সংসদ কার্যকর করার আহ্বান রাষ্ট্রপতির উদ্বোধনী অধিবেশনের ভাষণ

দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে সব বিষয়ে ঐকমত্য গড়ে তুলতে আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। তিনি বলেন, আশা করি বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের গৃহীত উদ্যোগ আরও সুসংহত ও গতিশীল হবে। শান্তি, গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির যে পথে আমরা হেঁটেছি, সেই পথেই বাংলাদেশকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

গতকাল স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দিতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে বক্তব্য শুরু করে শেষ করেন ৭টা ২০ মিনিটে। টানা ১ ঘণ্টা ৪ মিনিটের বক্তব্যে গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা, আইনের শাসন ও অব্যাহত আর্থসামাজিক উন্নয়নের মতো মৌলিক প্রশ্নে সব রাজনৈতিক দল, শ্রেণি ও পেশা নির্বিশেষে সবার ঐকমত্য গড়ে তোলার সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের জন্য দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান। রাষ্ট্রপতি

বলেন, জাতীয় ঐকমত্য ছাড়া শান্তি ও সমৃদ্ধি স্থায়ীরূপ পেতে পারে না। নতুন প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, কর্মচঞ্চল, সুখী, সুন্দর ও উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ সবার কাম্য। ইতিহাসের সাহসী সন্তানরা লাখো প্রাণের বিনিময়ে একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিয়ে গেছেন। আমাদের দায়িত্ব এ দেশ ও জাতির অগ্রযাত্রাকে বেগবান করা। একাত্তরের শহীদদের কাছে আমাদের অপরিশোধ্য ঋণ রয়েছে। আসুন, ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে এবং দল-মত-পথের পার্থক্য ভুলে জাতির গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা ও দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার মধ্য দিয়ে আমরা লাখো শহীদের রক্তের ঋণ পরিশোধ করি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ২০২০ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে মধ্য-আয়ের দেশ হিসেবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করব। আমাদের দৃষ্টি ২০২১ সাল ছাড়িয়ে আরও সামনের দিকে, ২০৪১ সালে বিশ্বসভায় বাংলাদেশ একটি উন্নত-সমৃদ্ধ দেশের মর্যাদায় অভিষিক্ত হবে, এটাই জাতির প্রত্যাশা। আমি দৃঢ়ভাবে আশাবাদী, মানবাধিকার, সুশাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়ণ এবং সমাজের সব স্তরে প্রত্যক্ষ জনসম্পৃক্তির মধ্য দিয়ে আমরা নির্ধারিত লক্ষ্যসমূহ অর্জনসহ একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনে সক্ষম হব।

চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করায় শেখ হাসিনাকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এবং সার্চ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী গঠিত বর্তমান নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হয়, যা দেশ-বিদেশে সব মহলে প্রশংসিত হয়েছে। বাংলাদেশের জনগণের বিপুল সমর্থনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। জনগণের এ রায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জননন্দিত নির্বাচনী ইশতেহার ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’-এর প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থনের বহির্প্রকাশ। সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে বর্ণিত প্রতিশ্রুতিসমূহ বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সবাইকে ঐকান্তিকভাবে কাজ করতে হবে।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ আরও বলেন, দেশে আইনের শাসন সুসংহত ও সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে সরকারের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করা হয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কুখ্যাত ‘ইনডেমনিটি’ আইন বাতিল করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা এবং যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার রায় কার্যকর করা হয়েছে। পলাতক আসামিদের স্বদেশে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ও হত্যা মামলা এবং বিডিআর হত্যাকা- মামলার বিচারকার্য সম্পন্ন হয়েছে এবং আদালত কর্তৃক দোষীদের বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি প্রদান করা হয়েছে। মাদক, জঙ্গিবাদ ও উগ্র সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হচ্ছে এবং জনজীবনে স্বস্তি ফিরে এসেছে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, বিগত ১০ বছরে দেশে-বিদেশে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ সময়ে দেশের অভ্যন্তরে মোট ১ কোটি ৩৪ লাখের অধিক এবং বিদেশে প্রায় ৮০ লাখ কর্মীর কর্মসংস্থান হয়েছে। এর মধ্যে বিগত পাঁচ বছরে ৩৪ লাখ ৮২ হাজার কর্মী বিদেশে গমন করায় প্রায় ৭৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স অর্জিত হয়েছে। এ সময়ে বিভিন্ন দেশে ১৯টি শ্রম উইং খোলা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ২০১২ ও ’১৪ সালে মিয়ানমার এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা মামলার নিষ্পত্তির ফলে বাংলাদেশ সর্বমোট ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র অঞ্চল লাভ করেছে, যা মূল ভূখ-ের ৮০ দশমিক ৫১ ভাগ। এ রায় দুটির ফলে ২০০ নটিক্যাল মাইলের বাইরে মহীসোপানে বাংলাদেশের অবাধ প্রবেশাধিকার সুরক্ষিত হয়েছে এবং গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ, সমুদ্রের তলদেশ থেকে প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে টেকসই এবং গতিশীল করার এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটেছে।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কে রাষ্ট্রপতি বলেন, সরকার সামরিক বাহিনীর উন্নয়নে ফোর্সেস গোল-২০৩০ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করছে। সিলেট, বরিশাল এবং কক্সবাজারের রামুতে তিনটি সেনানিবাস প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তাছাড়া কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইন উপজেলায় নতুন ব্যাটালিয়ন, পদ্মা সেতু কম্পোজিট বিগ্রেটসহ তিনটি পদাতিক ডিভিশন গঠন করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নে নতুন প্রজন্মের ট্যাংক, আধুনিক ট্যাংক বিধ্বংসী অস্ত্র, অত্যাধুনিক হেলিকপ্টার, লোকেটিং রাডার ইত্যাদি সংযোজন করা হয়েছে।

বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশের ভূখণ্ডের জঙ্গিবাদ, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী কোনো শক্তিকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে না। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা নির্যাতনের শিকার ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে নিজ দেশে আশ্রয় দিয়ে প্রধানমন্ত্রী মানবতার যে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। এই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার জন্য প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তার সংস্থান করাসহ তাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ায় সরকার মানবিক কূটনীতির সফল ও বাস্তবসম্মত প্রয়োগের এক যুগান্তকারী উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।