বেসিক ব্যাংক সংক্রান্ত ৫৬ মামলায় অভিযোগপত্র শিগগিরই

পরিচালনা পর্ষদের প্রভাবশালী কিছু সদস্যকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারির ৫৬ মামলার অভিযোগপত্র প্রায় চূড়ান্ত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত দল। অভিযোগপত্রগুলো কমিশনে জমা দেওয়ার পর অনুমোদন সাপেক্ষে আদালতে দাখিল করা হবে। মামলাগুলোতে দেড় শতাধিক ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে অন্তত ২৫ জন ব্যাংক কর্মকর্তা। আর জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ করা ৫৪ প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১৩০ জন ব্যক্তির নাম রয়েছে। মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা এসব তথ্য জানিয়েছেন।

এদিকে বেসিক ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় গতকাল বুধবার আরও একটি মামলা করেছে দুদক। মামলায় বেসিক ব্যাংকের ৫ কর্মকর্তাসহ ১৩ জনকে আসামি করা হয়েছে।  

বেসিক ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্করির মামলার অভিযোগপত্রের বিষয়ে জানতে চাইলে ঋণ জালিয়াতি মামলার তদন্ত দলের প্রধান ও দুদক পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘৫৬ মামলার তদন্ত কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এখনো কিছু কাজ চলছে। কম সময়ের মধ্যে অগ্রগতি দেখা যাবে।’

দুদকের অপর পরিচালক মীর মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন শিবলী বলেন, ‘অল্প সময়ের মধ্যেই কমিশনের অনুমোদন

সাপেক্ষে চার্জশিট আদালতে পাঠানো হবে।’ 

২০১১ সালে বেসিক ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় অনিয়ম করে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির অভিযোগ পায় দুদক। অভিযোগ আমলে নিয়ে প্রায় চার বছরের অনুসন্ধান শেষে ২০১৫ সালের ২১, ২২ ও ২৩ সেপ্টেম্বর পল্টন, মতিঝিল ও গুলশান থানায় ৫৬টি মামলা করে দুদকের তদন্ত দল। কোনো মামলাতেই ব্যাংকটির ওই সময়কার পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুসহ অধিকাংশ সদস্যকে আসামি করা হয়নি। এই ৫৬ মামলায় ২ হাজার ৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়। পরে আরও বেশ কয়েকটি মামলা করে দুদক। প্রত্যেকটি মামলা পৃথক পৃথক কর্মকর্তা তদন্ত করছেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, দুদক আইন ও বিধি অনুযায়ী কোনো অভিযোগ অনুসন্ধান করতে হয় ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে। কিন্তু দুদক ঋণ জালিয়াতির অনুসন্ধানে চার বছর সময় নেয়। বিধি অনুযায়ী মামলা দায়েরের পর তদন্ত সম্পন্ন করতে হয় ১৮০ দিনে। কিন্তু প্রায় সাড়ে তিন বছরেও দুদক মামলাগুলোর তদন্ত শেষ করতে পারেনি। এই দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তাদের হাইকোর্টে তলব করা হয়। পরে হাইকোর্ট কয়েকটি পর্যবেক্ষণ দেয়। ওই পর্যবেক্ষণের আলোকে ঋণ জালিয়াতির সময় পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক।

এজাহারে নাম না থাকলেও বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি মামলার অভিযোগপত্রে আবদুল হাই বাচ্চুসহ পরিচালনা পর্ষদের সব সদস্যের নাম থাকবে কি না, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তাদের একজন বলছেন, ‘তদন্ত চলছে। উচ্চ আদালতেরও কিছু নির্দেশনা আছে। আমরা সে অনুযায়ী কাজ করছি।’

তদন্ত দলের এক কর্মকর্তা জানান, কাগজে-কলমে থাকলেও বেসিক ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই অস্তিত্বহীন। এ কারণে বারবার যোগাযোগ করা হলেও গ্রাহক পক্ষ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি। ফলে তাদের কাছ থেকে লোপাট হওয়া টাকা উদ্ধারের সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। তা ছাড়া অনেকে এসব টাকা আত্মসাৎ করে বিদেশে পালিয়ে গেছেন।

তদন্ত দলের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৫৬ মামলার মধ্যে বেশ কিছুর অভিযোগপত্র অনুমোদনের জন্য কমিশনে পাঠানো হয়েছে, যার কোনোটিতেই আবদুল হাই বাচ্চুসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের নাম নেই। শুধু পদাধিকারবলে পরিচালনা পর্ষদের সদস্য তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলামের নাম আছে।

২০১৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর গুলশান থানায় দায়ের করা ৩৮ নম্বর মামলাটি হয় মেসার্স সিন টেক্সের নামে ৯০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে। সিন টেক্সের মালিকসহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করে অভিযোগপত্র অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। 

