মাদক মামলা নিষ্পত্তিতে আন্তরিক হোন

দেশে একদিকে যেমন মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান চলছে, অন্যদিকে আদালতগুলোতে বছরের পর বছর ঝুলে আছে হাজার হাজার মাদক মামলা। সাক্ষীর অভাব এবং তদন্তে গাফিলতির কারণে বিচারাধীন মাদক মামলাগুলো নিষ্পত্তিতে এই দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন আদালত সংশ্লিষ্টরা। এ পরিস্থিতিতে আদালতের আমলে নেওয়া সব মাদক মামলা ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির জন্য নির্দেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত। চার বছর আগে একটি মাদক মামলায় গ্রেপ্তার করা মাদারীপুরের দশম শ্রেণির এক ছাত্রের বিচারের শুনানিকালে মঙ্গলবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের বেঞ্চ এই নির্দেশ দেয়। বিবাদীদের আইনি অধিকার নিশ্চিত করা এবং আদালতকে মামলাজট মুক্ত করার পাশাপাশি সমাজ থেকে ক্ষতিকর মাদক নির্মূলে উচ্চ আদালতের এই নির্দেশ সময়োচিত বলেই বিবেচিত হবে।

গণমাধ্যমকে সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র ও বিশেষ কর্মকর্তার দেওয়া তথ্যানুসারে দেশের নিম্ন আদালতগুলোতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে করা ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৮৬টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে এবং গত এক বছরে এমন মাত্র ৮ হাজার ৯৭৭টি মামলা নিষ্পত্তিতে সক্ষম হয়েছে আদালত। এই প্রেক্ষাপটেই আদালতের আমলে নেওয়া সব মাদক মামলা ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার ও আইন সচিবকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। একইসঙ্গে সব জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও থানার ওসিদের মামলা নিষ্পত্তিতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করারও বিশেষ নির্দেশ দেয় আদালত। উচ্চ আদালতের এই নির্দেশনায় মামলা পরিচালনায় তদন্ত কর্মকর্তাদের গাফিলতি এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় অহেতুক দীর্ঘসূত্রতার কথাও উঠে এসেছে।

জাতীয় পুলিশ সপ্তাহকে ঘিরে নিজ কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একইদিনে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন, তা-ও উচ্চ আদালতের এই তাগিদকে মনে করিয়ে দেয়।  বিচারাধীন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিতে এবং মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। এদিকে পুলিশ প্রশাসনও মাদকবিরোধী অভিযানের জন্য বিশেষ শাখা এবং মামলা নিষ্পত্তিতে ‘বিশেষ ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রীকে। দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি এবং মাদক নির্মূলে সরকার, আদালত ও পুলিশ প্রশাসনের এই মনোভাব ও তাগিদ অবশ্যই বিশেষভাবে লক্ষ করবার মতো।

গত বছরের মে মাসে সমাজ থেকে মাদক নির্মূলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর সারা দেশে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান নানা কারণেই আলোচিত-সমালোচিত হয়। সে সময় থেকে বিশেষত ইয়াবা পাচারকারী চক্রের সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যক্তি পুলিশ ও র‌্যাবের সঙ্গে তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা যায়।  সারা দেশে মাদকবিক্রেতা ছোট ছোট চক্রগুলোর পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক মাদকসেবনকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়।  কিন্তু সীমান্তবর্তী এলাকার শীর্ষ ইয়াবা কারবারীরা ধরছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়।  একইসঙ্গে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনের আগের কয়েক মাসে বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীসমর্থকদের নির্বিচার ধরপাকড়ের সময় অনেককেই ‘মাদকের মামলা’ দিয়ে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে।

এই পরিস্থিতিতে তদন্ত ও বিচার কাজের সব জটিলতা অপসারণ করে আদালতগুলোকে মাদক মামলার জট মুক্ত করা এবং আটককৃত ও বিবাদীদের আইনি অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হলে তা খুবই ইতিবাচক প্রভাব রাখবে। এতে একদিকে যেমন আদালত ও পুলিশ প্রশাসনের ওপর জনগণের আস্থা বাড়বে, তেমনি অন্যদিকে সমাজ থেকে ক্ষতিকর মাদক নির্মূলেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে। তবে, একইসঙ্গে মাথায় রাখতে হবে কেবল আইনি বিধান ও তার প্রয়োগের মধ্য দিয়ে সমাজ থেকে মাদক নির্মূল সম্ভব নয়।  এজন্য প্রয়োজন দেশের নবীন প্রজন্ম ও তরুণ সমাজের সামাজিক-সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণ এবং যথাযথ শিক্ষা ও বিনোদনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এর পাশাপাশি নাগরিকদের আইনি অধিকারের সুরক্ষা দিতে পারলে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার কাজও এগিয়ে যাবে বলে আশা করা যায়।