মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর হলেও দেখতে একই রকম ও তুলনামূল কম দামি হওয়ায় শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত সোডিয়াম সালফেট আমদানি করে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ভোজ্য লবণ (সোডিয়াম ক্লোরাইড) হিসেবে বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছে বলে দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের এক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া ওই প্রতিবেদনে বলা হয়,
আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য লবণ ও শিল্প লবণের (সোডিয়াম সালফেট) দর দেশের বাজারের ভোজ্য লবণের চেয়ে অনেক কম। ভোজ্য লবণ আমিদানি-নিষিদ্ধ হওয়ায় শিল্প লবণের আমদানি আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। চাহিদার দ্বিগুণের বেশি আমদানি হওয়া শিল্প লবণ খোলাবাজারে ভোজ্য লবণ হিসেবে বিক্রি হচ্ছে।
ট্যারিফ কমিশন বলছে, ‘আন্তর্জাতিক বাজারদর অপেক্ষা স্থানীয় বাজারে অপরিশোধিত লবণের মূল্য বেশি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সোডিয়াম সালফেটের নামে সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানি হচ্ছে। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। মিয়ানমার থেকে অপরিশোধিত লবণের অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য উৎসাহিত হচ্ছে। স্থানীয় অসাধু ব্যবসায়ীগণ সোডিয়াম ক্লোরাইডের সঙ্গে সোডিয়াম সালফেট মিশিয়ে বাজারজাত করার ফলে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।’
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) হিসাব অনুযায়ী, দেশে ভোজ্য লবণের চাহিদা ১৬ থেকে ১৭ লাখ টন, শিল্প লবণের চাহিদা ৩ লাখ ৮৩ হাজার টন। কিন্তু গত অর্থবছর দেশে শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ১৪ লাখ ৪০ হাজার ৭৫৮ টন লবণ আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে সোডিয়াম ক্লোরাইড ৮ লাখ ৯০ হাজার ১৮০ টন, হোয়াইট সোডিয়াম সালফেট ৫ লাখ ২৪ হাজার ৮৪ টন ও সোডিয়াম সালফেটস ২৬ হাজার ৫৩০ টন আমদানি হয়েছে।
ট্যারিফ কমিশন বলছে, কস্টিক সোডার কাঁচামাল হিসেবে আমদানি করা সোডিয়াম সালফেট দেখতে খাওয়ার লবণের মতোই। অসাধু ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পরিমাণ সোডিয়াম সালফেট আমদানি করে তার সঙ্গে সাবান, ডিটারজেন্ট পাউডার ও গার্মেন্ট শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে আমদানি করা সোডিয়াম ক্লোরাইড মিশিয়ে বাজারে বিক্রি করছে।
বাংলাদেশে প্রতি টন লবণের উৎপাদন খরচ ৩০ থেকে ৩৫ ডলার, যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন অপরিশোধিত লবণের এফওবি মূল্য (আমদানি মূল্য) ৮ থেকে ১৫ ডলার। লবণ বিকল্পহীন একটি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হওয়ায় স্থানীয় এ শিল্পের তুলনামূলক সুবিধা না থাকলেও যথাযথ সুরক্ষা দেওয়ার সুপারিশ করেছে ট্যারিফ কমিশন।
আমদানি-নিষিদ্ধ খাওয়ার লবণের ওপর মোট ৮৯ দশমিক ৪২ শতাংশ শুল্ককর এবং শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে বিভিন্ন ধরনের লবণ আমদানিতে ৩৭ শতাংশ শুল্ককর আরোপিত আছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত খাওয়ার লবণের দাম এতই কম যে এই হারে শুল্ক পরিশোধের পরও প্রতি কেজিতে আমদানি খরচ হয় ৫ টাকা ৬৯ পয়সা। আর দেশে উৎপাদিত অপরিশোধিত লবণের প্রতি কেজির মূল্য ৬ টাকা ৫ পয়সা। ফলে শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে আমদানি করে তা খাওয়ার লবণ হিসেবে বাজারে ছাড়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ লবণ কল মালিক সমিতির সভাপতি নুরুল কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সোডিয়াম সালফেট দেখতে খাওয়ার লবণের মতোই, স্বাদও একই। কিন্তু এটি স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে সোডিয়াম সালফেট আমদানি করে অসাধু ব্যবসায়ীরা তা সরাসরি প্যাকেট করে বাজারে বিক্রি করছে।’
পূবালী সল্টের মালিক পরিতোষ চন্দ্র সাহা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিসিকের হিসাবে দেশে শিল্প লবণের চাহিদা পৌনে ৪ লাখ টন। অথচ গত অর্থবছর আমদানি হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ টন। বাড়তি এই শিল্পলবণ বাজারে খাওয়ার লবণ হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। বিসিক বলছে, দেশে ভোজ্য লবণের চাহিদা ১৬ লাখ টন। এটা আসলে অনেক বেশি। সরকারের উচিত, ভোক্তা ও শিল্প খাতে প্রকৃতপক্ষে লবণের চাহিদা কত, তা সঠিকভাবে নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।
ট্যারিফ কমিশন বলছে, স্থানীয় লবণচাষিদের বাড়তি সুরক্ষা দিয়ে লবণ আমদানি উন্মুক্ত করলে তাদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে না। লবণ আমদানির শুল্ককর ১৫ শতাংশ বাড়িয়ে ১০৪ দশমিক ৭৯ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করে সংস্থাটি বলেছে, অপরিশোধিত লবণ আমদানি উন্মুক্ত হলে স্থানীয় উৎপাদনকারীরা গুণগত মানসম্পন্ন অপরিশোধিত লবণ উৎপাদনে সক্ষম হবে। এতে বাজারে অপরিশোধিত লবণ সরবরাহ বাড়বে। তখন অসত্য ঘোষণার মাধ্যমে সোডিয়াম সালফেটের পরিবর্তে সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানি বন্ধ হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ অ্যান্ড হিউম্যান সার্ভিসেসের তথ্য অনুযায়ী, সোডিয়াম সালফেট খেলে ডায়রিয়া ও গ্যাস্ট্রিকসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয় মানুষ। এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, ১৫ দিন সোডিয়াম সালফেট মিশ্রিত পানি খাওয়ানোর পর এক-তৃতীয়াংশ মুরগি মারা গেছে।
বাণিজ্য সচিব মো. মফিজুল ইসলাম গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভোজ্য লবণ হিসেবে সোডিয়াম সালফেট যেন বাজারে ঢুকতে না পারে সেজন্য আমরা প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নেব। প্রয়োজনে বাজার থেকে লবণ সংগ্রহ করে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। কোনো লবণে সোডিয়াম সালফেট পাওয়া গেলে অবশ্যই আমরা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।’