রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশেই বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে শপিংমল ও আবাসিক ভবনের নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে ব্যক্তি মালিকানার বিভিন্ন সিকিউরিটি এজেন্সি। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি অফিসের নিরাপত্তার দায়িত্বও দেওয়া হচ্ছে এ সব এজেন্সির হাতে। এই এজেন্সিতে কর্মরত নৈশ প্রহরীরা বলেছেন, তাদের নিজের জীবনের নিরাপত্তা নেই। বিশেষ করে রাতের বেলায় তাদের জীবন বেশি ঝুঁকিতে থাকে। ব্যাংকের নিরাপত্তার জন্য সীমিত আকারে গানম্যান থাকলেও এটিএম বুথের জন্য কোনো গানম্যান থাকে না। প্রহরীদের থাকে না তেমন প্রশিক্ষণ এবং আগ্নেয়াস্ত্র। মাত্র ১৫ দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে নামিয়ে দেওয়া হয় কাজে। ফলে মাঝেমধ্যেই প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।
সর্বশেষ গত সোমবার রাজধানীর বারিধারায় যমুনা ব্যাংকের এটিএম বুথের মধ্যেই শামীম নামে এক প্রহরী খুন হয়েছে। এ ঘটনায় আতঙ্কে রয়েছে অন্যান্য প্রহরীরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিভিন্ন ভবনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা প্রহরীদের নিজের জীবন বাঁচাতে সামান্য লাঠি পর্যন্ত দেওয়া হয় না এজেন্সির পক্ষ থেকে। ফলে মাঝেমধ্যেই ঘটে দুর্ঘটনা। প্রাণহানি না হলে তা কারও নজরেও আসে না। প্রহরীদের অভিযোগ, কোনো দুর্ঘটনায় সিকিউরিটি এজেন্সিগুলো ক্ষতিপূরণও ঠিকমতো দেয় না। ইনস্যুরেন্স কোম্পানির দেওয়া টাকাও ঠিকমতো পায় না পরিবার। প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়েই নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন তারা।
এ বিষয়ে এলিট সিকিউরিটি ফোর্স লিমিটেডের নৈশপ্রহরীদের চেকার মোহাম্মদ আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভাই আমাদের জীবনের কোনো দাম নেই। কোনো অস্ত্র ছাড়াই সিকিউরিটি এজেন্সি আমাদের ডিউটিতে পাঠায়। হামলায় মারা গেলে কারও খবরও রাখা হয় না। আমাদের কোনো সংগঠনও নেই, যারা আমাদের সুবিধা-অসুবিধা দেখবে।
ওরিয়ন সিকিউরিটি সার্ভিস লিমিটেডের পক্ষ থেকে সিটি ব্যাংকের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সিরাত আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের নিজেদের জীবন রক্ষার জন্য একটা লাঠিও নেই। রাত গভীর হলে অনেক সময় মদ্যপ অবস্থায় অনেকে এসে খারাপ ব্যবহার করে।’
এদিকে লাভজনক ব্যবসা হওয়াতে সারা দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে একাধিক এজেন্সি। এই মুহূর্তে সারা দেশে ছোট-বড় প্রায় ১৭শ সিকিউরিটি এজেন্সি রয়েছে। এলিট ফোর্স, ওরিয়ন, জিএস, গ্রুপ-৪, আইএফ, সিকুরে, এজির, স্যালকন, ওরনেফসহ বেশ কিছু সিকিউরিটি এজেন্সি রয়েছে যাদের দেশব্যাপী কার্যক্রম রয়েছে। নিরাপত্তার দায়িত্বে মাঠপর্যায়ে সব মিলিয়ে প্রায় চার লাখ লোক কর্মরত আছে। সিকিউরিটি এজেন্সিগুলো বলছে তাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, এ জন্য প্রহরীদের কাছে অস্ত্র দেওয়া সম্ভব হয় না। তবে একটি করে বাঁশি দেওয়া হয়। এ ছাড়া রাত ১২টা থেকে ৬টা পর্যন্ত নাইট চেকার থাকে। সংশ্লিষ্ট থানাও তাদের প্রয়োজনে সহায়তা করে। গত বছরের ২ জানুয়ারি রাজধানীর মোহাম্মদপুরে সহকর্মীর হাতে আসিফ নামে এক সিকিউরিটি গার্ড খুন হন। ৯ মার্চ মধ্যরাতের পর রাজধানীর দারুস সালামের উত্তর টোলারবাগ আবাসিক এলাকার একটি বাড়িতে খুন হন বাসার নিরাপত্তা প্রহরী ওমর ফারুক। বাড়ির নিচে ভবনের বাসিন্দারা ফারুকের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে। মোটরসাইকেল চুরি করতে এসে ফারুককে খুন করে দুর্বৃত্তরা।
৬ অক্টোবর রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথের নিরাপত্তা কর্মী বশিরকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
এসব বিষয়ে জিএস সিকিউরিটি এজেন্সি লিমিটেডের এক প্রহরী জানান, আমাদের নিজেদেরই জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। মেরে ফেলে রাখলে কে খবর নেয়। বিপদে পড়ে এই কাজ করি।
ওরিয়ন সিকিউরিটি ফোর্স লিমিটেডের সিনিয়র ম্যানেজার অ্যাডমিন গাজী আবদুস সাত্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদেরও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। ব্যক্তি পর্যায়ে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র দেওয়ার নিয়ম নেই। তা ছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী আমরা প্রহরী দিই। আমাদের সীমিত আকারে কিছু গানম্যান আছে।’
এলিট সিকিউরিটি ফোর্স লিমিটেডের ডিএমডি অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাহাঙ্গীর আক্তার চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা সাধারণত ব্যাংক ও এটিএম বুথের নিরাপত্তা দিয়ে থাকি। এখানে যারা প্রহরীর দায়িত্বে থাকে তারা সব সময় সচেতন থাকে। তাদের কাছে ক্ষেত্র বিশেষে লাঠিও থাকে। তাদের মূল দায়িত্ব বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিস্থিতি দেখা। তবে তাদের জীবনের নিরাপত্তা তাদেরই দিতে হয়। পুলিশও সহায়তা করে।