শুনতে কি পাও বুড়িগঙ্গার কান্না

 

সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলা টইটম্বুর জল উপচে পড়া বুড়িগঙ্গা নদী দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বুড়িগঙ্গায় কবি রাত্রিযাপন করেছেন। নদীর অপরূপ সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে লিখেছেন কবিতা। জানা যায়, ১৯২৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে দ্বিতীয়বার ঢাকা আগমনের পর কবির থাকা-খাওয়া নিয়ে ঢাকাবাসীর মধ্যে রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এ নিয়ে ঢাকার বিশিষ্ট নাগরিকরা দু’ভাগ হয়ে গেল। তখন তিনি কারও বাসায় না উঠে বুড়িগঙ্গা নদীতে রাখা নৌযানে অবস্থান নেন। ঢাকার নবাবদের রাজকীয় জলযান ‘তুরাগ হাউস বোট’-এ থাকার সময় কবিগুরু প্রায় প্রতিদিন সকালে জলভ্রমণে বের হতেন। মোটর বোটে করে পাঁচ কি সাত মাইল দূরে চলে যেতেন। কবিগুরু আজ বেঁচে থাকলে বুড়িগঙ্গার এই করুণদশা দেখে যারপরনাই ব্যথিত হতেন। মনের ক্ষোভে ও দুঃখে হয়তো আরেকটি কবিতা লিখতেন।

বুড়িগঙ্গা নিয়ে অনেক কথাই শুনেছি। কিন্তু প্রথমবার যখন এর তীরে গেলাম তখন থমকে দাঁড়ালাম। নিজেকে প্রশ্ন করলাম, ভুল জায়গায় এলাম না তো! পরক্ষণে জেনেছি, এ-ই আমাদের বুড়িগঙ্গা। ছেলেবেলাতেই জেনেছিলাম ‘ঢাকার অবস্থান বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে’। তখন মনের ক্যানভাসে কেবলই বুড়িগঙ্গার ছবি ভেসে উঠত। না জানি বুড়িগঙ্গা দেখতে কত সুন্দর! বইয়ের পাতায় দেখা বুড়িগঙ্গায় নদীর স্বচ্ছ জলে ছিল সারি সারি নৌকা। মাঝি গলা ছেড়ে গান গাইছে ‘মাঝি বাইয়া যাও রে...’।  কল্পনার সেই বুড়িগঙ্গার সঙ্গে বর্তমানের নদীকে কোনোভাবেই মেলানো যায় না। যে আবেগ আর ভালোবাসা নিয়ে বুড়িগঙ্গার রূপ দর্শন করতে গেলাম, তার জীর্ণশীর্ণ, শ্রীহীন, দূষিত, দুর্গন্ধময় চেহারা দেখে তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যথিত হলাম। একটু অনুভব করলেই আমরা এ নদীর কান্না শুনতে পাব। বুড়িগঙ্গা যেন প্রতিনিয়ত চিৎকার করে ডাকছে, ‘কে আছো, আমাকে বাঁচাও, আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে, আমাকে মুক্ত করো, দস্যুদের হাত থেকে’!

বুড়িগঙ্গার দৈর্ঘ্য ২৯ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৩০২ মিটার। এক সময় তার বুকে পানির অবাধ প্রবাহ ছিল, ছিল ভরা যৌবন। তার চেহারায় অপূর্ব মায়া ছিল। বুড়িগঙ্গার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ১৮ শতকের গোড়ার দিকে পর্যটক জন টেইলর লিখেছিলেন, ‘বর্ষাকালে যখন নদীটি পানিতে পরিপূর্ণ থাকে তখন দূর থেকে ঢাকাকে দেখায় ভেনিসের মতো’।  ইতিহাস থেকে জানা যায়, বুড়িগঙ্গার সৌন্দর্য বাড়ানোর কাজ করেছিলেন বাংলার সুবাদার মুকাররম খাঁ। তার শাসনামলে শহরের যে সব অংশ নদীর তীরে অবস্থিত ছিল, সেখানে প্রতি রাতে আলোকসজ্জা করা হতো। এছাড়া নদীর বুকে অসংখ্য নৌকাতে জ্বলত ফানুস বাতি। আলোকসজ্জা আর ফানুস বাতিতে বুড়িগঙ্গার তীর হয়ে উঠত অপরূপ সৌন্দর্যময়। সেই রুপালি ঝলমলে আলোর বুড়িগঙ্গা আবার দেখতে চায় ঢাকা নগরবাসী।

বর্তমানে বুড়িগঙ্গার তীর দখল করে গড়ে উঠেছে জাহাজ ও লঞ্চ তৈরির কারখানা। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্র্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) হিসাবে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দখলে রয়েছে নদীর সাড়ে চার হাজার একরেরও বেশি জায়গা।  শিল্পবর্জ্য ও পয়ঃবর্জ্য সরাসরি পড়ছে নদীতে। বুড়িগঙ্গার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ শূন্য দশমিক ৪০। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, মৎস্য ও জলজ প্রাণীর জীবনধারণের জন্য দ্রবীভূত অক্সিজেন প্রতি লিটারে ৫ মিলিগ্রাম বা এর ওপরে থাকতে হয়। বর্তমানে বুড়িগঙ্গায় কোনো প্রাণের অস্তিত্ব টিকে থাকা বেশ কঠিন। নৌবাহিনীর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুড়িগঙ্গা নদী দূষণের জন্য দায়ী মূলত শিল্পবর্জ্য।  পলিথিন জমে নদীটির তলদেশে ১০ থেকে ১২ ফুট ভরাট হয়ে গেছে। এখন বুড়িগঙ্গার পানির রঙ কুচকুচে কালো। নদীতীরবর্তী মানুষ তীব্র দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ। এই অবস্থা দুর্বিষহ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। পৃথিবীর বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ শহর গড়ে উঠেছে নদীতীরে। বিভিন্ন দেশ এখনো নদীর অবাধ প্রবাহ টিকিয়ে রেখেছে। বুড়িগঙ্গার হারানো রূপ পুনরুদ্ধারে সে সব শহরের অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনা অনুসরণ করা যেতে পারে। এজন্য ড্রেজিং করে নদীর গভীরতা বাড়াতে হবে। উদ্যোগ নিতে হবে ঢাকার অন্য নদীগুলোর সঙ্গে বুড়িগঙ্গার সংযোগ সারা বছর নাব্য রাখার।

নদীতীর দখলমুক্ত করে জনসাধারণের জন্য হাঁটাচলার রাস্তা তৈরির সঙ্গে লাগানো যায় দেশীয় প্রজাতির গাছ। সরকারের সদিচ্ছা ও সুপরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে দীর্ঘমেয়াদে বুড়িগঙ্গাকে কিছুটা হলেও আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যাবে নিশ্চয়ই। দিন দিন ইট-পাথরের জঙ্গল হয়ে ওঠা ঢাকাকে সুন্দর ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে বুড়িগঙ্গার হারানো রূপ পুনরুদ্ধারের বিকল্প নেই। অনাগত দিনে কী ঘটবে জানি না, তবু আশাবাদী আমরা স্বপ্ন দেখি বুড়িগঙ্গার বুকে আবারও জোয়ার আসবে। নদীর দুই তীরে ভরে যাবে সবুজ গাছগাছালিতে। বুড়িগঙ্গা তীরের আকাশে পাখিরা আনন্দে ডানা মেলে উড়বে। ঢাকা হবে পৃথিবীর অন্যতম স্বাস্থ্যকর, মনোরম ও দৃষ্টিনন্দন শহর।

লেখক: চাকরিজীবী ও গবেষণাকর্মী