গ্লোবাল ইনডেক্স (জিআই) বা ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের বিষয়টি এখন সারা বিশ্বেই বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রত্যেক দেশই তার ইতিহাস ও ঐতিহ্য ধারণকারী পণ্যের স্বত্ব সংরক্ষণে তৎপর। এসব পণ্য তার নিজস্ব এবং বিশ্বের আর কোনো দেশ এর স্বত্ব দাবি করতে পারে না। আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব সংস্থা ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশন (ডাব্লিউআইপিও) এ স্বত্ব প্রদান করে থাকে। এরই মধ্যে জিআই পণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধন সনদ পেয়েছে ইলিশ ও জামদানি শাড়ি। ভারত এই দুটি পণ্যের স্বত্ব দাবি করেছিল। পরে বাংলাদেশ আইনি লড়াই চালিয়ে এ স্বত্বগুলো পায়। এবার তৃতীয় পণ্য হিসেবে জিআই সনদের স্বীকৃতি পেল ক্ষীরশাপাতি (ক্ষীরশাপাত) আম। এই স্বীকৃতি পাওয়ায় ক্ষীরশাপাতি আম এখন শুধু দেশে নয় বিদেশেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করবে।
কোনো একটি দেশের মাটি, পানি, আবহাওয়া, জলবায়ু এবং ওই দেশের জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি যদি কোনো একটি অনন্য গুণমানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তাহলে সেটিকে ওই দেশের জিআই হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। একই গুণমানসম্পন্ন সেই পণ্য শুধু ওই এলাকা ছাড়া অন্য কোথাও উৎপাদন করা সম্ভব নয়। তাই এই আম এখন চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম হিসেবে সারা বিশ্বে খ্যাতি লাভ করবে। এমনিতেই এই আম দেশের চাহিদা মিটিয়ে গত তিন বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের অনেক জায়গায় রপ্তানি হয়। এখন জিআই সনদ পাওয়ায় ক্ষীরশাপাতি আমের সারা বিশ্বের অনেক জায়গাতে রপ্তানি হওয়ার সুযোগ বিস্তৃত হলো। বিশেষ জাতের আম হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় এই আম তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি করা যাবে। এতে যেমন আমচাষিরা লাভবান হবেন আবার তেমনি রপ্তানির মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করবেন। যা দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখবে।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দিক থেকে বাংলাদেশ সমৃদ্ধিশালী হলেও দীর্ঘ সময় ধরে জিআই আইন না থাকায় এদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের মালিকানা সুরক্ষার সুযোগ ছিল না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন, ২০১৩ এবং ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) বিধিমালা, ২০১৫ প্রণয়ন করা হয়। এরপরই দেশের ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য নিবন্ধনের পথ সুগম হয়। জামদানি এবং ইলিশের পর ক্ষীরশাপাতি আমের জিআই সনদ নেওয়ার উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসন। এই আম এখন জিআই সনদ পাওয়ায় তারাসহ সংশ্লিষ্ট সবাই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। এখন ল্যাংড়া ও আশ্বিনী আমসহ আরও যেসব বাংলাদেশি পণ্য জিআই সনদ পাওয়ার যোগ্য সেগুলোর স্বীকৃতির জন্য সচেষ্ট হতে হবে।
জিআই সনদভুক্ত হলে আমাদের ঐতিহ্যমন্ডিত পণ্যের সারা বিশ্বে সুনাম ছড়িয়ে পড়বে। বিশ্বের মানুষ আমাদের বিশেষায়িত পণ্য সম্পর্কে জানতে পারবে এবং তারা আগ্রহী হয়ে উঠবে। এতে অর্থনৈতিকভাবেও আমরা লাভবান হব। বলার অপেক্ষা রাখে না, বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় শামিল হওয়া দেশগুলো তাদের দেশের ঐতিহাসিক মর্যাদা সম্পন্ন পণ্য নিয়ে হাজির হচ্ছে। এসব পণ্যের যেমন চাহিদা বাড়ছে, তেমনি রপ্তানি করেও তারা লাভবান হচ্ছে। আমাদেরও এ সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। আমরা মনে করি, জিআই স্বত্ব লাভের মাধ্যমে অফুরন্ত সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে। অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় নতুন নতুন দুয়ার খুলতে শুরু করবে। অর্থনৈতিক এ সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে কাজে লাগাতে হবে। নিবন্ধন অর্জন করলেই হবে না, পণ্যের গুণগত মানও ধরে রাখতে হবে। মুক্তবাণিজ্যের এই যুগে মান দিয়েই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হয়। উৎপাদনের উপযোগী পরিবেশ থাকার পরও হাত গুটিয়ে বসে থাকলে কিংবা মনের সঙ্গে আপস করলে অন্য কেউ ঠিকই বাজার দখল করে নেবে। জিআই সনদ পাওয়ার পাশাপাশি এগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধি ও রপ্তানি উপযোগী করে তুলতে সব ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে।