ভল্টের সোনার চাকতি-রিং পাল্টানোর আলামত নেই

বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রাখা শুল্ক বিভাগের ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম ওজনের সোনার চাকতি ও রিং পাল্টানোর অভিযোগের সত্যতা পায়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গঠিত কমিটি। ভল্টে যে চাকতি ও রিং এখন রয়েছে, সেটিই জমা রাখা হয়েছিল বলে কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ভবিষ্যতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া কোনো সংস্থাকে ভল্টে রাখা ধাতব দ্রব্যের যাচাই-বাছাই করতে না দেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি।

কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘চাকতি ও রিংয়ের গায়ে লাগানো মাস্কিং টেপের ওপর কাস্টম হাউসের প্রতিনিধির লাল কালিতে লেখা ভিজিআর নম্বর অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে। এ কাগজ অক্ষত অবস্থায় উঠিয়ে নতুন তৈরি করা একটি চাকতি এবং রিং লাগানোর আলামত পরিলক্ষিত হয়নি। এতদ্ব্যতীত কাস্টম হাউসের জমাদানকারী কর্মকর্তা হারুণ অর রশিদ নিজেই বর্তমানে ভল্টে রক্ষিত চাকতি এবং রিংটিই জমাদান করেছেন মর্মে লিখিতভাবে নিশ্চিত করেছেন।’ ২০১৫ সালের ২৩ আগস্ট শুল্ক বিভাগের গুদাম কর্মকর্তা হারুণ অর রশিদ গোলাকার কালো প্রলেপযুক্ত একটি সোনার চাকতি এবং একটি কালো প্রলেপযুক্ত সোনার রিং ভল্টে জমা দিতে গেলে জিনিস দুটি পরীক্ষা করে ৮০ শতাংশ বিশুদ্ধ সোনা হিসেবে গ্রহণ করে প্রত্যয়নপত্র দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের পরিদর্শক দল ২০১৭ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট পরিদর্শন করে ওই চাকতি ও আংটি পরীক্ষা করে তাতে ৮০ শতাংশ বিশুদ্ধ সোনা পায়নি, পেয়েছে ৪৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ বিশুদ্ধ সোনা। ওই পরিদর্শনের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশুদ্ধ সোনার পরিমাণ কমে যাওয়ায় সরকারের ১ কোটি ১১ লাখ ৮৭ হাজার ৮৬ টাকা ৫০ পয়সা ক্ষতি হয়েছে। এই প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে গত বছর জুলাই মাসে সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হলে তা নিয়ে হইচই শুরু হয়। ঘটনা তদন্তে ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত মাসে অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া ওই কমিটির প্রতিবেদনে ‘চাকতি ও রিং অপরিবর্তিত রয়েছে’ বলা হয়েছে।

কমিটি ব্যাখ্যা করে বলেছে, ওজন ঠিক রেখে ৮০ শতাংশ বিশুদ্ধ সোনার চাকতি ও রিং ৪৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ বিশুদ্ধ সোনার চাকতি ও রিং দিয়ে বদল করা হলে মিশ্রণে রুপা ও কপারের ঘনত্বের কারণে আয়তন লক্ষণীয়ভাবে বাড়বে, যা সহজেই সবার দৃষ্টিগোচর হওয়ার কথা। কিন্তু কাস্টম হাউসের জমাদানকারী কর্মকর্তা হারুণ অর রশিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত সোনা পরীক্ষকের দৃষ্টিতে চাকতি ও রিংটির আয়তনে কোনো অস্বাভাবিকতা পরিলক্ষিত হয়নি। তাই কমিটি মনে করেছে, ২০১৫ সালে জমা দেওয়া কালো প্রলেপযুক্ত স্বর্ণের চাকতি ও রিং যথাযথভাবে ভল্টে সংরক্ষিত আছে। তার অর্থ দাঁড়ায়, ওই শুল্ক কর্মকর্তা ৪৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ বিশুদ্ধ সোনার চাকতি ও রিংই জমা রেখেছিলেন।

সেক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ বিশুদ্ধ সোনা হিসেবে জমার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যয়নপত্রের ব্যাখ্যায় তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত সোনা পরীক্ষকের যাচাই অনুযায়ী চাকতি ও রিংয়ের সোনার বিশুদ্ধতার মান ৪৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ হলেও ওইদিন জমা দেওয়া অন্য সব স্বর্ণালঙ্কারের বিশুদ্ধতার মান ৮০ শতাংশ হওয়ায় লেখার সময় চাকতি ও রিংয়ের মানও ভুল করে ৮০ শতাংশ লেখা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির একজন সদস্য গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভল্টের সোনা হেরফের হয়েছে কি না, তার তদন্ত প্রতিবেদন ডিসেম্বর মাসে অর্থ মন্ত্রণালয়ে দিয়েছি। তাতে কোনো হেরফের পাওয়া যায়নি। সব সোনা ঠিকই রয়েছে। ভবিষ্যতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আগাম অনুমোদন ছাড়া সরকারের আর কোনো সংস্থাকে ভল্টে রাখা স্বর্ণ বা অন্য কোনো ধাতব যাচাই-বাছাই করতে না দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।’

তার মতে, বিদ্যমান ট্রেজারি বিধিতে অস্থায়ীভাবে সরকারের মূল্যবান ধাতব পদার্থ ও অন্যান্য দ্রব্যাদি ‘সিলড প্যাকেট’ জমা নেওয়ার নির্দেশনা আছে। সেখানে জমা করা মূল্যবান দ্রব্যাদির বিশুদ্ধতার হার যাচাইয়ের কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু স্বর্ণ ও মূল্যবান ধাতব স্থায়ীভাবে জমা রাখার ক্ষেত্রে খাদ ও ওজন যাচাই করতে হয় বলে জমা রাখা স্বর্ণ ও ধাতব পরিদর্শন করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু অস্থায়ীভাবে জমা নেওয়ার সময়ও খাদ ও ওজন যাচাই করা হচ্ছে, যা ট্রেজারি রুলসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ইস্যু ডিপার্টমেন্ট ট্রেজারি রুলসের আলোকে পরিচালিত হয়। তাই বিদ্যমান নীতিমালায় বুলিয়ন ভল্টে জমা রাখা স্বর্ণ ও মূল্যবান ধাতব পরিদর্শনের যে সুযোগ রয়েছে, তা অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া সরকারের অন্য কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া যুক্তিযুক্ত নয়। কমিটি বলেছে, ভবিষ্যতে সরকারের অন্য কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকের বুলিয়ন ভল্ট পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে শুধু স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত মূল্যবান দ্রব্যাদি পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।