বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির এক বছরের পরিসংখ্যান

সড়কে ঝরেছে ৭২২১ প্রাণ

গত বছর কেবল সড়কে পাঁচ হাজার ৫১৪টি দুর্ঘটনায় সাত হাজার ২২১ জন নারী-পুরুষ-শিশুসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এসব ঘটনায় ১৫ হাজার ৪৬৬ জন আহত হয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে। এ ছাড়া রেল, নৌ ও আকাশপথে দুর্ঘটনা হয়েছে ৫৩৪টি। এতে প্রাণ হারিয়েছে আরও ৫৭৫ জন, আহত হয়েছে ৫১৪ জন। এসব দুর্ঘটনায় মোট নিহত হয়েছেন সাত হাজার ৭৯৬ জন। আহতের সংখ্যা ১৫ হাজার ৯৮০।

গতকাল শুক্রবার বেলা ১১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলেন ধরে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি। সংগঠনটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী ২০১৮ সালের মোট দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার কারণ ও সুপারিশমালাও তুলে ধরেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘দেশের জাতীয়, আঞ্চলিক ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদের আলোকে সমিতির প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।’

যাত্রীকল্যাণ সমিতির এই সংবাদ সম্মেলনের ঘণ্টা কয়েক আগে কুমিল্লার  চৌদ্দগ্রামে একটি ইটভাটায় কয়লাবাহী ট্রাক উল্টে শ্রমিকদের থাকার ঘরের ওপর পড়ে ১৩ জনের মৃত্যুর খবর আসে। সমিতির বার্ষিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়লেও হতাহতের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কমেছে।

তাদের আগের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে চার হাজার ৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় সাত হাজার ৩৯৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল, আহত হয়েছিল ১৬ হাজার ১৯৩ জন। গতকাল সংবাদ সম্মেলনে মোজাম্মেল হক লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘বিদায়ী বছরের ৩ এপ্রিল সংঘটিত সড়ক দুর্ঘটনায় রাজীবের বিচ্ছিন্ন হাত দুই বাসের মাঝে আটকে থাকার ছবি দেশের মানুষের হৃদয় কাঁদিয়েছে। এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই রাস্তা পার হতে গিয়ে গৃহকর্মী রোজিনা গত ২০ এপ্রিল প্রথমে পা হারায়, পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে মারা যায়।’

তিনি বলেন, ‘গত ২৯ জুলাই হোটেল রেডিসনের সামনে শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী জাবালে নূর পরিবহনের বাসচাপায় নিহত হওয়ার ঘটনায় দেশের প্রতিটি স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে। দেশব্যাপী নিরাপদ সড়কের আন্দোলন গড়ে ওঠে।’

সমিতির মহাসচিব বলেন, ‘গত ২৭ আগস্ট চট্টগ্রামের সিটি গেট এলাকায় বাসে অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে বিতর্কের জেরে রেজাউল করিম রনি নামে এক যাত্রীকে বাস থেকে ফেলে হত্যা করা হয়। ২৮ আগস্ট রাস্তা পার হাওয়ার সময় কুষ্টিয়ায় বাসের ধাক্কায় মায়ের কোল থেকে পরে শিশু আকিফা নিহত হয়।’

সংবাদ সম্মেলনে মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘পাঁচ হাজার ৫১৪টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে সাত হাজার ২২১ জন। আহত হয়েছে ১৫ হাজার ৪৬৬ জন। আহতদের মধ্যে ১২৫২ জন চালক-শ্রমিক, ৮৮০ জন শিক্ষার্থী, ৩২১ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ৭৮৭ জন নারী, ৪৮৭ জন শিশু, ১০৬ জন শিক্ষক, ৪৩ জন সাংবাদিক, ৩৩ জন চিকিৎসক, ৯ জন প্রকৌশলী, দুই আইনজীবী, ১৯২ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী রয়েছেন।’

সড়ক দুর্ঘটনায় মোট সাত হাজার ৩৫০টি যানবাহনের পরিচয় পাওয়া গেছে বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করে মোজাম্মেল হক বলেন, ‘এসব যানবাহনের মধ্যে ১৮.৯২ শতাংশ বাস, ২৮.৬৮ শতাংশ ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান, ৭.৯৩ শতাংশ কার, জিপ ও মাইক্রোবাস, ৯.৬১ শতাংশ অটোরিকশা, ২৫.৩০ শতাংশ মোটরসাইকেল, ৩.৭২ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা, ৫.৮০ শতাংশ নছিমন, করিমন ও হিউম্যান হলার।’

৪১.৫৩ শতাংশ গাড়িচাপায়, ২৯.৭২ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষে, ১৬.১৮ শতাংশ খাদে পড়ে, ০.৫৫ শতাংশ চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে এবং ০.৮৯ শতাংশ ট্রেন-যানবাহনের সংঘর্ষে এসব দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে বলে জানান যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব।

