সততার নতুন শাসন আসুক

চতুর্থবারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণের পর রাজনীতিক শেখ হাসিনার নতুন যাত্রার সাক্ষ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে নতুন মন্ত্রিসভাকে। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নতুন মুখ এবং তুলনামূলক নবীনদের নিয়ে যে মন্ত্রিসভা গঠন করেন তা নিয়ে আলোচনা এখনো ফুরিয়ে যায়নি। তিনি যে এই মন্ত্রিসভাকে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন তা দৃশ্যমান। এই চ্যালেঞ্জ কেবল নতুন সরকারের নয়, নিজের দল ও দেশে নতুন রাজনীতি প্রতিষ্ঠারও। নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই দেশের জন্য সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে মন্ত্রীদের কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তার বক্তব্যে দুর্নীতিবিরোধী শক্ত অবস্থান নিয়ে এক নতুন যাত্রা শুরুর কথা আবারও ফুটে উঠেছে।  

নির্বাচনী ইশতেহার ও প্রচারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বা ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ নীতির ওপর জোর দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। দুর্নীতির অভিযোগ আছে এমন প্রভাবশালী নেতারা মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়ায় এ বিষয়ে জনমনে খানিকটা আশারও সঞ্চার হয়েছে। নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে ‘বিত্তবৈভবের পেছনে ছুটলে পচে যাবেন’ বলে মন্ত্রীদের হুঁশিয়ারি আর সব মন্ত্রীর কর্মকাণ্ডই ‘কঠোর নজরদারিতে থাকবে’ বলে সতর্কবাণীতে দুর্নীতিরোধের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর শক্ত অবস্থান দেখা যায়। রাজনৈতিক নিয়োগের প্রথা ভেঙে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রীর ‘পিএস’ বা একান্ত সচিব নিয়োগের দৃষ্টান্তও দুর্নীতি রোধ ও প্রশাসনে জবাবদিহিতার পদক্ষেপ বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ‘প্রশাসনের দুর্নীতি রোধ করা’, ‘সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা’, ‘বিচার বিভাগকে প্রভাবমুক্ত রেখে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা’র মতো দীর্ঘদিন ধরে উচ্চারিত দাবিগুলোর বিষয়ে জনগণের মনের কথা বুঝতে পারছেন প্রধানমন্ত্রী। নাগরিক সমাজ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও দীর্ঘদিন ধরে এসব বিষয়ে সরকারের সমালোচনা করে আসছিল। এখন প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতিবিরোধী ঘোষণার পাশাপাশি একাধিক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে নিজেদের সম্পদের হিসাবসহ মন্ত্রণালয় এবং অধীনস্থ সব দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব দাখিলের নির্দেশ দিতে দেখা যাচ্ছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের তৎপরতায় নানা স্তরের দুর্নীতিবাজদের ধরার খবরও গণমাধ্যমে প্রকাশ হচ্ছে।

নতুন মন্ত্রিসভাকে ঘিরে দুর্নীতিবিরোধী এসব উদ্যোগ দেশে নতুন শাসনের ইঙ্গিতবাহী। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, জনপ্রশাসন এবং সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়াটা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে। সংসদীয় কমিটিগুলো কি মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখবে? ব্যবসায়ী-জনপ্রতিনিধিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় থাকা সংসদ কি ব্যবসায়ীদের দুর্নীতির অভিযোগের বিরুদ্ধে তদন্তে সহায়তা করবে? দুর্নীতি দমন কমিশন কি রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে গিয়ে সরকারি কর্মকর্তা এবং রাজনীতিক-ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে স্বাধীনভাবে তদন্ত কাজ চালাতে পারবে? সে সব কি গণমাধ্যমের মাধ্যমে দেশবাসীর সামনে প্রকাশিত হবে?

টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষহীন শেখ হাসিনার সরকার এখন দেশের রাজনৈতিক-সংস্কৃতির গুণগত পরিবর্তনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার মতো কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে মন্ত্রীদের উদ্দেশে দীর্ঘ দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তার পিতার অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকে একটা উদ্ধৃতি দিয়েছেন। সেটা হলো ‘উদ্দেশ্যের সদিচ্ছা ও সততার সদিচ্ছা’ নিয়ে কাজ করে গেলে কখনো পরাজিত হতে হবে না। কৈশোরে নিজের পিতার কাছ থেকে পাওয়া এই হিতোপদেশকে বঙ্গবন্ধু নিজেই তার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম মূলমন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই কথা দেশের রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনের জন্য এখন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। দেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিবর্তনের প্রত্যাশায় অপেক্ষমাণ।