রাজধানীর পূর্বাচলে বাণিজ্যমেলার জন্য স্থায়ী কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা অনিয়ম ও গাফিলতি পেয়েছে সরকারের প্রকল্প তদারকি সংস্থা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। নির্মাণকাজে ধীরগতি, নকশা না মানা ও উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনার (ডিপিপি) উদ্দেশ্যও ব্যাহত হয়েছে বলে আইএমইডির প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) কাছে অনিয়মের ব্যাখ্যাও চেয়েছে সংস্থাটি।
ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার জন্য স্থায়ী কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০০৯ সালে। কিন্তু তেজগাঁওয়ে জমি স্বল্পতার কারণে ২৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখেনি। এরপর পূর্বাচলে ৭৯৬ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থায়ী কেন্দ্র নির্মাণে নেওয়া হয় নতুন প্রকল্প। নির্ধারিত তিন বছরের মেয়াদকাল পার হলেও এক-চতুর্থাংশ কাজও এখনো শেষ হয়নি। এ অবস্থায় নতুন করে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ছে। প্রকল্পের ব্যয় ১ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা প্রাক্কলন করে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সম্প্রতি এই প্রকল্পের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে আইএমইডি। সংস্থাটির কর্মকর্তা ড. রনজিত কুমার সরকারের করা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টার নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়নের হার যেভাবে বলা হচ্ছে, বাস্তবে সেটা দেখা যায়নি। নির্মাণকাজে গড়িমসি করা হচ্ছে। বাস্তবায়নকারী সংস্থা এ বিষয়ে গাফিলতি করছে। ইপিবি এ ক্ষেত্রে যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে না। আইএমইডি বলছে, চীনা সরকারের নিযুক্ত স্থাপনা বিষয়ক প্রতিষ্ঠানকে এ বিষয়ে তাগাদা দেওয়া যেতে পারে। দ্রুত কাজ শেষ করতে চাইলে এর বিকল্প নেই। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেভাবে স্থায়ী কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হচ্ছে, তাতে এর মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। প্রকল্পের ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। প্রকল্পের জন্য যে গাড়ি কেনা হয়েছে, সেটিতে প্রকল্পের ক্রয় পরিকল্পনা ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের ডিপিপি অনুসারে কাজ হচ্ছে না বলেও প্রমাণ পেয়েছে আইএমইডি। এছাড়া দেখানো প্রকল্পের মাসিক অগ্রগতির চেয়ে প্রকৃত অগ্রগতি অনেক কম বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইএমইডির প্রতিবেদনটি আমরা পেয়েছি। এটি একটি মনগড়া প্রতিবেদন। অনিয়ম-দুর্নীতির কোনো সুযোগ নেই। আমরা যথাযথ নিয়মে প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি।’ এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘প্রথম ডিপিপি অনুসারে কাজ অর্ধেকের মতো সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পের কাজের বেশি বাস্তবায়ন দেখিয়ে আমার লাভ কী? প্রদর্শনী কেন্দ্রটি যেন জনবান্ধব ও বাস্তবতার নিরিখে করা যায় সে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আগের সংশোধনীতে কিছুটা কম্পোনেন্ট রাখা হয়েছিল, প্রয়োজনে আবারও সংশোধন করা হবে।’
একই কথা জানান ইপিবি ভাইস চেয়ারম্যান বিজয় ভট্টাচার্যও। তিনি বলেন, ‘আমরা আইএমইডির চিঠির জবাব দিয়েছি। এখানে কোনো অনিয়ম হয়নি বলে জানিয়েছি। গাড়ি কেনার বিষয়টি পরিকল্পনা কমিশনের অনুমতির সাপেক্ষেই হয়েছে। তবে এটা বাস্তবসম্মত করতে উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
এদিকে স্থায়ী কেন্দ্রটি প্রথম ১০ একর এলাকাজুড়ে হওয়ার কথা ছিল। আগারগাঁওয়ে জায়গা না পাওয়ায় পূর্বাচলে ২০ একর এলাকায় কেন্দ্র নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়। এখন প্রকল্পটি ৩৫ একর জায়গায় হবে বলে জানিয়েছে ইপিবি। ২০১৫ সালে ২০ একর ও ২০১৮ সালে আরও ৬ দশমিক ১০ একর জায়গা বরাদ্দ পেয়েছে ইপিবি। নতুন করে আরও ৯ একর জায়গার আবেদন করেছে সংস্থাটি। ফলে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন আরও পিছিয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির বক্তব্যেও সেই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। গতকাল রবিবার গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘একটা আন্তর্জাতিক মেলা করতে বড় জায়গার প্রয়োজন হয়। পূর্বাচলে আপাতত সে পরিমাণ জায়গা প্রস্তুত নেই। বাণিজ্যমেলা আপাতত আগারগাঁওয়েই অনুষ্ঠিত হবে।’
ইপিবি ১৯৯৫ সাল থেকে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের শেরেবাংলা নগরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার আয়োজন করে আসছে। প্রতিবছরই মেলার এক মাস আগে থেকে অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করে বরাদ্দ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো। এক মাসের মেলা শেষে অবকাঠামোগুলো বিক্রি করে দিতে হয় কম দামে। অনেক সময় মেলার পুরনো এসব অবকাঠামো বিক্রি নিয়ে চাঁদাবাজ ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপের মুখে পড়তে হয় ব্যবসায়ীদের। সে কারণে শুরু থেকেই ব্যবসায়ীরা দাবি জানিয়ে আসছিলেন বাণিজ্যমেলার জন্য স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সাবেক সহসভাপতি হেলালউদ্দিন বলেন, স্থায়ী বাণিজ্য কেন্দ্র না হওয়ার কারণে অবকাঠামোর নামে বছরে কয়েকশ কোটি টাকার অপচয় হচ্ছে। সব মিলিয়ে হিসাব করলে সেটা ২০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।’ এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘বাণিজ্যমেলার নামে মূলত প্রতারণা হচ্ছে। ক্রেতা ঠকছেন, রপ্তানি বাড়ানোর নামে ভাঁওতাবাজি করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের ক্ষতি করা হচ্ছে। আমরা এ মেলা বন্ধের দাবি জানাই। শিগগিরই এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করব।’