একা ভূমি মন্ত্রণালয়!

সরকারি চাকরিতে আছেন ১৪ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাদের মধ্যে মাত্র ১০ হাজার কর্মচারীর কাছে সম্পদের হিসাব চাওয়া হয়েছে। ৫৬টি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে শুধু ভূমি মন্ত্রণালয় তার তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের কাছে সম্পত্তির এই হিসাব ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে চেয়েছে। অন্য কোনো মন্ত্রণালয় তার অধীন দপ্তর-অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব চাওয়ার উদ্যোগ নেয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমি মন্ত্রণালয়ের মতো অন্যান্য মন্ত্রণালয় এবং বিভাগকেও একই উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

মন্ত্রণালয় ও এর অধীন সব দপ্তরের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব চেয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। গত ১৭ জানুয়ারি এ সংক্রান্ত অফিস আদেশ জারি হলেও গতকাল রবিবার সংশ্লিষ্টদের হাতে পৌঁছায়। তবে শুধু কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব চাওয়ায় প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব মাকসুদুর রহমান পাটোয়ারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, তারা আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের সম্পদের হিসাব দেবেন। নির্ধারিত ছকে সম্পদের তথ্য জানাতে হবে। শুধু তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব চাওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, কর্মকর্তারা ভূমি মন্ত্রণালয়ের নয়; জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের।

গত ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের পর চট্টগ্রামে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জানান, সরকার শক্ত হাতে দুর্নীতি প্রতিরোধ করবে। সবার আগে ভূমি সংক্রান্ত অফিসে কর্মরতদের সম্পদের হিসাব নেওয়া হবে। পরে মন্ত্রণালয়ে এসে কর্মকর্তাদের জানান, কার সম্পদ বেড়েছে, কীভাবে বেড়েছে তা তদন্ত হবে। সমস্যা মনে হলে তা দুুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) দেওয়া হবে। মন্ত্রীর এ ঘোষণার পর ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে ‘গ্রিন সিগন্যাল’ পাওয়ার পর অফিস আদেশ জারি করে ভূমি মন্ত্রণালয়।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় অন্য মন্ত্রণালয়ের কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব চাওয়ার ‘গ্রিন সিগন্যাল’ দিলেও নিজের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব চাওয়ার বিষয়ে নিশ্চুপ। যদিও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ক্যাডার নিয়ন্ত্রণকারী প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়। প্রতিটি মন্ত্রণালয়, বিভাগে বা অধিদপ্তরে প্রশাসন ক্যাডারের যেসব কর্মকর্তা রয়েছেন তারা সবাই হচ্ছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা। এছাড়া অন্যান্য ২৬টি ক্যাডারও নিয়ন্ত্রণ হয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও বিভাগীয় কমিশনারদের কার্যালয়ও এই মন্ত্রণালয়ের অধীন।

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত শুক্রবার জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার কঠোর থাকবে। এর আগে টানা

তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়ে শেখ হাসিনা সবার আগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি বলেন, সরকার কর্মচারীদের বেতন অনেক বাড়িয়েছে, যার নজির পাওয়া যায় না। তারপরও দুর্নীতি হবে কেন? প্রধানমন্ত্রীর এসব ঘোষণার পরও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব চাওয়ার বিষয়ে নিশ্চুপ থাকার বিষয়টি রহস্যজনক বলে মনে করেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মচারীরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রতিবছর আয়কর বিবরণীতে সম্পদের একা ভূমি মন্ত্রণালয়! হিসাব সরকারকে দিই। তারপরও কেন সরকারকে পাঁচ বছর পরপর সম্পদের হিসাব দিতে হবে।

অথচ ১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালায় বলা আছে, সরকারি চাকরিতে যোগদানের সময় নিজের ও পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাব দিতে হবে। একইভাবে প্রতি পাঁচ বছর পরপর সম্পদের হ্রাস-বৃদ্ধির তথ্য সরকারকে জানাতে হবে।

এর আগে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পদের হিসাব নেওয়া হয়। ওই হিসাব আজও বস্তাবন্দি হয়ে পড়ে আছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে। জনপ্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওই সময়ের সম্পদের হিসাব চাওয়ার পর সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। কারণ ওই সময় রাজনীতির রাঘব-বোয়ালদের বিচারের কাঠগড়ায় তোলা হয়েছিল। ট্রুথ কমিশন গঠন করে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনকারীদের স্বেচ্ছায় দায় স্বীকার করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। ওই সময় কমিশনে তিন শতাধিক আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজ তাদের অবৈধ সম্পদ অর্জনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে শতাধিক আমলাও ছিলেন।

২০১৫ সালেও ভূমি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নেওয়া হয়। ওই বছর ১০ মার্চ ছিল সম্পদের হিসাব জমা নেওয়ার শেষ দিন। ওই দিনের মধ্যেই ভূমি মন্ত্রণালয়ে কর্মরত নন ক্যাডার প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা, দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব চাওয়া হয়। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনামতো সংশ্লিষ্টরা সম্পদের হিসাব জমা দিলেও তা পর্যালোচনা করে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওই সময়ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব চাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তৎকালীন ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন পূর্ণমন্ত্রীর বিরোধিতায় ওই উদ্যোগ পূর্ণতা পায়নি।

এ প্রসঙ্গে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ শুধু ভূমি মন্ত্রণালয় কেন? সব মন্ত্রণালয়ের উচিত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নেওয়া। এ সংক্রান্ত বিধি-বিধানও রয়েছে। দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে হলে সম্পদের হিসাব নিতে হবে।’