২০১৮ সালের সড়ক দুর্ঘটনার একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরে সংগঠনটির মহাসচিব বলেন, ‘গত বছরের জানুয়ারি মাসে ৪৯৯ দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫১৪ জন, আহত ১৩৫৩ জন। ফেব্রুয়ারিতে ৪৩৯ দুর্ঘটনায় ৪৫৯ জন নিহত, আহত ১৫২১ জন; মার্চে ৪৯১ দুর্ঘটনায় নিহত ৫০৩ জন ও আহত ১৫০৬ জন; এপ্রিলে ৪৫১ দুর্ঘটনায় ৪৭১ জন নিহত ও আহত ১২২৩ জন; মে মাসে ৪৫৮ দুর্ঘটনায় ৪৮৪ জন নিহত ও আহত ১১২৭ জন; জুনে ৫২২ দুর্ঘটনায় নিহত ৬১৫ জন নিহত ও আহত ১৭৯০ জন; জুলাইয়ে ২৭৬ দুর্ঘটনায় নিহত ৪২৫ জন ও আহত ১১২২ জন; আগস্টে ৪৯১ দুর্ঘটনায় নিহত ৫১৯ জন ও আহত ১৬৩৮ জন; সেপ্টেম্বরে ৪২৩ দুর্ঘটনায় নিহত ৫১৪ জন ও আহত ১১৬৬ জন; অক্টোবরে ৩৯৫ দুর্ঘটনায় ৪৯৫ জন নিহত, ৭৭০ জন আহত; নভেম্বরে ৪৩২ দুর্ঘটনায় নিহত ৪৩৩ ও আহত ৯৭৯ জন এবং ডিসেম্বর মাসে ৫৩৭ দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৫৮৪ জন ও আহত হয় এক হাজার ২৭১ জন। দুর্ঘটনার পর ছয়টি বিভাগীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন এক হাজার ২০৫ জন।

সমিতির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, সড়ক-মহাসড়ক ও রাস্তাঘাটের নির্মাণ ত্রুটি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেডফোন ব্যবহার, মাদক সেবন করে যানবাহন চালানো, মহাসড়ক ও লেভেল ক্রসিংয়ে ফিডার রোডের যানবাহন উঠে পড়া, রাস্তায় ফুটপাত না থাকা বা ফুটপাত বেদখলে থাকা, যানবাহনে অতিরিক্ত পণ্য বা যাত্রী বহন এবং সড়কে ছোট যানবাহনের সংখ্যা বাড়ায় দুর্ঘটনা বাড়ছে।

সড়ক দুর্ঘটনারোধে বেশ কিছু সুপারিশও তুলে ধরেছে সংগঠনটি। সেখানে বলা হয়েছে- ট্রাফিক আইন, মোটরযান আইন ও সড়ক ব্যবহার বিধিবিধান সম্পর্কে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ও সাধারণের মধ্যে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। একই সঙ্গে টিভি-অনলাইন, সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সড়ক সচেতনতামূলক বা দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে।

জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশ থেকে হাট-বাজার অপসারণ, ফুটপাত দখলমুক্ত করা, রোড সাইন (ট্রাফিক চিহ্ন) স্থাপন করা, জেব্রা ক্রসিং দেওয়া, চালকদের পেশাগত প্রশিক্ষণ ও নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা, যাত্রীবান্ধব সড়ক পরিবহন আইন ও বিধিবিধান প্রণয়ন, গাড়ির ফিটনেস ও চালকদের লাইসেন্স দেওয়ার পদ্ধতিগত উন্নয়ন-আধুনিকায়ন, জাতীয় মহাসড়কে কম গতি ও দ্রুতগতির যানের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করা এবং লাইসেন্স নবায়নের সময় চালকদের জন্য ডোপ টেস্টের ব্যবস্থা করার কথা এসেছে তাদের সুপারিশে।

সংসদে পাস হওয়া সড়ক পরিবহন আইন দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানানোর পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে সড়ক নিরাপত্তা তহবিল গঠনের সুপারিশ করেছে যাত্রীকল্যাণ সমিতি। 

লিখিত বক্তব্যে মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘গত কয়েক বছরে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে যানবাহনের সংখ্যানুপাতে দুর্ঘটনার সংখ্যা ‘অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে’ রাখা সম্ভব হয়েছে বলে সমিতি মনে করে।’

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান, সুপ্রিম কোর্টেও আইনজীবী জোতির্ময় বড়ুয়া, বিআরটিএর সাবেক চেয়ারম্যান আইয়ুবুর রহমান, ফ্যামিলিজ ইউনাইটেড অ্যাগেইনস্ট রোড অ্যাক্সিডেন্ট (এফইউএআরএ)-এর প্রধান এবং পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান ইকরাম আহমেদ, বিএফইউজের সহসভাপতি সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, সাংবাদিক কুদ্দুস আফ্রাদ প্রমুখ।