মোহাম্মদ হাসিম। মিয়ানমারের সমমুন্না এলাকার বাসিন্দা। বছর দেড়েক আগে পরিবারের সাত সদস্যকে নিয়ে পালিয়ে আসেন কক্সবাজারের উখিয়ায়। সহায়-সম্বল বলতে ছিল না কিছুই। সন্তানদের পড়ালেখা চালানোর চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন তিনি। এক দালালের মাধ্যমে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যানের সার্টিফিকেট সংগ্রহ করেন। পরে দুই সন্তানকে ভর্তি করেন ক্যাম্পের বাইরের একটি সরকারি
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। হাসিমের মতো ক্যাম্পের অনেক রোহিঙ্গাই এখন সুবিধা পেতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
তবে জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, দালালরা জাল সার্টিফিকেট বিক্রি করছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। রাজাপালং ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের সার্টিফিকেট দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে সরকারের নির্দেশে জন্মনিবন্ধন সার্টিফিকেট দেওয়া বন্ধ রয়েছে। এতে এলাকার লোকজন সবচেয়ে বেশি
ভোগান্তিতে পড়েছে। রোহিঙ্গারা যদি সত্যি সত্যি সার্টিফিকেট পেয়ে থাকে, তাহলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দালালদের ব্যাপারে আমরা সতর্ক আছি। জাল সার্টিফিকেট হলেও হতে পারে। স্কুলগুলোতেও সতর্কতা আছে।’ রোহিঙ্গারা যেন ক্যাম্পের বাইরে যেতে না পারে, সেদিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
সম্প্রতি উখিয়ার অস্থায়ী আশ্রয় ক্যাম্পে গিয়ে দেখা গেছে, যে যার মতো ক্যাম্পের বাইরে যাচ্ছে। সিএনজি অটোরিকশা ও টমটমে সদরের পথেও ছুটতে দেখা যায় তাদের। ক্যাম্প এলাকা থেকে উখিয়ার সোনারপাড়া হয়ে কক্সবাজার সদরে আসতে উখিয়া কলেজ গেট, মেরিন ড্রাইভ সংযোগ সড়ক, রেজুখালী ও হিমছড়িতে পুলিশ চেকপোস্ট থাকলেও চেহারা দেখেই অধিকাংশ যানবাহন ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। একই অবস্থা কোর্টবাজার-কক্সবাজার লিংক রোডেও। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভোটার আইডি চাওয়া হয়। কেউ দেখাতে পারে, আবার কেউ পারে না। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দেশি-বিদেশি নাগরিক, এনজিও কর্মীসহ যেকোনো ব্যক্তির প্রবেশের ক্ষেত্রে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের (আরআরআরসি) অনুমতি বাধ্যতামূলক হলেও বাধা না থাকায় এই প্রতিবেদকের মতো যে-কেউই নির্বিঘেœ ক্যাম্পে ঢুকে পড়ছে।
এ প্রসঙ্গে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) টেকনাফ ২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল আছাদুজ্জামান চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের কড়া নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে। কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত প্রতিটি রাস্তায় চেকপোস্ট বাড়ানো হয়েছে। নিয়মিত যানবাহনে তল্লাশি চলছে। কোনো রোহিঙ্গা যাতে ক্যাম্পের বাইরে যেতে না পারে, সেজন্য আলাদাভাবে গোয়েন্দা নজরদারি থাকছে। তা ছাড়া রোহিঙ্গারা যাতে কোনো ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়তে না পারে সেইদিকেও আমাদের নজরদারি আছে। ’
স্থানীয়রা জানায়, উখিয়ার অস্থায়ী আশ্রয় ক্যাম্পে ১০০ পরিবার মিলে একজন নেতা নির্বাচন করেছে রোহিঙ্গারা। আবার নেতাদের ভোটে প্রতিটি ব্লকে নির্বাচিত হয়েছেন দুজন প্রধান নেতা। ওই নেতাদের সমর্থনে নির্বাচিত হন চেয়ারম্যান। অভিযোগ উঠেছে, নেতাদের মধ্যে কেউ কেউ ক্যাম্পে নিয়মিত চাঁদা তোলেন। ত্রাণ কিনে খোলাবাজারে বিক্রিসহ নানাভাবে অর্থ উপার্জন করছেন। আবার কয়েকটি এনজিও ক্যাম্পে প্রতিনিধি নিয়োগ করে নানাভাবে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে।
সরেজমিনে গত বৃহস্পতিবার বালুখালী-২ ক্যাম্পে গিয়ে দেখা গেছে, রোহিঙ্গারা অবাধে বাইরে আসা-যাওয়া করছে। ক্যাম্পের ভেতর দোকানপাটে চলছে কেনাবেচা। ‘জি’ ব্লকের একটি ঘরে গিয়ে দেখা যায়, গ্যাস সিলিন্ডার ও আসবাবপত্রে ঘরটি সাজানো। তিন বেলাই সেখানে রান্না হয়। সন্তানদের নিয়ে ‘সুখেই আছেন’ বলে জানান সেখানকার বাসিন্দা আজহার হোসেন মাঝি (ছদ্মনাম)। তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান, অভাব তো থাকবেই। ক্যাম্পের ভেতর একটি মুদি দোকান দিয়েছেন। প্রতিদিন ৫০০-৭০০ টাকা আয় হয়। বাইরে এমনকি উখিয়া বাজারেও আসা-যাওয়া করা যায়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ক্যাম্পের কয়েকজন বাসিন্দার সন্তান রাজাপালং ও কুতুপালং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ছে। স্থানীয় চেয়ারম্যানের একেকটি সার্টিফিকেটের জন্য ২-৩ হাজার টাকা করে নিচ্ছে দালালরা। ইউপি সদস্যদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ আছে। আজহারের মতো অনেকের ঘরেই রয়েছে গ্যাস সিলিন্ডার, সামনে বড় বড় দোকান। বালুখালী পানবাজার ক্যাম্পের মুখে গড়ে উঠেছে অন্তত ২০০ দোকান। ২ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের এসব দোকান থেকে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় ইউপি সদস্যের প্রতিনিধিরা দিনে ৫০-৬০ টাকা করে চাঁদা তোলে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
একই ক্যাম্পের ‘বি’ ব্লকের এক বাসিন্দা জানান, বছরখানেক আগে বাদশা নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তার কাছে থেকে ২ হাজার টাকায় চেয়ারম্যানের সার্টিফিকেট নিয়েছেন। পরে তার এক সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করেছেন। সে এখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। এ রকম আরও অনেকেই বাইরের স্কুলে পড়ছে। তবে বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে ক্যাম্পের স্কুলেই পড়ছে। ইউনিসেফ পরিচালিত ওই স্কুলগুলো বিভিন্ন এনজিও দেখাশোনা করছে।
জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্যাম্পে একে অপরের নেতৃত্বের লড়াই, ভাড়া উত্তোলন, পূর্বশত্রুতা, চুরি, ডাকাতি, অপহরণ, খুনোখুনিসহ নানা ধরনের অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িত বেশ কিছু রোহিঙ্গা। তারা মাদক পাচারে জড়িয়ে পড়ছে, বিশেষ করে ইয়াবা কারবারে। ক্যাম্পের রোহিঙ্গারা একে অপরের প্রতি হিংস্র আচরণ করে। নানা কারণে তাদের বিরুদ্ধে কোনো অ্যাকশনে যেতে পারছি না।’