নতুন প্রকল্পের চাপ পরিকল্পনা কমিশনে

চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) সংশোধনীতে নতুন প্রকল্প অন্তর্ভুক্তি নিয়ে চাপে রয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে প্রায় এক হাজার নতুন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব এসেছে। কারণ, কোনো প্রকল্প কোনোভাবে একবার অন্তর্ভুক্ত করাতে পারলে পরবর্তী সময়ে অনুমোদন পেতে সুবিধা হয়। এই অবস্থায় গুরুত্বহীন প্রকল্পও যুক্ত করার বিষয়ে চাপ দিচ্ছে মন্ত্রণালয়গুলো। কিন্তু পরিকল্পনা কমিশন বলছে, ঢালাওভাবে প্রকল্প এবার সংশোধিত এডিপিতে যুক্ত করা হবে না। আগামী তিন মাসের মধ্যে অনুমোদন বা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি আনা যাবে শুধু এমন প্রকল্পই যুক্ত হবে। নইলে অহেতুক প্রকল্প সংখ্যা বাড়ানোর পক্ষে নয় কমিশন।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, এডিপির সংশোধনীতে পরিবহন খাতে যুক্ত হচ্ছে ১৭৫টি নতুন প্রকল্প। এ খাত থেকে প্রায় চারশ প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। কমিশন চার ভাগে বিভক্ত করে এই ১৭৫টি প্রকল্প তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করছে। এর মধ্যে অননুমোদিত প্রকল্প ৪৬টি, প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা (পিইসি) হয়েছে এমন ৩৭টি, প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) পাওয়া গেছে এমন প্রকল্প ২৬টি, ডিপিপি পাওয়া যায়নি এমন প্রকল্প ৬৬টি।

শিক্ষা ও ধর্ম খাতে যুক্ত হচ্ছে ১৩৬টি নতুন প্রকল্প। এর মধ্যে অননুমোদিত প্রকল্প হিসেবে ৩১টি, পিইসি সভা হয়েছে এমন ২১টি, ডিপিপি পাওয়া গেছে এমন প্রকল্প ৭টি, ডিপিপি পাওয়া যায়নি এমন প্রকল্প রয়েছে ৭৭টি। এভাবে অন্যান্য খাতেও কমবেশি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। সব মিলিয়ে নতুন প্রকল্পের সংখ্যা প্রায় ৫ শতাধিক।

পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের প্রধান ও অতিরিক্ত সচিব খলিলুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে এবার আমরা বেশ সতর্ক। ঢালাওভাবে প্রকল্প সংশোধিত এডিপিতে যুক্ত করা হবে না। তিনি বলেন, তারপরও সব মিলিয়ে নতুন প্রকল্পের সংখ্যা ৫শ ছাড়িয়ে যাবে।

এদিকে চলতি অর্থবছরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) মোট ২৫টি বৈঠক আয়োজনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। প্রতিটি বৈঠকে গড়ে চারটি করে এক বছরে ২০০ নতুন প্রকল্প অনুমোদনের লক্ষ্য ছাড়িয়ে গেছে পাঁচ মাসেই। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর এ পর্যন্ত একনেকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ২৪০ নতুন প্রকল্প। এর বাইরে এডিপির আওতায় আরও ৯৯ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী। সব মিলে সংশোধিত এডিপিতে (আরএডিপি) যোগ হচ্ছে ৩০৯ প্রকল্প।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমএডি) কর্মকর্তারা বলছেন, এডিপিতে প্রকল্পের সংখ্যা প্রতি বছরই বাড়ছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে এডিপিতে প্রকল্প ছিল ৯৯৯টি। এ সংখ্যা বেড়ে চলতি অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৩৫টিতে। এ অবস্থায় নতুন অনুমোদন পাওয়া প্রকল্প যোগ হলে এর সংখ্যা দেড় হাজার ছাড়িয়ে যাবে। এডিপি কাটছাঁটের উদ্যোগের পাশাপাশি নতুন প্রকল্প যোগ হওয়ায় অর্থায়ন সমস্যার কারণে বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলেও আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

পরিকল্পনা বিভাগের সচিব জিয়াউল ইসলাম মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, এপিডিতে যুক্ত করতে পারলে প্রকল্প অনুমোদন পেতে সহজ হয়। না হলে হঠাৎ করে প্রকল্প আনা হলে সেটা অনুমোদন পেতে পরিকল্পনামন্ত্রীর আলাদা অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। এ জন্য সম্ভাব্য সব প্রকল্প অনুমোদনের বিষয়ে মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর চাপ থাকে। আমরা সব কিছু বিবেচনায় নিয়েই এসব প্রকল্প অনুমোদনের বিষয়ে চূড়ান্ত করব। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে এটি চূড়ান্ত অনুমোদন পেতে পারে।

কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে বেশ আগে থেকেই অনেক নতুন প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে একনেক। চলতি অর্থবছর অনুমোদন পায় ২৪০টি প্রকল্প। এগুলো বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ২ লাখ ৮৫ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা। অথচ এবার এডিপিতে মোট বরাদ্দ রয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ অফিসের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, প্রকল্প যুক্ত হলেই অনুমোদন হয়ে যায় না। কিন্তু এটি অনুমোদনের একটি সিঁড়ি তৈরি হয়। এজন্য প্রকল্পের অনুমোদনের সময় এর ডিজাইন, কারিগরি ও আর্থিকসহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকল্প প্রস্তাবে রয়েছে কি না তা দেখা উচিত। এসবে তাড়াহুড়া করা উচিত না।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত থেকে শুরু করে অনুমোদন প্রক্রিয়ার সংস্কার আনা হবে। এক্ষেত্রে গ্রামীণ ও আর্থসামাজিক খাতে উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। অনেক প্রকল্পই যুক্ত করার প্রস্তাব আসতে পারে। তবে অগ্রাধিকার বিবেচনায় প্রকল্প যুক্ত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

মামুন আব্দুল্লাহ