটনা
দেশে এটাই প্রথম। কোনো নোটিশ না থাকায় এ ব্যাপারে কিছুই জানতেন না রোগীরা। বন্ধ থাকার তথ্য ছিল না স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছে। এমনকি কবে নাগাদ চালু হতে পারে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারছিলেন না কেউই। এ নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করতে গেলে তারা এই প্রতিবেদকের কাছে এতদিন বন্ধ থাকার তথ্যে বিস্ময় প্রকাশ করেন।
এই সুযোগে এই পাঁচ মাসে হাসপাতালের চিকিৎসক ও দালালদের একটি সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে রোগীদের নিজ পছন্দের হাসপাতালে পাঠিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি পরিচালককে ডেকেছিলাম। তিনি এসেছিলেন। তার সঙ্গে কথা হয়েছে। ওটি চালু হয়ে যাবে। ওটিকে আধুনিক করা হয়েছে। সংস্কার কাজ করতে গিয়ে তারা বন্ধ রেখেছিলেন।
হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক আফজালুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা প্রস্তুত। আগামী বুধবারের মধ্যেই চালু করার কথা ছিল। কিন্তু সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে শনিবার চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সার্জারি বিভাগের চিকিৎসকদের চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রোগী ভর্তি শুরু হয়েছে। ওটি ও আইসিইউর কলেবর বেড়েছে। আধুনিক করা হয়েছে। আশা করছি এখন থেকে আরও বেশি রোগীকে সেবা দিতে পারব।
বিকল্প রেখে সংস্কার কাজ করা যেত কি না জানতে চাইলে পরিচালক বলেন, প্রথম এক মাস ওটি চালু রেখেই সংস্কার কাজ চলছিল। কিন্তু ধুলোবালির কারণে সংক্রমণের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছিল। চিকিৎসকরাও পারছিলেন না। বাধ্য হয়ে বন্ধ করতে হয়েছে।
এমন ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রশিদ-ই-মাহবুব বলেন, এমন করে ওটি বন্ধ রাখা উচিত হয়নি। এটা অন্যায়। বিকল্প ব্যবস্থা রাখা লাগত। তবে যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো যেন বাস্তবায়ন হয়। সেটা খেয়াল রাখতে হবে। জীবাণুমুক্ত রাখার জন্য নিয়মিত তদারকি দরকার। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকতে হবে।
চিকিৎসকরা জানান, এর আগে গত সেপ্টেম্বরে এই হাসপাতালের অস্ত্রোপচার কক্ষে ৭ জন রোগী মারা যান। তদন্ত করে ওটিতে উচ্চ মাত্রার সংক্রমণ ও চিকিৎসকদের অবহেলা ধরা পড়ে। সে সংক্রমণের কারণ খুঁজতে গিয়ে ধরা পড়ে সংক্রমণমুক্ত যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় বড় ধরনের দুর্নীতি। সবকিছু ধামাচাপা দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সংস্কারের নামে অস্ত্রোপচার বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। গত ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে এই সংস্কার কাজ শুরু হয়েছে। সেদিন থেকেই ওটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। চার সপ্তাহের মধ্যেই সংস্কার কাজ শেষ করে ওটি চালুর কথা থাকলেও তা গত পাঁচ মাসেও হয়নি।
