আধা বিধবাদের ক্যালেন্ডার

পৃথিবীর স্বর্গরাজ্য কাশ্মীর আজ এক ভীতসন্ত্রস্ত জনপদের নাম। প্রতিদিন ভারত এবং পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিভেদের বলি হচ্ছে সাধারণ কাশ্মীরিরা। জনপদটির এমন অনেক গ্রাম পাওয়া যাবে যেখানে একজনও পুরুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। বছরের পর বছর ধরে ঘরের প্রিয় পুরুষের স্মৃতি আগলে রাখছেন নারীরা।

তাদেরই একজন শাফিয়া আজাদ। তিনি জানেন না তার স্বামী জীবিত নাকি মৃত। গত ২৬ বছর ধরে প্রত্যেক দিন তিনি তার স্বামীকে মনে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। স্বামীকে মৃত জানলে তিনি হতেন বিধবা। কিন্তু কোনো কিছু না জানায় আধা-বিধবার জীবনযাপন করছেন তিনি। স্বামীর ফেলে যাওয়া আধপোড়া সিগারেট জমিয়ে রেখেছেন শাফিয়া, স্বামী ফিরে এসে সিগারেট চাইলে যেন দিতে পারেন। কিছুদিন আগ পর্যন্ত দেয়ালে ঝোলানো ছিল স্বামীর ব্যবহার্য কাপড়।

১৯৯৩ সালের বসন্তে ব্যবসায়ী হুমায়ুন আজাদ নিখোঁজ হন। শ্রীনগর থেকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাকে তুলে নিয়ে গেছে, এমনটা জানা যায়। সেই থেকে আজও তার কোনো খোঁজ মেলেনি।

নিখোঁজ ওই ব্যক্তিদের অভিভাবকদের সংগঠন এপিডিপি। চলতি মাসের ১৫ তারিখ শাফিয়া এবং তার মতো অনেকে এই সংগঠনের আওতায় একটি ক্যালেন্ডার প্রকাশ করে। যেখানে হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের ছবি দেওয়া আছে নির্দিষ্ট তারিখের গায়ে। ৬৫ বছর বয়সী পারভিন আহাঙ্গারের সন্তান ১৯৯০ সালে নিখোঁজ হওয়ার পর তিনি এপিডিপি শুরু করেন। কাতারভিত্তিক মিডিয়া আলজাজিরাকে তিনি বলেন, ‘এই ক্যালেন্ডারের মাধ্যমে তারা নিজেদের স্বজনদের মনে রাখতে পারবে। বহু মানুষ তাদের প্রিয়জনের ফিরে আসার অপেক্ষা করছে। মৃতদের একটা কবর থাকে। কিন্তু যারা নিখোঁজ হয়ে যান, তাদের জন্য আমরা শোকও পালন করতে পারি না। প্রতি মুহূর্তে এই ঘটনা আমাদের ব্যথিত করে।’

এই ক্যালেন্ডারে প্রতি মাসে একজন নিখোঁজ ব্যক্তির নাম তুলে ধরা হয়েছে। বারো মাসে বারো জনের বৃত্তান্ত তুলে ধরে ছাপা হয় ক্যালেন্ডারটি। আর প্রত্যেক নিখোঁজের ছবির নিচে আছে রক্তের দাগ। হুমায়ুন আজাদের ছবির নিচে কিছু কথা লেখা আছেÑ ‘আমি তোমায় কবর দেই বারংবার, আমার হৃদয়ে একবার, আমার আত্মায় দুইবার এবং আমার স্মৃতিতে প্রতি মুহূর্তে।’

বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার পরিসংখ্যান মতে, ১৯৮৯ সালের পর কাশ্মীর হতে আট হাজার মানুষ নিখোঁজ হয়েছে। এদের মধ্যে অনেককে আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যরা তুলে নিয়ে গেছে। আর বাকিরা তাদের বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন, কোনো দিন ফিরেও আসেননি। ১৯৯০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে।

শাফিয়া তার স্বামীর নিখোঁজ হওয়া নিয়ে একটি মামলাও করেছিলেন। কিন্তু তাতে আজ পর্যন্ত কোনো কাজ হয়নি। তার ভাষ্যে, ‘২০০০ সাল পর্যন্ত কেউ একজন আমাকে চিঠি পাঠাত এই বলে যে, তারা আমার স্বামীকে নির্যাতনের শিকার হতে দেখেছে। কিন্তু একদিন হঠাৎ করে ওই চিঠিও আসা বন্ধ হয়ে যায়।’

স্বামী ফিরে আসবেন, এই আশায় আজও বুক বেঁধে আছেন শাফিয়া। বিয়ের দুই বছরের মাথায় স্বামী নিখোঁজ হওয়া শাফিয়া বলেন, ‘এত বছর ধরে আমি এটাই আশা করি, হুমায়ুন বেঁচে আছেন এবং ফিরে আসবেন। আমার সন্তানকে সব ঝামেলা থেকে দূরে রেখেছি। আজও দরজায় কেউ যখন কড়া নাড়ে, আমার মনে হয় সে ফিরে এসেছে।’

কাশ্মীরভিত্তিক একটি মানবাধিকার সংস্থা ও এশিয়ান ফেডারেশন অ্যাগেইনস্ট ইনভলান্টারি ডিজঅ্যাপিয়ারেনের (এএফআইডি) চেয়ারম্যান খুররম পারভেজ কাশ্মীরিদের নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার জন্য সরকারকে দায়ী করেন।