রাজধানীর একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা সাবিনা ইয়াসমিন (ছদ্মনাম)। কর্মস্থলে যেমন অনিয়মিত, তেমনি ঘরে সন্তানের প্রতিও ছিলেন বেখেয়ালি। তার এমন আচরণের কারণ খুঁজতে গিয়ে স্বজনরা জানতে পারেন, সঙ্গদোষে সাবিনা ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়েছে। মাস দুয়েক আগে স্বামী তাকে রাজধানীর তেজগাঁও মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করেন, এরপরও তার আসক্তি কাটেনি। তবে তার জীবন থেকে সরে গেছেন স্বামী ফরহাদ হোসেন। একইভাবে ইয়াবায় আসক্ত রাজধানীর শঙ্করের জাফরাবাদ এলাকার প্রভাবশালী আফতাব মাওলাকে (ছদ্মনাম) ছেড়ে গেছেন তার স্ত্রী। মগবাজারের নয়াটোলার বাসিন্দা শিহাব আবদুল্লাহ (ছদ্মনাম) মা-বাবার আদরবঞ্চিত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন তেজগাঁওয়ের কেন্দ্রীয় মাদক নিরাময় কেন্দ্রে।
কেন্দ্রের চিকিৎসক ডা. লুৎফুল কবীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এসব মাদকাসক্ত শিশু, নারী ও যুবকের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে এ কেন্দ্রে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মাদকাসক্ত ৭ নারী, ৭ শিশু ও ৫৪ যুবক চিকিৎসাধীন আছে। যাদের বেশিরভাগই ইয়াবায় আসক্ত।’ রাজশাহী, খুলনা ও চট্টগ্রামের নিরাময় কেন্দ্র থেকেও পাওয়া গেছে ইয়াবায় আসক্তির তথ্য।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক (চিকিৎসা ও পুনর্বাসন) এস এম জাকির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০১৮ সালে সরকারি চারটি নিরাময় কেন্দ্রের মাধ্যমে ২৫ হাজার ১৪৩ জন মাদকাসক্ত চিকিৎসা নিয়েছে। বেসরকারি ২৮৪টি কেন্দ্রের মাধ্যমে চিকিৎসা নিয়েছে আরও ৫৬ হাজার ৩৩৯ জন মাদকাসক্ত। তাদের ৬০ ভাগেরও বেশি ইয়াবায় আসক্ত।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে চিকিৎসা গ্রহণকারীর চেয়ে তিন-চারগুণ বেশি মাদকাসক্ত দেশের সহস্রাধিক অননুমোদিত নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন। এই হিসাবে দেশে চিকিৎসা গ্রহণকারী মাদকাসক্তের সংখ্যা ৪ লাখের কাছাকাছি। আর চিকিৎসাসেবার বাইরে নিয়মিত মাদক সেবনকারীর সংখ্যা কোটি ছাড়িয়ে গেছে বলে তার ধারণা।
এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) নজরুল ইসলাম শিকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংস্থা মাদকসেবীদের ওপর জরিপ চালিয়েছে। এতে বিভিন্ন রকমের তথ্য পাওয়া গেছে। কেউ বলেছে, দেশে ৪০ লাখ মাদকসেবী রয়েছে আবার কেউ বলেছে ৭০ লাখ।’ তবে সরকারি জরিপের তথ্যানুযায়ী সারা দেশে ৩৬ থেকে ৪০ লাখ মাদকসেবী রয়েছে বলে জানান তিনি।
মাদক নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তারা জানান, দেশে মূলত ৯ ধরনের মাদকের অবৈধ ব্যবহার রয়েছে। এর মধ্যে মদ, গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিল, কোকেন, হেরোইন, আফিম ও ইনজেকটিং ড্রাগ অন্যতম। এর মধ্যে বেশিরভাগই ইয়াবায় আসক্ত। হু হু করে বাড়ছে এ বড়ির সেবন ও ব্যবসা। উদ্ধারও বেড়েছে সমান্তরালে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার তথ্য মতে, বর্তমান তরুণ প্রজন্মের সবচেয়ে বেশি আসক্তির বড়ির নাম ইয়াবা। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানের মুখে রুট বদল করে কারবারিরা ভারতের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে ইয়াবার চালান নিয়ে আসছে। যদিও এর যৎসামান্যই ধরা পড়ছে।
র্যাব, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গড়ে প্রতি মিনিটে ৬০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট ধরা পড়ছে। এই হিসাবে দিনে প্রায় ৩ হাজার ৬১৬ পিস, মাসে প্রায় ১৪ লাখ ও বছরে প্রায় ১৬ কোটি ইয়াবা বড়ি উদ্ধার হচ্ছে। দিন দিন এই উদ্ধারের পরিমাণ বেড়েই চলছে।
এ প্রসঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (অপারেশন) বজলুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইয়াবা উদ্ধার বেশি হওয়াকে দুভাবেই বিচার করা যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা, নজরদারি জোরদারের কারণে যেমন বেশি উদ্ধার হচ্ছে তেমনি ব্যবসা ও ব্যবহার বাড়ার কারণেও হতে পারে।’