জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে নব্য জেএমবিতে যুক্ত হয়েছিল শরিফুল ইসলাম খালেদ ও মামুনুর রশীদ রিপন। আন্তর্জাতিক মহলের নজর কাড়তেই তারা ঢাকার কূটনৈতিক এলাকা তথা গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। আদালতে ছয় আসামির স্বীকারোক্তি এবং খালেদ ও রিপনকে জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য জানতে পেরেছে তদন্ত সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সংস্থা।
এ বিষয়ে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) উপকমিশনার মহিবুল ইসলাম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ঘটনায় আদালতে ছয় আসামি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তাদের জবানবন্দি ও বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে মোটামুটি নিশ্চিত হয়েছি, আইএস ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েই জেএমবির একাংশ নব্য জেএমবি গঠন করেছিল। ভয়াবহ একটি হামলার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহলে জানান দেওয়াই এই জঙ্গি নেতাদের পরিকল্পনা ছিল।’
হলি আর্টিজানে হামলা মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) অধ্যাপক রেজাউল করিম হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি খালেদ গত শুক্রবার চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়। গতকাল শনিবার তার ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। গত ২০ জানুয়ারি গাজীপুরের বোর্ডবাজার থেকে জঙ্গি নেতা রিপনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব।
গতকাল র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, হলি আর্টিজানে হামলাকারী ‘ইস্তেহাদি’ (আত্মঘাতী) দলের নির্বাচকের দায়িত্ব পালন করেছিল নব্য জেএমবি নেতা শরিফুল ইসলাম খালেদ ওরফে রাহাত ওরফে সাইফুল্লাহ ওরফে নাহিদ ওরফে আবু সোলাইমান (২৭)। এ হামলার পরিকল্পনা ছাড়াও সে প্রত্যক্ষভাবে অর্থ সংগ্রহ ও হামলাকারীদের প্রশিক্ষণও দিয়েছিল। অধ্যাপক রেজাউল করিমকে হত্যার ব্যাপারে জঙ্গি খালেদ প্রাথমিক স্বীকারোক্তি দিয়েছে বলেও জানান এই র্যাব কর্মকর্তা।
র্যাব ও সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানান, শরিফুল খালেদ রাবিতে অনার্স তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নকালে ২০১৩ সালে জেএমবিতে জড়িয়ে পড়ে। পরের বছর খালেদ ও আসলাম হোসেন র্যাশ পরস্পরের হাতে হাত রেখে ‘বায়াত’ নেয়। এর দুই বছর পর আত্মগোপনে থাকা খালেদ নব্য জেএমবিতে যোগ দেয়। গোপনীয় অ্যাপসে যোগাযোগ রক্ষা করে র্যাশকে নব্য জেএমবিতে অন্তর্ভুক্ত করে সে। হলি আর্টিজানে হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী খালেদ আত্মঘাতী হামলার জন্য রাজীব গান্ধীর কাছে পাঁচ-ছয়জন যুবক চায়। খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শরিফুল ইসলাম ডন নামে দুজনের নাম দিলে খালেদ তার কাছে আরও চারজন আছে বলে রাজীব গান্ধীকে জানায়। খালেদের কাছে থাকা ওই চারজন হলো মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল।
আদালতে জাহাঙ্গীর, হাদিসুর ও র্যাশের দেওয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানান, ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাজশাহীতে র্যাশকে প্রথম তামিম চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় খালেদ। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সে রাজধানীর কল্যাণপুরে র্যাশের মেসে আসে। এর দু-তিন দিন পর তামিমকে সঙ্গে নিয়ে আবারও ওই বাসায় আসে খালেদ। তখন তারা রোজার মাসেই ঢাকার কূটনৈতিক এলাকা তথা হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পরিকল্পনা করে। র্যাশের কাজ করার আগ্রহ দেখে তাকে আপাতত সংগঠনের তহবিলে টাকা জমা দিতে বলে তামিম ও খালেদ। তাদের কথামতো র্যাশ তাৎক্ষণিক ৪০-৫০ হাজার টাকা নব্য জেএমবির তহবিলে জমা দেয়। এরপর খালেদ ও তামিমের নির্দেশে র্যাশ কল্যাণপুরের ওই মেস ছেড়ে একই এলাকায় আরেকটি বাসা ভাড়া নেয়। এরপর তামিম, মারজান, র্যাশ ও অন্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে হলি আর্টিজান হামলা সফল করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয় খালেদ।