বেড়েছে ওটি ও আইসিইউ শয্যা : হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক আফজালুর রহমান দেশ রূপান্তরকে জানান, ওটি ও আইসিইউ শয্যার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। ওপেন হার্ট সার্জারির জন্য গত বছর কেনা একটি হার্টলাং মেশিনসহ এখন পাঁচটি হার্টলাং মেশিন থাকছে। ১৪ বছরের পুরনো একটি অ্যানেসথেসিয়া ভেন্টিলেটর মেশিনের সঙ্গে নতুন থাকছে আরও চারটি। ওটিতে ব্যবহৃত জিনিসপত্র জীবাণু মুক্ত করার জন্য স্টেরিলাইজেশন মেশিন গত বছর কেনা হয়েছে একটি। আরও দুটি ঠিক করা হয়েছে। আরও চারটি কেনা হবে।
‘ওটি জীবাণুমুক্ত রাখার জন্য মাইক্রোবায়োলজি ডিপার্টমেন্টের প্রধানকে নিয়ে ওটি ও আইসিইউ কমিটি করা হয়েছে। এই কমিটি প্রতি মাসে আইসিইউ ও ওটি থেকে নমুনা নিয়ে ল্যাবরেটরিতে পাঠাবে। এখন আর যে কেউ আগের মতো ওটি কমপ্লেক্সে ঢুকতে পারবে না। ওটির ভেতর ছাদ থেকে পানি পড়ত। ওটির দেয়াল ও মেঝেতে অ্যান্টি ইনফেকটিভ সাবস্টেইন দেওয়া হয়েছে, যাতে সংক্রমণ হতে না পারে। অক্সিজেন মেশিন বসানো হয়েছে ৪০টি। আগে ক্যাথল্যাব ছিল নিচতলায়। জীবাণু ঢুকত। এখন দোতলায়। শিশুদের জন্য আলাদা কোনো আইসিইউ ছিল না। এখন শিশু আইসিইউ শয্যা হয়েছে ১২টি’Ñ জানান পরিচালক।
পাঁচ মাসে কোটি টাকার বাণিজ্য : হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশু মিলে প্রতিদিন গড়ে এখানে অপারেশন হয় ৬টি। সপ্তাহে ৬ দিনে ৩৬টি অপারেশন। বন্ধের নোটিশ না থাকায় প্রতিদিনই রোগীরা আসতেন। হাসপাতালের চিকিৎসক ও দালাল চক্র মিলে এসব রোগীকে পছন্দের বাইরের হাসপাতালে পাঠাতেন। এর মধ্যে বেশি পাঠানো হয়েছে মিরপুরের বেগম রোকেয়া সরণির আল-হেলাল স্পেশালাইজড হাসপাতাল ও লালমাটিয়া ডি ব্লকের ইউরো বাংলা হার্ট হাসপাতালে। এ ছাড়া ভাসকুলার সার্জারি রোগীদের পাঠানো হয় ধানমন্ডির ইবনে সিনা হাসপাতালে। ওটি না থাকায় শিশু হৃদরোগীদের জটিল ডিভাইস বসানোর জন্যও এসব হাসপাতালে পাঠানো হতো। এখানে যে অপারেশন ১ লাখ টাকা, সেটা বাইরে সাড়ে ৩ লাখ টাকা।
হাসপাতালের এক কার্ডিয়াক সার্জন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখানকার সার্জন বাইরে গিয়ে অপারেশন করালে পান রোগীপ্রতি ৩০-৩৫ হাজার টাকা ও রোগী পাঠানোর জন্য দালালরা পান চিকিৎসা ব্যয়ের ১০ শতাংশ, অর্থাৎ ৩৫ হাজার টাকা। এর বাইরে স্টেন্ট, অন্যান্য ডিভাইসসহ অপারেশনের যন্ত্রপাতি কেনা থেকেও মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেন তারা। এ হিসাবে অন্য হাসপাতালে পাঠানো থেকে অপারেশন করা পর্যন্ত এখানকার একজন সার্জন পান গড়ে রোগীপ্রতি ৭০ হাজার টাকা। গত পাঁচ মাসে এই হাসপাতাল থেকে কম করে হলেও সপ্তাহে ৬ জন হিসেবে ১২০ রোগীকে বাইরের হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। রোগীপ্রতি ৭০ হাজার টাকা হিসেবে গড়ে চিকিৎসক ও দালাল চক্র হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় এক কোটি টাকা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক জানান, এই চক্রের নেতৃত্বে রয়েছেন হাসপাতালের চার প্রভাবশালী চিকিৎসক। ওটি মূলত তাদের নিয়ন্ত্রণেই। ওটি বন্ধ থাকায় এই চিকিৎসকরা খুশি। ওটি চালুর ব্যাপারে এদের কোনো তাগিদ ছিল না। এমনকি জীবাণু মুক্ত করে পুরনো ওটি চালু রেখে নতুন ওটি স্থাপনেও রাজি করানো যায়নি তাদের।