একই দিনে গুলশান থানার ৪০ নম্বর মামলায় মেসার্স ফারসি ইন্টারন্যাশনালের নামে ৭৮ কোটি টাকার বেশি অর্থ আত্মসাতের। এই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারম্যানসহ নয়জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। ২০১৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর মতিঝিল থানায় দুদকের দায়ের করা মামলাটি মেসার্স সৈয়দ রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড ডেভেলপারস লিমিটেডের নামে। এই প্রতিষ্ঠানের নামে ১৭ কোটি টাকার বেশি আত্মসাতের জন্য ৯ জনকে আসামি করা হয়। এজাহারে থাকা একজন আসামিকে বাদ দিয়ে আটজনকে অন্তর্ভুক্ত করে অভিযোগপত্র অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। একই দিনে মতিঝিল থানায় দুদকের দায়ের করা ৪৩ নম্বর মামলায় রিলায়েন্স শিপিংয়ের বিরুদ্ধে ১৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মালিকের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রের সুপারিশ করা হয়। একই থানায় ২০১৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর দুদকের দায়ের করা ৩৮ নম্বর মামলায় মেসার্স এমারেল্ড ড্রেসেস লিমিটেড বিরুদ্ধে ১৭  কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মালিকের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেসিক ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে ব্যাংকটির তিন শাখায় প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ে। এ ছাড়া বেসিক ব্যাংকের নিজস্ব তদন্তে আরও ১ হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি প্রকাশ পায়।

দুদকের তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, বেসিক ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে বেসিক ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। ২০১৩ সালের মার্চে তা দাঁড়ায় ৯ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। ওই ৪ বছর ৩ মাসে ব্যাংকটি ৬ হাজার ৬৭৩  কোটি টাকা ঋণ দেয়। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকাই দেওয়া হয়েছে নিয়ম-বহির্ভূতভাবে। ওই সময় ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে ছিলেন শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর নেতৃত্বে আট জন। তাদের মধ্যে পদাধিকারবলে সদস্য ছিলেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (বর্তমানে পলাতক) কাজী ফখরুল ইসলাম, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান শুভাশীষ বসু, বিসিকের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও বর্তমান সিনিয়র সচিব শ্যামসুন্দর সিকদার, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক নিলুফার আহমেদ ও কামরুন্নাহার আহমেদ, যুবলীগ নেতা আনোয়ারুল ইসলাম ও মাসিক ‘উত্তরণ’ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক আনিস আহমেদ। অধিকাংশ ঋণ মঞ্জুরিতেই তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের স্বাক্ষর রয়েছে।

১৩ আসামির বিরুদ্ধে আরও এক মামলা : জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় আট কোটি আত্মসাতের অভিযোগে বেসিক ব্যাংকের ৫ কর্মকর্তাসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে  গতকাল বুধবার আরও একটি মামলা করেছে দুদক। রাজধানীর গুলশান থানায় এ মামলা করেছেন দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক জিন্নাতুল ইসলাম।

দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব কুমার ভট্টাচার্য জানান, মামলার আসামিরা হলেন বেসিক ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিজিএম) ইমরুল ইসলাম, ডিজিএম শাকির মাহমুদ শরফুদ্দীন, ডিজিএম (বর্তমানে বরখাস্ত) শাহ আলম ভূঁইয়া, সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক (বর্তমানে বরখাস্ত) আসিফ আহমেদ ও সাবেক অ্যাডভান্সড অফিসার ফারুক আহমেদ ভূঁইয়া। ব্যাংক কর্মকর্তাদের বাইরে আসামিরা হলেন মেসার্স পিসি এভিনির মালিক রোজিনা আহমেদ, রমনার বাসিন্দা মোশাররফ হোসেন, তোপখানার মোয়াজ্জেম হোসেন, তোপখানার মোতালেব হোসেন ও মোফাজ্জল হোসেন, ভূঁইয়া অ্যাসোসিয়েটসের পরিচালক  ইঞ্জিনিয়ার এম মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, কনসালট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার মহিউদ্দিন সিকদার ও ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সাবেক ইনস্ট্রাকটর (সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ) খলিলুর রহমান ভূঁইয়া।

এজাহারে বলা হয়েছে, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যহার করে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে গুলশান শাখা থেকে ৬ কোটি ৩৭ লাখ ৮৫ হাজার ৩৯ টাকা ঋণ নিয়ে তা আত্মসাৎ করেছেন। বর্তমানে সুদাসলে এই টাকার পরিমাণ ৭ কোটি ৯২ লাখ ৪২ হাজার ৩৯৩ টাকা।