রিপনের কর্মকাণ্ড
র্যাব ও সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানান, রিপন জেএমবির সক্রিয় সদস্য ছিল। দায়িত্বশীল নেতাদের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর ২০১১ সালে মুফতি আবুল কাশেম, ডা. নজরুল, সুলতান মাহমুদ ওরফে সাকিব মাস্টার সংগঠনটির হাল ধরে; মূল দায়িত্ব পালন করতে থাকে ডা. নজরুল। এ সময় জেএমবির দায়িত্বশীল নেতা হিসেবে রিপন, সরোয়ার, ডা. নজরুল অন্যদের নিয়ে অঞ্চলভিত্তিক উদ্বুদ্ধকরণ সভা ও সদস্য সংগ্রহের কাজ শুরু করে। ২০১৪ সালে সরোয়ার ও রিপনের মাধ্যমে জেএমবি সদস্যরা ‘আইএসের ভাবাদর্শে’ উদ্বুদ্ধ হয়ে নব্য জেএমবি গঠন করে। একই বছরের এপ্রিলে রাজধানীর মিরপুরে সরোয়ারের নেতৃত্বে রিপন ও মারজান ওরফে হুজুর সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করে। পরে মে মাসের দিকে জয়পুরহাটে করা এক বৈঠকে ‘আইএসের ভাবাদর্শ’ ও অনুসরণে কাজ করার সিদ্ধান্ত হয়।
রাজীবের জবানবন্দির বরাতে সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানান, ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর তামিম-মারজানের নির্দেশে রোহানকে লালমাটিয়া আড়ংয়ের পাশ থেকে তুলে মিরপুর-১০ এ প্রশিক্ষণ সেন্টারে নিয়ে যায় র্যাশ। এরপর ২৬ ফেব্রুয়ারি নিবরাসকে শুক্রাবাদ ওভারব্রিজের নিচ থেকে তুলে প্রশিক্ষণ সেন্টারে আবদুল্লাহ ওরফে রনি ও রাকিবুল হাসান রিগেনের কাছে পৌঁছে দেয়। মোবাশ্বেরকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ধানমণ্ডি লেকপাড় থেকে তুলে সেখানে পৌঁছে দেওয়া হয়। আর উজ্জ্বল ও পায়েলকে খালেদের মাধ্যমেই পাইকপাড়া বউবাজারের কাছের বাসায় আনা হয়।
তারা আরও জানান, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়ার একটি বাড়িতে সরোয়ার, মারজান, র্যাশ, বাশারুজ্জামান চকলেট, মেজর (অব.) জাহিদ, রাজীব, রায়হান, খালেদ এবং রিপন আরেকটি গোপন সভা করে। সেখানেই হলি আর্টিজান হামলার প্রাথমিক পরিকল্পনা হয়েছিল।
জবানবন্দিতে রাজীব জানায়, হলি আর্টিজানে হামলার আগে জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে রিপনের মাধ্যমে তিন-চারটি একে-২২ রাইফেল সংগ্রহ করা হয়। মারজান ভারতে অবস্থানরত ছোট মিজানের মাধ্যমে তিন-চারটি ছোট অস্ত্র ও গুলি এবং বিস্ফোরক সংগ্রহ করে। সরোয়ার একটি একে-২২ রাইফেল ও এর ২২টি গুলি, দুটি ম্যাগাজিন সংগ্রহ করে। এ ছাড়া রিপন উত্তরাঞ্চল থেকে আরও দুটি পিস্তল, চারটি গ্রেনেড ও ১২ রাউন্ড গুলি সংগ্রহ করে হাদিসুরের কাছে পৌঁছে দেয়। এসব অস্ত্র, গুলি ও বিস্ফোরক একটি ফলের কার্টনে ভরে হাদিসুর তার যশোরের নওয়াপাড়ায় বাসায় রাখে। হামলার ২০-২২ দিন আগে সে কার্টনটি হানিফ পরিবহনের বাসে কল্যাণপুরে এনে তামিম চৌধুরীর হাতে তুলে দেয়।
হলি আর্টিজানে হামলার ঘটনার তদন্তে ২১ জনের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পায় সিটিটিসির তদন্তকারী কর্মকর্তা। এর মধ্যে প্রথম দফায় ছয়জন ও পরে আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাদের মধ্যে প্রথম দফায় গ্রেপ্তার ছয় জঙ্গি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। হামলার পর হলি আর্টিজানে সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানে পাঁচ জঙ্গি ও পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ সাতজন নিহত হয়। বর্তমানে মামলাটির বিচার চলছে।